পরিবেশ সম্পর্কিত ধারণা

পরিবেশ সম্পর্কিত ধারণা- নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “কৃষি পরিচিতি ও পরিবেশ” বিষয়ের “পরিবেশের উপাদান” বিষয়ের ইউনিট ১ এর ১.১ নং পাঠ।

পরিবেশ সম্পর্কিত ধারণা

পরিবেশ সম্পর্কিত ধারণা

 

পরিবেশের ধারণা পরিবেশ কথাটি বহুলভাবে ব্যবহৃত, যেমনঃ সামাজিক পরিবেশ, সাংস্কৃতিক পরিবেশ, শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ, রাজনৈতিক পরিবেশ ইত্যাদি আরও অনেক পরিবেশ। তবে পরিবেশ বিজ্ঞান জীব বিজ্ঞানেরই একটি অপেক্ষাকৃত নতুন ও আধুনিকতম সংকলন যেখানে জীবের সাথে তার পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। বিজ্ঞানের যে শাখা জীবের পারিপার্শি¦কতার সাথে জীবকূলের প্রতিটি পারস্পরিক ক্রিয়া—বিক্রিয়া নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করে তাই পরিবেশ বিজ্ঞান।

পরিবেশের সাথে প্রাণীজগতের সম্পর্ক নিয়ে আলোচিত বিদ্যাকে ইকোলজি বলা হয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পরিবেশ বিজ্ঞানী পরিবেশের নানাবিধ সংজ্ঞা দিয়েছেন। যার উৎপত্তি ও বিস্তৃতি ব্যাপক বিধায় স্বল্প পরিসরে আলোচনা সম্ভব নয়। তবে বহুল প্রচলিত ও সমাদৃত কয়েকটি সংজ্ঞা এখানে দেওয়া গেল।

 

পরিবেশ বিজ্ঞানের সংজ্ঞা :

(১) জৈব ও অজৈব পরিবেশের সাথে প্রাণীর অনাবিল সম্পর্ককেই পরিবেশ বিজ্ঞান বলে,  হেকেল, ১৮৬৯।

(২) পরিবেশের সাথে জীবের সম্পর্ক নিয়ে যে বিজ্ঞান অনুসন্ধান চালায় তাই পরিবেশ বিজ্ঞান। এটি জ্ঞানের এমন একটি দর্শন যেখানে জীবজগতকে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়  উডবারি, ১৯৫৫।

(৩) জীবক লের প্রাচুর্য ও বিস্তার সম্পর্কিত সুনিদিষ্ট গবেষণাই পরিবেশ বিজ্ঞান  এন্ড্রিয়ার্থা, ১৯৬১।

(৪) পরিবেশ বিজ্ঞান হচ্ছে পরিবেশের আন্তঃক্রিয়াদির অধ্যয়ন যা জীবের বিস্তার, উৎপাদন প্রাচুর্য ও অভিব্যক্তি নিয়ন্ত্রণ করে এবং মঙ্গল সাধন করে  পেট্রিডিস, ১৯৬৮।

(৫) প্রকৃতির গঠন ও কার্যাবলী সম্পর্কে অধ্যয়নই হচ্ছে পরিবেশ বিজ্ঞান  ওডাম, ১৯৭১।

(৬) জীবের প্রাচুর্য ও বণ্টন নির্ণয়কারী আন্তঃক্রিয়াদির বিজ্ঞানভিত্তিক পর্যালোচনাই হচ্ছে পরিবেশ বিজ্ঞান  ক্রেব, ১৯৭২।

উপরোক্ত সংজ্ঞাগুলোর সার সংক্ষেপ করলে যা দাঁড়ায় তা হচ্ছে, আমাদের চার পাশে যা কিছু আছে এবং যা কিছুই আমাদের জীবনধারাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করে তাই আমাদের পরিবেশ।

পরিবেশ সম্পর্কিত ধারণা, পরিবেশের উপাদান , কৃষি পরিচিতি ও পরিবেশ

 

পরিবেশের উপাদান :

সাধারণভাবে পরিবেশ বলতে জীবের পারিপার্শ্বিক অবস্থাকেই বুঝায়। তবে পরিবেশ আসলে একটি জটিল পদ্ধতি যা বহুবিধ উপাদানের সমষ্টি নিয়ে গঠিত। বাহ্যিক যে সকল বস্তু বা উপাদান জীবকে ঘিরে রেখেছে এবং যা জীবকে তার বিকাশ ও বিস্তারে প্রভাবিত করে তাই পরিবেশের উপাদান। এই উপাদানগুলো সজীব ও জড় উভয়বিধই হতে পারে। পরিবেশের মৌলিক উপাদানসমূহকে পরবতীর্ পৃষ্ঠায় ছকে দেখানো হলো।

Capture 235 পরিবেশ সম্পর্কিত ধারণা

 

পরিবেশের উপাদানসমূহের আন্তঃক্রিয়া:

প্রাকৃতিক পরিবেশে বিশেষ কোন একক উপাদানের চেয়ে উপাদানসমুহের সমষ্টিগত প্রভাব জীবের উপর বেশি অবদান রাখে। এর কারণ এই যে, উপাদানগুলো পরস্পরের সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। পরিবেশের কোন একটি উপাদানের তারতম্য ঘটলে অন্য উপাদানের ক্রিয়াকান্ডও তাদ্বারা প্রভাবিত হয়। পরিবেশ বিজ্ঞানের ভাষায় যা ঐড়ষড়পড়বহড়ঃরপ প্রভাব বলে খ্যাত। যেমনঃ সূর্যালোকের প্রখরতা বাড়লে উদ্ভিদের প্রস্বেদন হার বৃদ্ধি পায়। প্রস্বেদন হার বাড়লে বিপাকীয় কাজ প্রভাবিত হয় ইত্যাদি।

Capture 236 পরিবেশ সম্পর্কিত ধারণা

বিভিন্ন পরিবেশ বিজ্ঞানী পরিবেশের উপাদানগত শ্রেণিবিন্যাস বিভিন্নভাবে দিয়ে থাকলেও অধিকাংশের মতে চারটি ভাগের উপরই প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে।

১। জলবায়ুগত উপাদান

(ক) আলো :

এ পৃথিবীতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জীবনকে কার্যকর রাখার জন্য সকল শক্তির উৎস সৌর শক্তি। সবুজ উদ্ভিদ পত্রস্থ ক্লোরোফিলের সাহায্যে যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আলোকশক্তি শোষণ করে রাসায়নিক শক্তিতে পরিণত করে এবং শর্করাজাতীয় খাদ্য উৎপাদন করে তাকে সালোক—সংশ্লেষণ বলে।

Capture 237 পরিবেশ সম্পর্কিত ধারণা

সালোক—সংশ্লেষণ বিবর্জিত উদ্ভিদের অস্তিত্ব যেমন কল্পনা করা যায় না, তেমনি উদ্ভিদ ছাড়া অন্য প্রাণীর জীবন ধারণও প্রায় অসম্ভব। আর এসবই হচ্ছে আলোক শক্তির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। সালোক—সংশে­ষণ ছাড়াও উদ্ভিদের গঠন, আকৃতি, পত্রবিন্যাস, পাতার পুরুত্ব, ক্লোরোফিলের পরিমাণ, প্রস্বেদন, পুষ্পায়ন এবং আরও বহুবিধ জৈবিক কার্যাবলী আলো দ্বারা সংঘটিত বা প্রভাবিত হয়। পৃথিবীতে পতিত আলোক রশ্মির তীব্রতা ও স্থায়ীত্ব, ঋতুভেদ, অক্ষাংশ, ভূমির ঢাল ও দিক, বায়ুমন্ডলের স্বচ্ছতা, আর্দ্রতা, কুয়াশা, মেঘ ইত্যাদি উপকরণ দ্বারা প্রভাবিত হয়।

যে সকল উদ্ভিদ তীব্র আলোতে ভাল জন্মে (যেমনঃ ধান, পাট, গম, আম, তূলা ইত্যাদি) তাদেরকে আলো পছন্দকারি উদ্ভিদ বা হেলিওফাইট বলে। আবার যে সকল উদ্ভিদ ছায়াযুক্ত স্থানে জন্মানো পছন্দ করে (যেমনঃ ফার্ণ, পান, বনের নিম্নস্তরের লতাগুল্ম ইত্যাদি) তাদেরকে ছায়া পছন্দকারি উদ্ভিদ বা সাইওফাইটস বলে।

পরিবেশ সম্পর্কিত ধারণা, পরিবেশের উপাদান , কৃষি পরিচিতি ও পরিবেশ

(খ) তাপমাত্রা :

উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও বিকাশে তাপমাত্রা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। সকল বিপাকীয় কার্যক্রম, যেমনঃ সালোক—সংশ্লেষণ, শ্বসন, পরিশোষণ, অঙ্কুরোদগম, প্রস্বেদন, অভিস্রবন ইত্যাদি পরিবেশীয় তাপমাত্রা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাপমাত্রা কম বা বেশি হলে বিপাকীয় কার্যাবলীর উপর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বেঁচে থাকার জন্য সকল উদ্ভিদের একটি সর্বোচ্চ শ্বসণ , পরিমিত  ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রয়েছে, যাকে কার্ডিনাল তাপমাত্রা বলা হয়। কোন আবাসস্থলে উদ্ভিদের বিস্তৃতি তার কার্ডিনাল তাপ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

যেমনঃ ধান গাছের অভিযোজন সর্বোচ্চ ৪০০ সে. এবং সর্বনিম্ন ৫০ সে. তাপমাত্রার মধ্যে সীমাবদ্ধ কিন্তু পরিমিত বা অনুকূল তাপমাত্রা ২০—৩০০ সে. এর মধ্যে। তাই উদ্ভিদের ভৌগলিক বিস্তৃতি তাপমাত্রার উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। তাপমাত্রার তারতম্যের উপর নির্ভর করে উদ্ভিদসম হকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায় ঃ

(১) মেগাথার্ম — যে সকল উদ্ভিদ অতি উচ্চ তাপমাত্রা সম্পন্ন অঞ্চলে জন্মায়।

(২) মেসোথার্ম — এরা মূলত উষ্ণ প্রধান অঞ্চলের উদ্ভিদ। তবে বাৎসরিক ঋতুভেদে অপেক্ষাকৃত কম উষ্ণতাও সহ্য করতে পারে।

(৩) মাইক্রোথার্ম — এরা নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের উদ্ভিদ বলে বছরের বেশির ভাগ সময়ই অপেক্ষাকৃত কম উষ্ণতা সহ্য করতে পারে।

(৪) হেকিস্টোথার্ম — এরা মেরু অঞ্চলের উদ্ভিদ, সারা বছর নিম্ন তাপমাত্রা সহনশীল।

অনুশীলন  ঃ আলো ও তাপমাত্রার উপর ভিত্তি করে উদ্ভিদের শ্রেণিবিন্যাস করুন। আপনার পরিচিত উদ্ভিদগুলোকে উল্লিখিত শ্রেণিবিন্যাসে বিভক্ত করুন।

বায়ুতে অবস্থিত ঈঙ২ গ্যাস উদ্ভিদের সালোক—সংশ্লেষণের জন্য অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। তবে এর মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি গ্রীন হাউজ প্রতিক্রিয়া ঘটানোর জন্য
দায়ী।

 

(গ) বায়ু :

বায়ু প্রবাহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও বিস্তৃতি প্রভাবিত করে। অনেক উদ্ভিদের বীজ একস্থান হতে অন্যস্থানে বায়ু দ্বারা স্থানান্তরিত হয়ে উদ্ভিদের বংশ বিস্তার ঘটায়। বহু উদ্ভিদের পরাগায়ণ বায়ুর মাধ্যমে হয়ে থাকে। মৃদু বায়ুতে উদ্ভিদের প্রস্বেদন হার কম। কিন্তু প্রবল বায়ুতে তা বৃদ্ধি পেয়ে উদ্ভিদের পানির চাহিদা বাড়িয়ে তোলে। প্রবল বায়ু দ্বারা সংঘটিত জটিলতার মধ্যে রয়েছে উদ্ভিদের আকৃতিগত বিকৃতি, ভেঙ্গে পড়া, ঘর্ষণজনিত ক্ষতিসাধন, ভূমিক্ষয় ইত্যাদি। এ ছাড়া বহু রোগের জীবাণু বায়ুবাহিত হয়ে উদ্ভিদ ও প্রাণীর রোগের কারণ ঘটায়। বায়ুতে অবস্থিত ঈঙ২ গ্যাস উদ্ভিদের সালোক—সংশ্লেষণের জন্য অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। তবে এর মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি গ্রীন হাউজ প্রতিক্রিয়া ঘটানোর জন্য দায়ী।

 

(ঘ) বায়ুর আর্দ্রতা :

বায়ুর জলীয় আর্দ্রতাকে আপেক্ষিক আর্দ্রতা হিসেবে প্রকাশ করা হয়। কোন বায়ুতে অবস্থিত জলীয়—বাষ্পের বর্তমান অবস্থা এবং একই বায়ু সম্পৃক্ত হলে কতটুকু জলীয় বাষ্প ধারণ ক্ষমতা রাখে তার অনুপাতকে আপেক্ষিক আর্দ্রতা বলে। আপেক্ষিক আর্দ্রতা শতকরা হিসেবে প্রকাশ করা হয়। বায়ুমন্ডলের উষ্ণতা কম—বেশির সাথে আপেক্ষিক আর্দ্রতাও কম—বেশি হয়। উষ্ণতা বাড়লে আপেক্ষিক আর্দ্রতা কমে। আবার উষ্ণতা কমলে আপেক্ষিক আপেক্ষিক আর্দ্রতা উদ্ভিদের প্রস্বেদন হার নিয়ন্ত্রণ করে বলে কোন্ অঞ্চলে কী ধরনের উদ্ভিদ জন্মাবে তা সে অঞ্চলের আপেক্ষিক আর্দ্রতার ওপর বহুলাংশে ি নর্ভরশীল।

আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায়। আপেক্ষিক আর্দ্রতা উদ্ভিদের প্রস্বেদন হার নিয়ন্ত্রণ করে বলে কোন্ অঞ্চলে কী ধরনের উদ্ভিদ জন্মাবে তা সে অঞ্চলের আপেক্ষিক আর্দ্রতার উপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। অনেক উদ্ভিদ আছে যারা শুষ্ক আবহাওয়ায় সংবেদনশীল কিন্তু আর্দ্র আবহাওয়ায় সহজেই জন্মাতে পারে। এদেরকে হাইগ্রোফাইটস বলে। যেমনঃ রাস্না, ঢেঁকিশাক ইত্যাদি।

 

(ঙ) বৃষ্টিপাত ও পানি :

উদ্ভিদ জীবনে পানির গুরুত্ব অপরিসীম। উদ্ভিদের শারীরবৃত্তীয় যাবতীয় কার্যক্রম পানির মাধ্যমেই সংঘটিত হয়। পানি সালোক—সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ার অন্যতম উপাদান। পানির অবর্তমানে উদ্ভিদের খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া চলতে পারে না। আর খাদ্য উৎপাদন ছাড়া উদ্ভিদের বেঁচে থাকার কথাই ভাবা যায় না। একারণেই পরিবেশীয় অন্যান্য উপাদান অপেক্ষা ভূপৃষ্ঠে উদ্ভিদ বিস্তারের ক্ষেত্রে পানির তাৎপর্য অনেক বেশি।

কোন স্থানে উদ্ভিদের ধরন, ি বকাশ, বিস্তৃতি, ইত্যাদি নির্ভর করে সে অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ও পানির প্রাপ্যতার ওপর। কোন স্থানে উদ্ভিদের ধরন, বিকাশ, বিস্তৃতি, ইত্যাদি নির্ভর করে সে অঞ্চলে বৃষ্টিপাত ও পানির প্রাপ্যতার উপর। আবার কোন এলাকায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নির্ভর করে অনেকটা উক্ত এলাকা সাগরের কতটা নিকটবর্তী, সাগর থেকে ভূমির দিকে প্রবাহিত বায়ুর গতিধারা, বায়ুতে জলীয় বাষ্পের প্রাচুর্যতা, অক্ষাংশ ইত্যাদির উপর। নিরক্ষীয় অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ সর্বাধিক, পক্ষান্তরে মেরুঅঞ্চলের বৃষ্টিপাত সর্বনিম্ন।

 

উদ্ভিদ বাসস্থানে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ও পানির প্রাপ্যতার উপর নির্ভর করে উদ্ভিদকে চারটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত করা যায় :

 

(১) জলজ উদ্ভিদ :

যে সকল উদ্ভিদ জলজ পরিবেশে আংশিক বা সব সময় জীবিকা নির্বাহ করে তাদেরকে জলজ উদ্ভিদ বলে। এরা নিমজ্জিত বা ভাসমান, মুক্ত বা নোঙ্গরাবদ্ধ হতে পারে, যেমনঃ কচুরীপানা, হাইড্রিলা, শেওলা, শাপলা ইত্যাদি। উভচর উদ্ভিদও জলজ উদ্ভিদের গোত্রেই পড়ে, যেমনঃ কলমী শাক এদের মূলকান্ড সুগঠিত নয়। অভিস্রবন চাপও খুব কম।

 

(২) সাধারণ উদ্ভিদ :

যে সকল উদ্ভিদ মাটিতে পরিমিত পানি থাকা অবস্থায় জন্মে তাদেরকে সাধারণ উদ্ভিদ বলে। এদের জীবন ধারণের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত ও নাতিশীতোষ্ণ জলবায়ুর প্রয়োজন। এদের জন্য জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা কোনটাই সহনীয় নয়, যেমনঃ গম, সরিষা, আম, জাম, কাঁঠাল ইত্যাদি। এদের মূল, কান্ড, শাখা—প্রশাখা সুগঠিত। অভিযোজন চাপ স্বাভাবিক।

(৩) মরুজ উদ্ভিদ :

যে সকল উদ্ভিদ শুষ্ক মাটিতে অথবা খুব কম বৃষ্টিপাত সম্পন্ন অঞ্চলে জন্মে তাদেরকে মরুজ উদ্ভিদ বলে। কম বৃষ্টিপাতসম্পন্ন এলাকায় জন্মে বলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এদের পাতা, কান্ড, মূল, অভ্যন্তরীণ ও শারীরবৃত্তীয় ক্ষেত্রে প্রচুর রূপান্তর হয়ে থাকে। এদের উদাহরণ হচ্ছে — ফণিমনসা, ক্যাকটাস, করবি, খেজুর, ঝাউ, ঘৃত কুমারী ইত্যাদি।জোয়ার ভাটা বিধৌত সমুদ্রতীরবর্তী এ ধরনের উদ্ভিদকে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ বলে, যেমনঃ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দরবনের সুন্দরী, গড়ান, গেওয়া, গোলপাতা ইত্যাদি।

 

(৪) লোনা মাটির উদ্ভিদ :

যে সকল উদ্ভিদ লবণাক্ত পানি বা মাটিতে জন্মে তাদেরকে লোনা মাটির উদ্ভিদ বলে। এ সকল উদ্ভিদের পাতা প্রায়ই রসালো এবং ভূগর্ভস্থ মল ূ থেকে মাটির উপরে খাড়াভাবে শ্বাস—মূল দেখা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই জরায়ুজ—অঙ্কুরোদগম ঘটে এবং উচ্চ অভিস্রবন চাপ বিদ্যমান। জোয়ার ভাটা বিধৌত সমুদ্র তীরবর্তী এ ধরনের উদ্ভিদকে ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ বলে, যেমনঃ বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে সুন্দরবনের সুন্দরী, গড়ান, গেওয়া, গোলপাতা ইত্যাদি।

আমাদের গুগল নিউজ ফলো করুন
আমাদের গুগল নিউজ ফলো করুন

২। মৃত্তিকাগত উপাদান

পরিবেশের মৃত্তিকাগত উপাদানের মধ্যে রয়েছে মাটির ভৌত ও রাসায়নিক গুণাবলী। মাটির গঠন, বুনট ইত্যাদি ভৌত গুণাবলী এবং মাটির অম্লত্ব, ক্ষারত্ব, লবণাক্ততা, খাদ্য উপাদান ইত্যাদি রাসায়নিক উপাদান দ্বারা উদ্ভিদের বর্ধন, বিকাশ ও বিস্তৃতি বহুলভাবে প্রভাবিত। মাটির পানি ধারণক্ষমতা তার ভৌত গুণাবলীর উপর নির্ভরশীল। অপরপক্ষে উদ্ভিদের খাদ্য সরবরাহের পরিমাণ মাটির রাসায়নিক গুণাবলীর উপর নির্ভরশীল। তাই সব মাটিতেই সব
উদ্ভিদ ভাল জন্মে না যেমনঃ ভারি মাটি ধান চাষের জন্য উপযোগী, অপর দিকে হালকা দো— অঁাশ মাটি আখ, গম, সরিষা, ইত্যাদি চাষের জন্য উপযুক্ত বলে বিবেচিত।

 

৩। স্থান সংক্রান্ত উপাদান

স্থান সংক্রান্ত উপাদানের মধ্যে রয়েছে

(ক) ভূমির উচ্চতা ও বন্ধুরতা

(খ) অক্ষাংশ এবং

(গ) ভূমির ঢাল ও দিক।

(ক) ভূমির উচ্চতা ও বন্ধুরতা ঃ সাগর—পৃষ্ঠ থেকে ভূমি কত উচ্চতায় অবস্থিত অথবা ভূমির উপরিভাগের বন্ধুরতার ধরন উদ্ভিদ জীবনকে প্রভাবিত করে। কারণ এ দ্বারা আলো ও পানির প্রাপ্যতা এবং স্থানীয় জলবায়ু বহুলাংশে নির্ভরশীল।

(খ) অক্ষাংশ ঃ অক্ষাংশের অবস্থান, স্থানীয় জলবায়ু, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আলোর পরিমাণ ইত্যাদি আবহাওয়াগত উপাদানের নির্দেশক এবং এসবকিছু দ্বারাই উদ্ভিদ ও প্রাণী বিস্তার প্রভাবিত হয়। পৃথিবীর নিম্ন অক্ষাংশের মরু অঞ্চল উচ্চ তাপ ও পানির অভাবে উদ্ভিদ ও প্রাণীর বসবাসের অনুপযোগী। আবার উচ্চ অক্ষাংশের মেরু অঞ্চল তীব্র শীত ও বরফজনিত কারণে বসবাসের অনুপযোগী।

(গ) ভূমির ঢাল ও দিক ঃ ভূমির ঢাল ও দিকের প্রভাব উদ্ভিদ ও প্রাণীর উপর বেশি অনুভূত হয় মধ্য ও উচ্চ অক্ষাংশে। নিম্ন অক্ষাংশে এর তেমন কোন প্রভাব পরিলক্ষিত হয় না। কারণ সূর্য সারা বৎসরই এখানে লম্বভাবে কিরণ দিয়ে থাকে। ভূমির ঢালের মাত্রাও এখানে গুরুত্বপর্ণ, কারণ ু ঢালের পরিমাণ বেশি খাড়া হলে পানি ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পায়। ফলে তা উদ্ভিদ জন্মানোর জন্য অনুকল নয়।

 

জৈবিক উপাদান

জীবকূলের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের প্রভাবকেই জৈবিক কারণ বলে। পরিবেশীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সকল প্রাণীই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একে অন্যের উপর নির্ভরশীল। সবুজ উদ্ভিদ খাদ্য প্রস্তুত প্রক্রিয়ায় বায়ুর যে ঈঙ২ গ্রহণ করে তা প্রাণীর শ্বসনজাত। পক্ষান্তরে প্রাণী নিঃশ্বাসের সাথে যে ঙ২ গ্রহণ করে তা উদ্ভিদের সালোক—সংশে­ষণ প্রক্রিয়ার উপজাত। প্রকৃতিতে উদ্ভিদ কর্তৃক ব্যবহৃত নাইট্রোজেনঘটিত খাদ্য ব্যাকটেরিয়া ও নীলাভ—সবুজ শৈবাল দ্বারা মাটিতে ধারণকৃত। তাছাড়া জীবকূলের মধ্যে রয়েছে সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা, মিথোজীবীতা, পরজীবীতা, পরাশ্রয়ীতা, ইত্যাদির মতো আরও অনেক ক্রিয়া কর্ম যা জীব সম্পর্কীয় উপাদানেরই অংশবিশেষ।

 

আরও দেখুন:

Leave a Comment