বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফসলের অবদান

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফসলের অবদান – নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “কৃষি পরিচিতি ও পরিবেশ” বিষয়ের “পরিবেশের উপাদান” বিষয়ের ইউনিট ১ এর ১.৬ নং পাঠ।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফসলের অবদান

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফসলের অবদান

 

বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। এদেশের মানুষের প্রধান পেশা হলো কৃষি অর্থাৎ ফসল উৎপাদন। বাংলাদেশের শতকরা ৬৮.৫ ভাগ মানুষ এ পেশায় নিয়োজিত এবং দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৩৫% আসে কৃষি থেকে। জাতীয় আয়ের সিংহভাগই (৩৯.৩৭%) যোগান দেয় এই কৃষি খাত (বি.বি.এস. ১৯৯৪)।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে দেশে ফসলী জমির পরিমাণ দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। সত্তর এর দশকে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ছিল প্রায় এক একর। বর্তমানে তা কমে এসে দাঁড়িয়েছে ০.২৫ একর। এই ক্রমহ্রাসমান জমি থেকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ করছে এদেশের বিভিন্ন ফসল। জমির পরিমাণ হ্রাস পেলেও ধান ও গমের উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে খাদ্য ঘাটতি গত বিশ বছর ধরে একই পর্যায়ে রয়েছে। বিগত ১৯৫০—৫১ অর্থ বছরে এদেশে খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৬২ লক্ষ টন। বিগত তিন দশকে দেশের খাদ্য উৎপাদনে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছে। ১৯৬০—৬১ অর্থবছরে খাদ্যশস্যের উৎপাদন ৯৭ লক্ষ টনে উন্নীত হয়।

১৯৮৯—৯০ সনে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ৬৪ লাক্ষ টনে । অর্থাৎ ২৯ বছরে এদেশে খাদ্য শস্যের উৎপাদন প্রায় দ্বিগুন বেড়েছে। এসময় খাদ্য শস্যের প্রবৃদ্ধির হার ছিল শতকরা ২.২০ এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি ছিল ২.২৮ ভাগ। ১৯৯২—৯৩ অর্থ বছরে খাদ্য শস্যের উৎপাদন দাঁড়ায় ১ কোটি ৭২ লক্ষ টনে। উৎপাদন বাড়লেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য আমাদের খাদ্য ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। এসব তথ্য থেকে দেখা যায় খাদ্য শস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি না হলে ক্রমহ্রাসমান জমিতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পরণ সম্ভব হতো না। কৃষিতে উন্নত ূ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনের ফলেই তা সম্ভব হচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফসলের অবদান , কৃষি পরিচিতি ও পরিবেশ , ইউনিট ১ , পাঠ-১.৫

তাই একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফসল খুবই গুরূত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশের প্রধান ফসলগুলো হলো, ধান, গম, পাট, আখ, তামাক, চা, আলু, ডাল ও তৈল জাতীয় শস্য।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফসল এর অবদান:

ধান

বর্তমানে ৩৯টি উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান উদ্ভাবন করা হয়েছে যার প্রায় অধিকাংশই কৃষক পর্যায়ে মাঠে চাষ করা হয়।
বাংলাদেশে ধানের জমির পরিমাণ কমলেও প্রতি একক জমিতে এর উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আগে ধানের উৎপাদন হার ছিল হেক্টরপ্রতি ২—৩ টন আর এখন তা ৫—৬ টনে উন্নীত হয়েছে। বর্তমানে ৩৯টি উচ্চ ফলনশীল জাতের ধান উদ্ভাবন করা হয়েছে যার প্রায় অধিকাংশই কৃষক পর্যায়ে মাঠে চাষ করা হয়। ১৯৭০ সালে চালের উৎপাদন ছিল প্রায় ১০ মিলিয়ন টন বর্তমানে তা প্রায় ১৯ মিলিয়ন টনে উন্নীত হয়েছে। এর পরও এদেশে চালের ঘাটতি রয়েছে যা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়।

 

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফসলের অবদান , কৃষি পরিচিতি ও পরিবেশ , ইউনিট ১ , পাঠ-১.৫

গম

দানা জাতীয় খাদ্য শস্যের মধ্যে ধানের পরই গমের স্থান। গম বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খুব একটা ভূমিকা না রাখলেও ধানের সহকারী খাদ্য হিসেবে গম তার স্থান করে নিয়েছে। দেশে বেশি পরিমাণে জমি সেচের আওতায় আসার ফলে এবং গমের চেয়ে বাঙালিরা ভাত বেশি পছন্দ করে বিধায় বর্তমানে গমের জমির পরিমাণ এবং উৎপাদন দুই—ই স্থিতিশীল হয়ে আসছে। গমের ফলন বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষনা ইনষ্টিটিউট অদ্যাবধী ১৬টি উচ্চ ফলনশীল গমের জাত উদ্ভাবন করেছে এবং কৃষকের মাঠে এগুলোর প্রায় সব ক’টি চাষ করা হচ্ছে। ১৯৯৭—৯৮ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৮০.৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে ১৮ লক্ষ মেট্রিক টন গম উৎপন্ন হয়েছে।

 

পাট

পাট বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। বর্তমানে বিশ্ব বাজারে পাটের চহিদা কমে যাওয়ায় তার দামও কমে গেছে; ফলে পাট চাষে কৃষকদের উৎসাহ কমে গেছে। কিছুদিন আগেও বাংলাদেশ বিশ্বের ৬৯টি দেশে পাট রপ্তানি করত । উৎপাদিত পাট ও পাটজাত দ্রব্যের ৭০% বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। আগে প্রতি বছর বাংলাদেশে ৭০ লক্ষ বেল পাট উৎপন্ন হ’তো যা বর্তমানে এসে ঠেকেছে ৪০ লক্ষ বেলে। ১৯৯২—৯৩ অর্থবছরের মার্চ ’৯৩ পর্যন্ত ৭৮৮ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা পাটজাত দ্রব্য এবং ২২৪ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা কাঁচা পাট রপ্তানি করে আয় হয়।

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ১৬% আয় হয় পাট ও পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করে। বর্তমানে ঔষধ ও পোষাক শিল্পের প্যাকেজিংয়ের জন্য প্রায় ১১ শ’ কোটি টাকা মূল্যের ১ লক্ষ ৪ হাজার টন ইন্ডাষ্ট্রিয়াল গ্রেড কাগজ আমদানি হচ্ছে। পাটজাত দ্রব্য দিয়ে এ কাগজ তৈরি করে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব। জুটন (৭০% পাট + ৩০% সুতা) তৈরি করতে এখন পাটের আঁশ ব্যবহৃত হচ্ছে। নদীর বাঁধ ভাঙ্গন রোধে চটের বস্তা গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করছে।

আমাদের গুগল নিউজ ফলো করুন
আমাদের গুগল নিউজ ফলো করুন

চা

চা বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান অর্থকরী ফসল। চা বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান অর্থকরী ফসল। ১৯৯৭—৯৮ সনে চা বাগানের আওতায় জমির পরিমাণ ছিল ৪৮.৫ হাজার হেক্টর এবং উৎপাদন ছিল ৫০.৫ হাজার মেট্রিক টন। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে এর প্রায় অর্ধেক পরিমাণ বিদেশে রপ্তানি করা হয়। চা রপ্তানি করে ১৯৮৮—৮৯ অর্থ বছরে আয় হয়েছে ১২০৮ মিলিয়ন টাকা, ১৯৮৯—৯০ অর্থবছরে ১২০১ মিলিয়ন টাকা, ১৯৯০—৯১ অর্থবছরে ১৫৪৪ মিলিয়ন টাকা, ১৯৯১—৯২ অর্থবছরে ১২৯৬ মিলিয়ন টাকা। বংলাদেশে চা এর উৎপাদন দিন দিন বাড়ছে।

 

আখ

আখ বাংলাদেশের চিনি ও গুড় উৎপাদনকারী প্রধান অর্থকরী ফসল। আখ বাংলাদেশের চিনি ও গুড় উৎপাদনকারী প্রধান অর্থকরী ফসল। বর্তমানে দেশে ১,৭৪,০০০ হেক্টর জমিতে আখ উৎপন্ন হয় এবং বাৎসরিক গড় উৎপাদন ৭২—৭৬ লক্ষ টন। উৎপাদিত আখের ২৩ লক্ষ টন ব্যবহৃত হয় চিনি উৎপদনের জন্য এবং ৩১ লক্ষ টন আখ ব্যবহৃত হয় গুড় উৎপাদনের জন্য।

বাকী আখ বীজ হিসেবে ও চিবিয়ে খাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। দেশে বর্তমানে চিনি ও গুড় উৎপাদনের পরিমাণ যথাক্রমে ১.৯ লক্ষ এবং ৩ লক্ষ টন। দেশে বাৎসরিক ৩ লক্ষ টন চিনি এবং ৬ লক্ষ টন গুড়ের চহিদা মিটাতে ১ কোটি ১০ লক্ষ টন আখ উৎপাদন প্রয়োজন। আখের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ইক্ষু গবেষণা ইনষ্টিটিউট ২৩ টি উচ্চ ফলনশীল ইক্ষু জাত উদ্ভাবন করেছে। দেশে চিনির চাহিদা মিটানোর জন্য প্রতিবছর প্রায় এক লক্ষ টন চিনি আমদানি করতে হয়।

 

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফসলের অবদান , কৃষি পরিচিতি ও পরিবেশ , ইউনিট ১ , পাঠ-১.৫

তামাক

তামাক বাংলাদেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ের অন্যতম উৎস। বাংলাদেশে বর্তমানে ৮৯ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৩৬ হাজার মেট্রিক টন তামাক উৎপন্ন হয় যা দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটাতে সক্ষম।

 

ডাল জাতীয় শস্য

দেশে ডাল জাতীয় শস্যের চাহিদার প্রায় বেশির ভাগই বর্তমানে আমদানি করতে হয়। বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে ডাল জাতীয় শস্যের জমির পরিমাণ ও উৎপাদন কমে গেছে। দেশে সেচের আওতায় জমির পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার ফলে কৃষকেরা এখন সে জমিতে ডালের পরিবর্তে ধান চাষ করছে তবে ডালের ফলন বৃদ্ধির জন্য সরকার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনষ্টিটিউট ও বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি ইনষ্টিটিউট বেশ কয়েক জাতের মসুর, ছোলা, মুগ ও মাষ কলাইয়ের উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে।

 

তৈলবীজ জাতীয় শস্য

সরিষা বাংলাদেশের প্রধান তৈলবীজ জাতীয় শস্য। বর্তমানে তৈলবীজ জাতীয় শস্য হিসেবে দেশে সয়াবীনের চাষ হচ্ছে এবং সয়াবীন চাষের উজ্জ্বল সম্ভবনা রয়েছে। কিন্তু সয়াবীন ক্রাস করার মেশিন না থাকায় আমাদের তেলের ঘাটতি মিটাতে প্রতি বছর ৩ থেকে ৬ হাজার মিলিয়ন টাকার সয়াবীন তৈল বিদেশ হ’তে আমদানি করতে হয়। এদেশে তৈল বীজ জাতীয় ফসলের জমির পরিমাণ স্থিতিশীল রয়েছে। তৈলবীজ শস্যের ফলন বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের কৃষি গবেষনা প্রতিষ্ঠান সমূহ সরিষার ১০টি, চীনাবাদামের ৬টি, গর্জনতিলের ৩টি ও তিষির ১টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। এগুলো চাষের আওতাভূক্ত জমির পরিমাণ বাড়াতে পারলে তৈল আমাদানির পরিমাণ কমে আসবে এবং
দেশের অর্থনীতিতেও যথেষ্ট অবদান রাখবে।

অন্যান্য:

রাবার দেশে রাবার উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় কাঁচা রাবার আমদানি ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে এবং এ খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হচ্ছে। বর্তমান (১৯৯৪—৯৫) অর্থ বছরে এই সাশ্রয়ের পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা। বিভিন্ন রাবার বাগান হ’তে বর্তমানে প্রায় ৩ হাজার টন কাঁচা রাবার উৎপাদন হচ্ছে যা দিয়ে দেশের ২৫০টি রাবার জাত দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মোট বার্ষিক চাহিদার ৩০% মিটানো সম্ভব হচ্ছে। ফুল, ফল ও শাকসব্জি ঢাকায় বর্তমানে প্রতিদিন ৫ লক্ষ টাকা মূল্যের তাজা ফুল বিক্রি হচ্ছে।

বাংলাদেশে ফুল এখন বাণিজ্যিক পণ্য। ঢাকায় বর্তমানে প্রতিদিন ৫ লক্ষ টাকা মূল্যের তাজা ফুল বিক্রি হচ্ছে । দেশে বর্তমানে ২ হাজার বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ হচ্ছে্ । প্রায় ১৫ হাজার লোক প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে ফুল ব্যবসার সাথে জড়িত। ১৯৯৩—৯৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১২ লক্ষ টাকা ম ল্যের তাজা ফুল সৌদি আরবে রপ্তানি করে। ফলের উৎপাদন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং যে পরিমাণ উৎপন্ন হচ্ছে তাতে দেশের চাহিদা পূরণ হচ্ছে।

কাঁঠালসহ কিছু ফল বিদেশে রপ্তানিও হচ্ছে । বর্তমানে বাংলাদেশ হ’তে ১৫টিরও অধিক দেশে ৪৮ প্রকারের শাকসব্জি রপ্তানি হচ্ছে । ১৯৯২—৯৩ অর্থবছরে ৩১৩.৫ মিলিয়ন টাকার এবং ১৯৯৩—৯৪ অর্থবছরে ৩২৩.৫ মিলিয়ন টাকার সব্জি বিদেশে রপ্তানি করা হয়। দেশে সব্জি উৎপাদন করার লক্ষ্যে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সমূহ বিভিন্ন জাতের উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে।

উপরের আলোচনা হ’তে এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশ কৃষির উপর নির্ভরশীল হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে এদেশের ফসলসমূহ অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে আশানুরূপ অবদান রাখতে পারছে না। প্রাকৃতিক দূর্যোগ, সুষ্ঠু পরিল্পনার অভাব, কৃষি নীতিমালা বাস্তবায়নে অসফলতা, কৃষকদের অজ্ঞতা ও দারিদ্র, গবেষণা ও সম্প্রসারণের মধ্যে যোগাযোগের অভাব ইত্যাদিই প্রধান কারণ। দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ফসলের অবদান আরোও বাড়বে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

 

আরও দেখুন:

 

Leave a Comment