কেঁচো সারের গ্রাম সুখছড়ি: টেকসই কৃষির আদর্শ মডেল

চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের এক নির্জন পাহাড়ঘেরা জনপদ — সুখছড়ি গ্রাম। এক সময় শুধু ধান ও মৌসুমী সবজির চাষ করে সীমিত আয় করা কৃষকেরা এখন নতুন পরিচয়ে পরিচিত: ভার্মি কম্পোস্ট গ্রাম’
এই গ্রামের কৃষকেরা, বিশেষ করে নারী কৃষকগোষ্ঠী, বর্তমানে বাংলাদেশের টেকসই কৃষি বিপ্লবের এক শক্তিশালী মডেল হয়ে উঠেছেন।

 

যে গ্রামের অর্ধশত মানুষ কেঁচো সার উৎপাদন করেন

 

সূচনার গল্প: এক কিষানির হাত ধরে যাত্রা

২০১৭ সালে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার অনুপ্রেরণায় গ্রামের একজন কিষানি অঞ্জু মজুমদার মাত্র ২৫০ গ্রাম কেঁচো সংগ্রহ করে শুরু করেন ঘরোয়া পরিসরে কেঁচো সার (ভার্মি কম্পোস্ট) তৈরি। নিজের গৃহস্থালির গরুর গোবর, রান্নাঘরের জৈব বর্জ্য ও শাকসবজির খোসা দিয়ে তৈরি কম্পোস্টে তিনি ৪৫ দিনে ৫০০ কেজি পর্যন্ত কেঁচো সার উৎপাদন করেন।

বর্তমানে তাঁর সংগ্রহে রয়েছে কেজির বেশি কেঁচো এবং কয়েকটি চেম্বার।
তিনি প্রতি দেড় মাসে:

  • ✔️ ৫০০ কেজি ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করেন
  • ✔️ নিজের ফল ও সবজির বাগানে তা ব্যবহার করেন
  • ✔️ উদ্বৃত্ত সার বিক্রি করে নিয়মিত আয় করেন

অঞ্জুর এই উদ্যোগ আজ সুখছড়ির আরও ৫০ জন নারী পুরুষ কৃষকের অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

কেঁচো সার 1 কেঁচো সারের গ্রাম সুখছড়ি: টেকসই কৃষির আদর্শ মডেল

 

একটি গ্রামের টেকসই কৃষি বিপ্লব

২০২০ সালে উপজেলা কৃষি অফিস সুখছড়িকে ‘ভার্মি কম্পোস্ট গ্রাম’ ঘোষণা করে, যা ছিল এ অঞ্চলে প্রথম। আজ এ গ্রামে প্রতিটি কৃষকের ঘরেই রয়েছে ভার্মি কম্পোস্টের চেম্বার।

প্রেক্ষিত পরিসংখ্যান:
বিষয়পরিমাণ
কেঁচো সার উৎপাদনে সক্রিয় কৃষকপ্রায় ৫০ জন
প্রতিজনের চেম্বার সংখ্যা২–৫টি
উৎপাদন (৪৫ দিনে)৮০–৫০০ কেজি
বিক্রয়মূল্য (সার)১২ টাকা/কেজি
বিক্রয়মূল্য (কেঁচো)১,০০০–১,৫০০ টাকা/কেজি

👉 কিছু কৃষক বছরে ৪০,০০০–৬০,০০০ টাকা পর্যন্ত আয় করছেন কেবল কেঁচো সার বিক্রি করে।

 

প্রতিবন্ধী কৃষকের সাফল্য: জসিম উদ্দিনের গল্প

সাইরাপাড়া এলাকার প্রতিবন্ধী কৃষক জসিম উদ্দিন এই উদ্যোগে যুক্ত হয়ে নিজের জমিতে জৈব সার ব্যবহার শুরু করেন। নিজ চাহিদা মিটিয়ে বাকি সার বিক্রি করে তিনি বছরে গড়ে ৪০,০০০ টাকা আয় করেন।

“এই সার কম খরচে বেশি ফলন দেয়। মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকে, সবজির স্বাদও অন্যরকম হয়।” — জসিম উদ্দিন

 

কেন কেঁচো সার (ভার্মি কম্পোস্ট) জনপ্রিয় হচ্ছে?

কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট একটি জৈব সার যা বিশেষ ধরনের কেঁচো (যেমন Eisenia fetida) দিয়ে গরুর গোবর ও জৈব বর্জ্য পচিয়ে তৈরি করা হয়। এটি:

✅ মাটির জৈবগুণ বৃদ্ধি করে
✅ পিএইচ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক
✅ জলধারণ ক্ষমতা বাড়ায়
✅ উদ্ভিদের শিকড় মজবুত করে
✅ রাসায়নিক সারের চাহিদা হ্রাস করে
✅ ফসলের স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও সংরক্ষণযোগ্যতা বাড়ায়
✅ পরিবেশবান্ধব ও দীর্ঘস্থায়ী উপযোগিতা রাখে

 

বিশেষজ্ঞদের মতামত

🔬 কাজী শফিউল ইসলাম, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা:

“২০১৭ সালে মাত্র দুজন কৃষক শুরু করেছিলেন। এখন সুখছড়িতে প্রায় ৫০ জন কৃষক কেঁচো সার উৎপাদনে নিয়োজিত। এটি এই অঞ্চলে কৃষি ভিত্তিক অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছে।”

🔬 এম নাজিম উদ্দিন, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট:

“জৈব সারই হচ্ছে ভবিষ্যতের কৃষি। রাসায়নিক সারের বিকল্প হিসেবে ভার্মি কম্পোস্ট কৃষিকে টেকসই ও আমদানি নির্ভরতা হ্রাসে ভূমিকা রাখবে।”

 

ভৌগোলিক সুবিধা: টঙ্কাবতী নদীর অবদান

সুখছড়ি গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত টঙ্কাবতী নদী বর্ষায় উর্বর পলিমাটি জমিতে জমা করে, যা কেঁচো সারের প্রভাবকে আরও শক্তিশালী করে। এই মাটি সুনিষ্কাশনযোগ্য, জলধারণে সক্ষম এবং ফসলে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়।

 

অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও নারীর ক্ষমতায়ন

ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের ফলে:

  • ✅ গৃহস্থ নারীদের আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে
  • ✅ স্বনির্ভর নারী কৃষকের সংখ্যা বেড়েছে
  • ✅ রাসায়নিক সার কেনার খরচ কমেছে
  • ✅ ছোট চাষিদের জন্য নতুন উদ্যোক্তা হওয়ার পথ খুলেছে

 

টেকসই কৃষি ও জলবায়ু অভিযোজন

বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে কৃষি খাত ক্রমেই ঝুঁকিতে পড়ছে। কেঁচো সার:

🌾 কার্বন নির্গমন কমায়
🌾 মাটির জৈবগুণ রক্ষা করে
🌾 পরিবেশ দূষণ থেকে মুক্ত রাখে
🌾 দীর্ঘমেয়াদে জমির উৎপাদনশীলতা বজায় রাখে

👉 এর ফলে কেঁচো সার-ভিত্তিক কৃষি জলবায়ু অভিযোজনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

 

বাংলাদেশের মডেল গ্রাম সুখছড়ি

সুখছড়ির কেঁচো সার-ভিত্তিক কৃষি উদ্যোগ বাংলাদেশের জৈব কৃষি উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি প্রামাণ্য অনুকরণীয় উদাহরণ। এখানে ছোট উদ্যোগ আজ বৃহৎ কৃষি আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
এই ধারা অব্যাহত থাকলে সুখছড়ি কেবল একটি ‘গ্রাম’ নয়, হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের জৈব কৃষি কেন্দ্রবিন্দু

📢 সরকার, উন্নয়ন সংস্থা ও কৃষি উদ্যোক্তাদের উচিত—এই মডেলকে জাতীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা বাড়ানো।