কৃষি উৎপাদনের মূল ভিত্তি হলো জমি। একটি জমি তখনই প্রকৃত অর্থে উর্বর বলে গণ্য হয়, যখন তা উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান, পানি ও বাতাস সঠিক অনুপাতে দীর্ঘ সময় ধরে সরবরাহ করতে সক্ষম হয়। অর্থাৎ, মাটির এমন ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব বৈশিষ্ট্যের উপস্থিতিই উর্বর জমি তৈরি করে, যা উদ্ভিদের সুস্থভাবে বেড়ে ওঠা এবং কাঙ্ক্ষিত ফলন নিশ্চিত করতে সহায়ক।
বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভর করে এই উর্বর জমির সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর। সঠিক যত্ন ও বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি প্রয়োগের মাধ্যমে উর্বর জমিকে উৎপাদনক্ষম রাখা গেলে টেকসই কৃষি উন্নয়ন সম্ভব।
Table of Contents
জমির উর্বরতা সংজ্ঞা ও ভূমিকা

জমির উর্বরতার সংজ্ঞা ও ভূমিকা
সব জমি একরকম নয়—কোনোটি অত্যন্ত উর্বর, আবার কোনোটি স্বাভাবিকভাবেই অনুর্বর। জমির প্রকৃত উর্বরতা নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন মাটির রাসায়নিক, ভৌত ও জৈব পরীক্ষা।
উর্বরতা কী?
উর্বরতা হলো—
মাটি উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় সব পুষ্টি নির্দিষ্ট অনুপাতে, পর্যাপ্ত পরিমাণে এবং গ্রহণযোগ্য অবস্থায় সরবরাহ করতে পারছে কি না, সেই সক্ষমতা।
উৎপাদনক্ষমতা কী?
উৎপাদনক্ষমতা বোঝায়—
বাস্তবে একটি জমি কতটুকু ফলন দিতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো:
একটি জমি উর্বর হলেও উৎপাদনক্ষম নাও হতে পারে, যদি—
- অতিরিক্ত আর্দ্রতা বা খরা থাকে
- অতিরিক্ত অম্লতা বা লবণাক্ততা থাকে
- জলাবদ্ধতা দেখা দেয়
- নিষ্কাশনের অভাব থাকে
- পুষ্টি উপাদান গাছের গ্রহণযোগ্য রূপে না থাকে
অর্থাৎ, ভাল মাটিও ভুল ব্যবস্থাপনার কারণে কম ফলন দিতে পারে।

জমিকে অনুর্বর করে যে সমস্যা গুলো
নিম্নোক্ত কারণে একটি জমির কার্যকর উৎপাদনক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে—
| সমস্যার ধরন | ব্যাখ্যা |
|---|---|
| অতিরিক্ত অম্লতা/ক্ষারত্ব | মাটির pH বিঘ্নিত হলে পুষ্টি গ্রহণ ব্যাহত হয় |
| লবণাক্ততা | শিকড় সঠিকভাবে পানি ও পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে না |
| জলাবদ্ধতা | শ্বাসক্রিয়া কমে, বিষাক্ত উপাদান জমে |
| নিষ্কাশনের দুর্বলতা | মাটি দমবন্ধ হয়ে যায়, শিকড় পচে যেতে পারে |
| বিষাক্ত উপাদান | যেমন– অ্যালুমিনিয়াম, লোহা, বোরণ অতিরিক্ত হলে গাছের ক্ষতি হয় |
এই সমস্যাগুলো সমাধান করা গেলে অনুর্বর জমিও সময়ের সঙ্গে উৎপাদনক্ষম করা সম্ভব।
বাংলাদেশের মাটিতে উর্বরতার চিত্র
বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবে বিভিন্ন ধরনের ফসল জন্মায়, তবে সব অঞ্চলের ফলন সমান নয়। এর প্রধান কারণ—
- মাটির উর্বরতার পার্থক্য
- ব্যবস্থাপনার মান
- বারবার চাষের কারণে পুষ্টি নিঃশেষ হয়ে যাওয়া
সবচেয়ে ঘাটতি দেখা যায় যে পুষ্টি উপাদানে:
- নাইট্রোজেন (N)
- ফসফরাস (P)
- পটাশিয়াম (K)
ফসল লাগাতার ওঠানোর ফলে মাটির খাদ্যভান্ডার দ্রুত ফুরিয়ে যায় এবং ফলন কমতে থাকে।
জৈব পদার্থ—উর্বরতার প্রাণ
জৈব পদার্থ মাটির গঠনকে উন্নত করে এবং—
- পানি ধারণক্ষমতা বাড়ায়
- মাটির বায়ু চলাচল উন্নত করে
- মাটির অণুজীব বৃদ্ধি করে
- পুষ্টি উপাদান ধীরে ধীরে সরবরাহ করে
বাংলাদেশের অধিকাংশ জমিতে জৈব পদার্থের ঘাটতি রয়েছে (২%–এর নিচে), যা উর্বরতা হ্রাসের অন্যতম কারণ।
উর্বরতা বজায় রাখার জন্য করণীয়
উর্বর জমিকে উৎপাদনক্ষম রাখতে যে বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে—
- সুষম সার প্রয়োগ
- জৈব সার ও কম্পোস্ট ব্যবহার বৃদ্ধি
- সঠিক ফসল চক্র (শস্য পর্যায়) অনুসরণ
- উন্নত পানি ব্যবস্থাপনা
- সঠিক হালচাষ ও ভূমিব্যবস্থাপনা
- আগাছা, পোকা ও রোগ দমন
- সবুজ সার ফসল ব্যবহার
এসব ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করলে মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলন বৃদ্ধি পায়।
সারসংক্ষেপ
জমির উর্বরতা ও উৎপাদনক্ষমতা শুধুমাত্র কৃষি উৎপাদনের বিষয় নয়—এটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বিজ্ঞানসম্মত প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে—
- মাটির পুষ্টি সংরক্ষণ
- উৎপাদন বৃদ্ধি
- পরিবেশবান্ধব কৃষি
- ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য টেকসই খাদ্যব্যবস্থা
নিশ্চিত করা সম্ভব।
