জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা ২০২০

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা ২০২০।

Table of Contents

জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা ২০২০

 

জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা ২০২০

 

১ ভূমিকা

১.১ : অধিকতর দক্ষতা এবং শ্রম ও সময় সাশ্রয়ী উপায়ে কৃষি উৎপাদন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে মানুষ ও প্রাণীশক্তির ব্যবহার হ্রাস করে অধিক পরিমাণে যন্ত্রশক্তি ব্যবহারের প্রযুক্তি ও কলাকৌশল প্রয়োগের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাকে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বলা হয়।

যান্ত্রিকীকরণের ফলে কৃষি কাজে ব্যবহৃত উপকরণ, সময়, শ্রম ও অর্থের সাশ্রয় হয়। সেই সঙ্গে ফসল আবাদের দক্ষতা, নিবিড়তা, উৎপাদনশীলতা ও শস্যের গুণগতমান বৃদ্ধি পায় এবং কৃষি কাজ লাভজনক ও কর্মসংস্থানমুখী হয়। এছাড়াও প্রতিকুল পরিবেশে যন্ত্রের ব্যবহারে উৎপাদন নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

১.২ : বাংলাদেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের সূচনা হয় কৃষকদের মাঝে সরকারিভাবে যন্ত্র সরবরাহের মাধ্যমে। ১৯৫০ দশকের প্রথম দিকে যান্ত্রিক চাষাবাদ শুরু হয় এবং সরকারি উদ্যোগে কৃষকদের মাঝে ট্রাক্টর, শক্তিচালিত পাম্প এবং স্প্রেয়ার বিতরণের মাধ্যমে কৃষক পর্যায়ে কৃষিযন্ত্রের প্রচলন করা হয়। ১৯৭০ সালে উপকূলীয় অঞ্চলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ের কারণে গবাদি প্রাণীর ব্যাপক প্রাণহানির পরিপ্রেক্ষিতে উপদ্রুত এলাকায় চাষাবাদের জন্য সীমিত সংখ্যক ট্রাক্টর এবং পাওয়ার টিলার বিতরণ করা হয়।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর নির্দেশনায় ১৯৭৩ সালে দ্রুততম সময়ে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো নামমাত্র মূল্যে ভর্তুকি দিয়ে ৪০ হাজার শক্তিচালিত লো লিফ্ট পাম্প, ২ হাজার ৯ শত গভীর নলকূপ এবং ৩ হাজার অগভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়। আধুনিক কৃষিযন্ত্র সম্প্রসারণে এটি ছিল ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

১.৩ : ১৯৮৮ সালের সারা দেশব্যাপী দীর্ঘস্থায়ী বন্যায় ফসল ও প্রাণিসম্পদের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। এ পরিপ্রেক্ষিতে কৃষিযন্ত্র আমদানির উপর শুল্ক প্রত্যাহার, আমদানিকৃত কৃষি যন্ত্রপাতির মান পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা শিছিল ও এককভাবে সরকারি খাতে আমদানি করার পরিবর্তে বেসরকারি যাতে আমদানিকারকদের উৎসাহিত করা হয়। ফলে ব্যক্তিখাতের আমদানিকারকগণ ব্যাপকভাবে ছোট ইঞ্জিন ও পাওয়ার টিলার আমদানি করা শুরু করেন, যা দেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রক্রিয়াকে গতিশীল করে তোলে।

১.৪ : বর্তমান কৃষি ব্যবস্থায় একদিকে শ্রমসংকট অন্যদিকে কষ্টসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে হয় বলে কৃষকদের স্বল্প শিক্ষিত সন্তানেরাও প্রচলিত কায়িক শ্রম নির্ভর কৃষি কাজের প্রতি আগের মতো উৎসাহ পান না। ফলে গ্রামের স্বল্প শিক্ষিত তরুণরা কৃষিতে আগের মতো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে এ তরুণদের কৃষির প্রতি আরো আগ্রহী করে তোলা সম্ভব। এ জন্য সরকারের অগ্রণী ভূমিকার পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকিং যাতকে আর্থিক সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

১.৫ : চিরায়ত খোরপোশ কৃষি থেকে ক্রমান্বয়ে বাণিজ্যিক কৃষির রূপান্তরে যান্ত্রিকীকরণ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বাণিজ্যিক কৃষির অগ্রযাত্রায় কৃষি যান্ত্রিকীকরণের প্রসার এখন একটি সময়ের দাবী। ইতোমধ্যে গ্রামাঞ্চলে অসংখ্য কৃষি স্ত্রপাতি মেরামত কারখানা বা সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। দেশে এখন জমি কর্ষণ, সেচ, ফসল মাড়াই ও কীটনাশক ছিটানো প্রায় পুরোটাই যন্ত্রের সাহায্যে করা হয়।

তবে রোপণ, বপন, সার প্রয়োগ, ফসল কর্তন, ঝাড়াই- বাছাই ইত্যাদি কাজ এখনও পুরোপুরি যন্ত্রের সাহায্যে করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি, যদিও অনুকূল নীতি সমর্থনের ফলে আমাদের হেক্টর প্রতি যন্ত্রশক্তির ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এক্ষেত্রে শক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধির আরো সুযোগ রয়েছে। যন্ত্র সরবরাহ এবং সহজলভ্যতার ফলে কৃষি যন্ত্রপাতির প্রতি কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে যা অব্যাহত রাখা এবং আরো গতিশীল করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

১.৬ : এ নীতিমালায় ফসল উৎপাদন ব্যবস্থাপনার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বিধায় মূল্য সংযোজিত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সেড বিষয়াদি এক্ষেত্রে বিবেচনায় নেয়া হয়নি।

২.০ কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালার ভিশন, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

২.১ ভিশন

কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে দক্ষ, লাভজনক ও বাণিজ্যিক কৃষি ব্যবস্থায় উত্তরণ এবং টেকসই খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ।

২.২ লক্ষ্য

২.২.১ : কৃষকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, খামারের ক্ষুদ্র আয়তন ও খণ্ডিত জমি এবং মাটির প্রকারভেদ অনুযায়ী কৃষক বান্ধব কৃষি যন্ত্রপাতির প্রচলন উৎসাহিত করা।

২.২.২ : বৈচিত্রপূর্ণ কৃষি পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিবেচনায় রেখে কৃষি কর্ম ও পেশাকে অধিকতর দক্ষ, ঝুঁকিমুক্ত ও সহজসাধ্য করা।

২.২.৩ : লাভজনক, বাণিজ্যিক ও টেকসই কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার লক্ষ্যে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ গতিশীল করা।

২.৩ উদ্দেশ্য

১) কৃষক পর্যায়ে ব্যয় সাশ্রয়ী ও মুনাফা বৃদ্ধিকারী কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার ত্বরান্বিত করা।

২) কৃষি শ্রমিকের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করা।

৩) শস্যের ফলন বৃদ্ধির জন্য জমিতে যান্ত্রিক, বৈদ্যুতিক ও নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার বাড়ানো।

৪) শস্য নিবিড়তা বৃদ্ধি করা যাতে সার্বিকভাবে ফসলের উৎপাদন বাড়ে।

৫) কৃষি যন্ত্রপাতির উপর গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করা।

৬) স্থানীয় কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারকদের উৎসাহিত করা ও প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থায় টিকে থাকার জন্য সহায়তা প্রদান করা।

৭) কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার জন্য আমদানিকারক, প্রস্তুতকারক, ভাড়ায় যন্ত্র সেবা প্রদানকারী ও কৃষকদের সহজ ও বিশেষায়িত ঋণ সুবিধা সহজলভ্য করা।

৮) স্থানীয় কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারক ও আমদানিকারক কর্তৃক সরবরাহকৃত কৃষি যন্ত্রপাতি ও খুচরা যন্ত্রাংশের মান ঘোষণা ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান থেকে মান নির্ধারণের সুযোগ নিশ্চিত করা।

৯) মাঠ ফসল ছাড়াও উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল চাষে যান্ত্রিকীকরণ জোরদার করা।

১০)কৃষি যন্ত্রপাতির সেবা প্রদান, প্রশিক্ষণ, বহুমুখী ব্যবহার এবং মেরামত ব্যবস্থা শক্তিশালী করা।

৩.০ কৃষি যান্ত্রিকীকরণের চ্যালেঞ্জ

৩.১ ছোট খামার ও খন্ড খন্ড জমি

বাংলাদেশে খামারের গড় আয়তন ছোট এবং খন্ডে খন্ডে বিভক্ত। ফলে খণ্ডিত জমিতে চাষ, বপন, রোপণ, কর্তন ইত্যাদিতে যন্ত্রের ব্যবহার বেশ কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল। এমনকি ছোট ও মাঝারি আকারের কৃষিযন্ত্রের পূর্ণ ক্ষমতার ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।

৩.২ কৃষি যন্ত্রপাতি ক্ররে কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা

বিশ্বব্যাপী ধাতব কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধির ফলে কৃষি যন্ত্রপাতির মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক এবং কৃষিযন্ত্রের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অধিকাংশের নিজ অর্থায়নে ব্যয়বহুল কৃষিযন্ত্র (যেমনঃ ধান রোপণ, বপন, কর্তন ও মাড়াই যন্ত্র) ক্রয় ও রক্ষণাবেক্ষণ করার সামর্থ্য সীমিত এবং স্থানীয় পর্যায়ে ঋণ প্রাপ্তি সহজ নয়। ফলে আধুনিক কৃষিযন্ত্র ক্রয়ে কৃষকদের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তা সম্ভব হয়ে ওঠে না।

৩.৩ কৃষিযন্ত্রের বিক্রয়োত্তর সেবার অপ্রতুলতা

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলসমূহে মানসম্মত সেবা প্রদানকারী (মেকানিক ও কারখানা) ও খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহের ঘাটতি রয়েছে। ফলে, ফসল মৌসুমে কৃষিযন্ত্রের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাগণ ক্ষতিগ্রস্থ হন। কিছু কৃষিযন্ত্রের আমদানি ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদান করলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল। তাছাড়া যন্ত্রসমূহ মৌসুম ভিত্তিক হওয়ায় বছরের প্রায় অধিকাংশ সময় অব্যবহৃত থাকে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেড়ে যায়।

৩.৪ কৃষি যান্ত্রিকীকরণে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকান্ডের সীমাবদ্ধতা

কৃষি যান্ত্রিকীকরণ কার্যক্রম আধুনিক কৃষির জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও কৃষক পর্যায়ে যন্ত্র প্রযুক্তি নির্ভর জ্ঞান ও দক্ষতা পৌঁছে দেয়ার মতো প্রশিক্ষিত জনবল প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে পর্যাপ্ত গড়ে ওঠেনি।

৩.৫ স্থানীয়ভাবে কৃষিযন্ত্র ও খুচরা যন্ত্রাংশ উৎপাদনে আধুনিক মূলধনী যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবলের অভাব

বিগত কয়েক দশকে স্থানীয় পর্যায়ে বিকশিত হওয়া ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশের উৎপাদন কারখানায় মূলত পুরনো মূলধনী যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হচ্ছে এবং কর্মরত বিষয় ভিত্তিক জনবলের (অপারেটর, টেকনিশিয়ান, মেকানিক ইত্যাদি) কারিগরি দক্ষতার অভাব রয়েছে। এমনকি তাদের প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত। ফলে মানসম্মত যন্ত্র ও যন্ত্রাংশের উৎপাদন ব্যাহত হয়।

৩.৬ আমদানিকৃত ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রপাতির গুণগত মান ঘোষণা ও নির্ধারণ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি

বর্তমানে আমদানিকৃত ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রপাতির মান ঘোষণা ও নির্ধারণের কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে, অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয় ও ব্যবহারের কারণে কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাগণ ক্ষতিগ্রস্থ ও নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

৩.৭ আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহার উপযোগী গ্রামীণ অবকাঠামোর অভাব

সকল অঞ্চলে কৃষিযন্ত্র মাঠ পর্যায়ে চলাচল উপযোগী রাস্তাঘাট সুবিধা ও খামার রাস্তা অপ্রতুল।

৩.৮ প্রাকৃতিক দুর্যোগের নেতিবাচক প্রভাব

বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আকস্মিক বন্যা ও খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে হাওর ও দক্ষিণ অঞ্চলে প্রায়ই ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হয়। এসব অঞ্চলে কৃষি যন্ত্রপাতির প্রাপ্যতা ও ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশ কষ্টসাধ্য।

৩.৯ এলাকা ভিত্তিক মাটির ভারবহন ক্ষমতার ভিন্নতা

এলাকাভিত্তিক মাটির ধরনের পার্থক্যের কারণে সকল অঞ্চলে সমভাবে যন্ত্রের ব্যবহার করা যায় না।

 

জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা ২০২০

 

৪.০ কৃষি যান্ত্রিকীকরণের সহায়ক পরিবেশ

৪.১ : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের খামার যান্ত্রিকীকরণ কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ উদ্ভাবিত যন্ত্র সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহারে কৃষকদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে।

৪.২ : সরকারি, বেসরকারি ও উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানসমূহ স্থানীয় পর্যায়ে সেবা প্রদানকারী গ্রুপ তৈরি ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কৃষি যন্ত্রপাতির সেবাদানকারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গড়ে ওঠায় ন্যূনতম খরচে ফসল উৎপাদনে কৃষিযন্ত্র সেবা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে দেশে কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কৃষক ও সেবাদানকারী উভয়েই লাভবান হচ্ছেন।

৪.৩ : দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও কৃষিযন্ত্র মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থানীয় মেরামত কারখানা গড়ে ওঠায় আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ব্যবহার বান্ধব পরিবেশ গড়ে উঠছে। ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ উৎপাদন ও বিপণনে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে।

৪.৪ : কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশের আমদানি, বিপণন ও বিক্রয়োত্তর সেবা প্রদানে কয়েকটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে।

৪.৫ : কৃষি যন্ত্রপাতির ব্যবহার জনপ্রিয়করণ ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সরকার কর্তৃক উন্নয়ন সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে।

৪.৬ : কৃষি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ রোডম্যাপ ২০২১, ২০৩১ ও ২০৪১ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৮ প্রণয়ন করেছে।

৫.০ নীতিমালা প্রণয়নে অনুসৃত মূলনীতি

এ নীতিমালা প্রণয়নে কৃষি ও কৃষকের কল্যাণ বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক এবং কৃষক সমবায় সংগঠনকে সহায়তা প্রদানে অগ্রাধিকার, টেকসই পরিবেশ, প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজার, নিরাপদ ও মানসম্পন্ন কৃষি ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং সকল অংশীজনের মাঝে সমতা (Equity) বজায় রাখার মূলনীতি অনুসৃত হয়েছে |

 

জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা ২০২০

 

৬.০ কৃষি যান্ত্রিকীকরণ কৌশল

৬.১ কৃষিযন্ত্র জনপ্রিয়করণ ও সম্প্রসারণ

৬.১.১. উপযুক্ত কৃষিযন্ত্র চিহ্নিত ও বাজারজাতকরণ

কৃষক, কৃষক সমবায় সংগঠন ও সেবা প্রদানকারী উদ্যোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা এবং খামার আকৃতি বিবেচনায় নিয়ে মানসম্পন্ন ও টেকসই উপযুক্ত যন্ত্র সরবরাহের উদ্যোগ নেয়া হবে। পাশাপাশি প্রতিকূল পরিস্থিতি (কাদা মাটি ও ফসলের নুয়ে পড়া অবস্থা ইত্যাদি) অনুযায়ী উপযুক্ত যন্ত্র সহজলভ্য করতে উৎসাহ প্রদান করা হবে। এক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ কাজে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক দেশি বিদেশি আধুনিক যন্ত্রের মাঠ প্রদর্শন ও জনপ্রিয়করণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হবে।

৬.১.২ কৃষিযন্ত্র সরবরাহ ও ব্যবহার সম্প্রসারণে সরকার কর্তৃক প্রণোদনা প্রদান

কৃষিযন্ত্র সরবরাহ ও সম্প্রসারণে চলমান প্রণোদনা অব্যাহত রাখা হবে এবং ক্ষেত্র বিশেষে প্রণোদনার পরিধি বাড়ানো হবে।

সরকারি প্রণোদনা প্রদানে নিম্নরূপ নীতি গ্রহণ করা হবেঃ

  • প্রাথমিকভাবে শুধু কৃষক ও কৃষক গ্রুপ/কৃষক সমবায় সংগঠন পর্যায়ে পরিচিতি ও জনপ্রিয়করণে এ প্রণোদনা নির্দিষ্ট মেয়াদে প্রদান করা হবে। প্রণোদনা অবশ্যই মানসম্পন্ন / প্রত্যয়নকৃত কৃষিযন্ত্রের উপর প্রযোজ্য হবে। বছরে স্বপ্ন সময়কালে ব্যবহার্য অথচ অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রের উপর গুরুত্ব প্রদান করা হবে।
  • বেসরকারি উদ্যোগকে ক্ষতিগ্রস্থ না করে যন্ত্রের চাহিদা ও সরবরাহ সমন্বয়ের মাধ্যমে কৃষিযন্ত্রের চাহিদা বৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতে সরবরাহ বৃদ্ধির সাথে সঙ্গতি রেখে প্রণোদনার হার ও ব্যবস্থাপনার পুনর্গঠন করা হবে।
  • প্রণোদনা প্রদান ব্যবস্থা অধিকতর স্বচ্ছ ও তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর করা হবে; যাতে উপযুক্ত কৃষক, কৃষক সমবায় সংগঠন ও কৃষি যন্ত্রপাতির সেবা প্রদানকারীর মাঝে সরবরাহ নিশ্চিত হয়।
  • প্রণোদনা প্রদানের ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায়ে সমন্বয় জোরদার করা হবে।

৬.১.৩ কৃষিযন্ত্র ক্রয়ে ঋণ প্রদান

কৃষক ও যন্ত্র সেবা প্রদানকারী উদ্যোক্তাদের কৃষিযন্ত্র ক্রয়ে উৎসাহিত করতে সরকারি বাণিজ্যিক, এনজিও ও অর্থলগ্নি প্রতিষ্ঠানসমূহ হতে সহজে কৃষিযন্ত্রে কৃষি ঋণ প্রাপ্তি নিশ্চিত করা হবে। বছরের স্বল্প সময়ে ব্যবহার্য বাপন, রোপণ, কর্তন, শুকানো, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ বিষয়ক কৃষিযন্ত্র ক্রয়ের জন্য কৃষক/সেবা প্রদানকারীদেরকে ন্যুনতম সুদে বা যন্ত্র বিশেষে সুদবিহীন ঋণ প্রদান করা হবে। এক্ষেত্রে সুদের অংশ সরকার ভর্তুকি হিসেবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে পরিশোধ করতে পারে।

এছাড়া কৃষক বা কৃষক গ্রুপ/কৃষক সমবায় সংগঠন যাতে ডাউন পেমেন্টসহ কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ করে কৃষিযন্ত্র ক্রয় করতে পারে সেজন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে।

৬.১.৪ কৃষিযন্ত্র আমদানি ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিযন্ত্র বাজারজাতকরণে শুল্ক নির্ধারণ

  • আমদানিকৃত এবং স্থানীয়ভাবে প্রস্তুতকৃত কৃষিযন্ত্র বিপণনে সুস্থ প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা বজায় রাখা হবে।
  • বর্তমানে বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র, যেমন- পাওয়ার টিলার, পাওয়ার থ্রেসার, পাওয়ার রিপার ও পাওয়ার সিডার উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন যন্ত্রাংশ/ কাঁচামাল আমদানির উপর আরোপিত শুল্কের পরিমাণ ১% এবং সমুদয় রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর হতে অব্যাহতি প্রাপ্ত। কিন্তু এতে ট্রান্সপ্লান্টার ও কম্বাইন হারভেস্টার অন্তর্ভুক্ত নেই। ভবিষ্যতে সকল প্রকার কৃষিযন্ত্রের দেশীয় উৎপাদনে কাঁচামাল বা যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক হার আরো হ্রাস অথবা যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা হবে।
  • কৃষিকার্যে ব্যবহৃত সকল প্রকার স্প্রেয়ার ও পাওয়ার টিলারের আমদানি ও উৎপাদন পর্যায়ে আরোপীয় সমুদয় মূল্য সংযোজন কর (আগাম কর ব্যতীত) অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। উক্ত নীতি চলমান রাখাসহ এই তালিকায় ট্রান্সপ্লান্টার ও কম্বাইন হারভেস্টারও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এছাড়া সকল কৃষিযন্ত্রের বিক্রয় শুল্কসহ অন্যান্য শুল্ক যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা হবে।
  • দেশে উৎপাদনের সম্ভাবনা আছে এমন সব যন্ত্রের প্রতিরক্ষণ ও সার্ভিসিং সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত প্রণোদনা দেয়া হবে।

৬.১.৫ সকল স্তরে কৃষিবল্প সম্প্রসারণে কারিগরি সহায়তা নিশ্চিতকরণ

কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণ ও বাস্তবায়নের জন্য কৃষক/কৃষক সমবায় সংগঠন ও কৃষিযন্ত্রের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ, তথ্য ও সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপজেলা থেকে সকল উচ্চতর স্তরে এবং অন্যান্য সংস্থায় প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৃষি প্রকৌশল জ্ঞান সম্পন্ন আলাদা জনবল কাঠামো তথা কৃষি যান্ত্রিকীকরণ উইং প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হবে। মাঠ পর্যায়ে খুচরা যন্ত্রাংশ সহজলভ্য করাসহ দক্ষ মেরামত সেবা উৎসাহিত করা হবে।

৬.২ কৃষিযন্ত্র সেবা প্রদানকারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও দক্ষতা বৃদ্ধি

৬.২.১ : কৃষিযন্ত্রের ভাড়ায় ব্যবহার কৃষি যান্ত্রিকীকরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে। কৃষকগণ ব্যক্তিগতভাবে কৃষিযন্ত্র ক্রয়ে বিনিয়োগ না করেও ভাড়ায় কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন। কৃষিযন্ত্র সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সেবা প্রদানকারী উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচি চালু করা হবে। কৃষিযন্ত্রের সর্বোচ্চ ব্যবহার, যন্ত্র চালনা, মেরামত, রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবসা পরিচালনা বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।

৬.২.২ : কৃষিযন্ত্রের সেবা প্রদানকারী উদ্যোক্তা, প্রস্তুতকারক, আমদানিকারক, ডিলার, মেকানিক এবং কৃষক/কৃষক সমবায় সংগঠকদের উদ্বুদ্ধ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা হবে।

৬.২.৩ : কৃষিযন্ত্র সেবা প্রদানের লক্ষ্যে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারিভাবে যন্ত্র ভাড়া, মেকানিক সার্ভিস বিষয়ক সেবাকেন্দ্র স্থাপন উৎসাহিত করা হবে।

৬.২.৪ : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ও অন্যান্য সংস্থার আওতায় তৃণমূল পর্যায়ে এবং কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদন কারখানার জনবলের কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।

৬.২.৫ : ক্ষুদ্র কৃষিযন্ত্র সেবা প্রদানকারী উদ্যোক্তা, কৃষক ও কৃষক সমবায় সংগঠন, মেকানিক, মেরামতকারী কারখানা শ্রমিকদের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে। সেই সঙ্গে গবেষক, সম্প্রসারণকর্মী ও সংশ্লিষ্টদের বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষণ প্রদানের সুযোগ বৃদ্ধি করা হবে।

৬.২.৬ : কৃষিযন্ত্র ভাড়া প্রদানের ক্ষেত্রে ভাড়া প্রদানকারী, কৃষক ও জমির মালিকের মধ্যে উৎপাদিত ফসল হতে প্রাপ্য লভ্যাংশের অংশ যৌক্তিক হারে নির্ধারণ করা হবে।

৬.৩  কৃষিযন্ত্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহারে চাষযোগ্য জমির সমন্বয় ও সমন্বিত ফসল উৎপাদন ব্যবস্থা প্রবর্তন

দেশে চাষাবাদযোগ্য জমির আকার ছোট ও খন্ড খন্ড হওয়ায় কৃষি উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রের সর্বোচ্চ দক্ষতা অর্জন সম্ভব হয় না। ভাড়া ব্যবস্থায় কৃষিযন্ত্র সেবার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে স্থানীয়ভাবে কৃষকদের সংগঠিত করে সমন্বিত ফসল উৎপাদন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হবে। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের স্বার্থ বজায় রেখে জমি লিজ ও চুক্তিভিত্তিতে ফসল উৎপাদন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করা হবে। এ সংক্রান্ত বিস্তারিত কর্মপদ্ধতি পরবর্তীতে নির্ধারণ করা হবে।

৬.৪ গবেষণা ও উন্নয়ন

অঞ্চল ও ফসলভেদে লাগসই কৃষি যন্ত্রপাতির উদ্ভাবন ও আত্তীকরণের জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন অপরিহার্য। খামার পর্যায়ে স্থানভেদে উপযোগী কৃষি যন্ত্রপাতি প্রযুক্তি উদ্ধাবন ও উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি গবেষণা, শিক্ষা এবং স্থানীয় কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদন প্রতিষ্ঠানসমূহকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে নিম্নলিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা হবে।

৬.৪.১ : অঞ্চল ও ফসলভেদে আধুনিক ও লাগসই কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণাকে উৎসাহিত করা হবে।

৬.৪.২ : গবেষণার সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা হবে।

৬.৪.৩ : কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন বিষয়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় স্বতন্ত্রভাবে গবেষণা পরিচালনা করে থাকে; অনেক ক্ষেত্রে একই যন্ত্র বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উদ্ভাবন করছে। এসব গবেষণা সমন্বিতভাবে পরিচালনার জন্য উৎসাহিত করা হবে। স্থানীয় যন্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানসমূহকে গবেষণা কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা হবে।

৬.৪.৪ : মাঠ ফসলের পাশাপাশি উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল উৎপাদন, সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহণের জন্য উপযুক্ত যন্ত্র ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

৬.৪.৫ : গবেষণালব্ধ উদ্ভাবনসমূহের মেধাস্বত্ব প্রদান উৎসাহিত করা হবে।

৬.৪.৬ : কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়নের লক্ষ্যে গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদন শিল্প ও বিপণন উদ্যোক্তাদের মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি করা হবে। সংশ্লিষ্ট শিল্প উদ্যোক্তাদেরকে গবেষণা খাতে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করা হবে।

৬.৪.৭ : কৃষি যন্ত্রপাতির মান উন্নয়ন সংক্রান্ত গবেষণা, মান নির্ধারণ ও প্রশিক্ষণের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

৬.৪.৮ : কৃষি যন্ত্রপাতি গবেষণায় যন্ত্রপাতি পরিচালনা ও চালকের স্বাস্থ্য ঝুঁকি সম্পর্কিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

৬.৪.৯ : কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বিষয়ে উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশের সাথে প্রযুক্তি হস্তান্তরে সহযোগিতামূলক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করা হবে।

৬.৪.১০ : কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ATI), পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট (PTI), ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (VTI), টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজসমূহের (TSC) কৃষি প্রকৌশল বিষয়ে ডিপ্লোমা প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হবে।

৬.৪.১১ : রাসায়নিক সার ও বালাই নাশক এবং সেচের পানির পরিমিত প্রয়োগ/ব্যবহারের লক্ষ্যে আধুনিক কৃষিযন্ত্র/পদ্ধতি উদ্ভাবন, প্রচলন ও ব্যবহারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

৬.৪.১২ : কৃষিযন্ত্রের উপর গবেষণা ও নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রণয়নের লক্ষ্যে নির্ভরযোগ্য কৃষি যন্ত্রপাতির তথ্য ভান্ডার গড়ে তোলা হবে।

৬.৪.১৩ : কৃষিযন্ত্রের উপর গবেষণার ফলাফল মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

৬.৫ কৃষিযন্ত্র উৎপাদন শিল্পের সম্প্রসারণ

স্থানীয় পর্যায়ে কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশের উৎপাদন ব্যবস্থার প্রসার ও মান উন্নয়নের লক্ষ্যে নিম্নলিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা হবে।

৬.৫.১ : কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী শিল্পকে কৃষি ভিত্তিক শিল্প হিসেবে গণ্য করার উদ্যোগ নেয়া হবে।

৬.৫.২ : কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতির উপর যুক্তিসঙ্গত হারে প্রণোদনামূলক আমদানি কর নির্ধারণ করা হবে।

৬.৫.৩ : কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী ও সংযোজন শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক রেয়াতি সুবিধা অব্যাহত রাখা হবে। এই শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশের স্বার্থে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনার ভিত্তিতে কর রেয়াত সংশ্লিষ্ট তালিকার যন্ত্রাংশের সংখ্যা প্রয়োজনের নিরিখে সম্প্রসারণ করা হবে।

৬.৫.৪ : কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী শিল্পকে শিল্পনীতিতে উচ্চ অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ শিল্পের বিকাশের স্বার্থে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী শিল্প উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুসারে রেয়াতি সুবিধা প্রদান করা হবে। কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী শিল্পে আমদানিকৃত কাঁচামালের উপর বিধিবদ্ধ শুল্ক বিদ্যমান থাকায় কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ বিক্রয় ও সরবরাহের ক্ষেত্রে ভ্যাট রেয়াতি সুবিধার বিষয় বিবেচনা করা হবে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রাংশের উৎপাদন খরচ ও উদ্যোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আমদানিকৃত কৃষি যন্ত্রাংশের আমদানি শুল্ক যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করা হবে।

৬.৫.৫ : দেশে কৃষি যন্ত্রপাতি সংযোজন শিল্পকে উৎসাহিত করা হবে। এক্ষেত্রে দেশী-বিদেশী যৌথ বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হবে। সংযোজন শিল্পে দেশীয় উৎপাদিত যন্ত্রাংশের একটি অংশ ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।

৬.৫.৬ : উচ্চ মূল্যের নতুন কৃষি যন্ত্রপাতি যেমন, কম্বাইন হারভেস্টার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার ইত্যাদি আমদানির পাশাপাশি পুনঃসংযোজিত (refurbish) কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানির সুযোগ থাকবে। তবে এ সকল যন্ত্রপাতির পুনঃসংযোজন কর্তৃপক্ষ ও আমদানিকারক কর্তৃক মান ঘোষণা করতে হবে।

৬.৫.৭ : কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ প্রস্তুতকারী শিল্পাঞ্চলসমূহে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী জোন’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ শিল্পের উন্নয়নে বিশেষায়িত উৎপাদন প্রতিষ্ঠানসমূহে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে উচ্চতর সেবাকেন্দ্র” প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত করা হবে।

৬.৫.৮ : স্টিল ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানিসমূহ কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারী শিল্প কাঁচামাল (বিভিন্ন প্রকার স্টিল) সুলভ মূল্যে প্রাপ্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

 

৭.০ প্রিসিশন এগ্রিকালচার

মৃত্তিকার স্বাস্থ্য রক্ষা করে ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিকল্পে তথ্য প্রযুক্তি নির্ভর প্রয়োজন মাফিক উপকরণ ব্যবহারে প্রিসিশন এগ্রিকালচারের চর্চা আগামী দিনের যান্ত্রিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রিসিশন এগ্রিকালচার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপকরণ ও পরিমাপক যন্ত্র প্রসারের লক্ষ্যে নিম্নরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

৭.১ : প্রিসিশন এগ্রিকালচারে সহায়ক যন্ত্রপাতির উপর আমদানী শুল্ক হ্রাসের ব্যবস্থা নেয়া হবে।

৭.২ : সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রশিক্ষণের আওতায় প্রিসিশন এগ্রিকালচার সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহারের কলাকৌশল অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

৮.০ নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার

সরকার ২০২০ সালের মধ্যে দেশের মোট শক্তি চাহিদার ১০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ শক্তি নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস (সৌর, বায়োগ্যাস, বায়ু ইত্যাদি) হতে পুরণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এ লক্ষ্য পূরণের উদ্দেশ্যে নিম্নলিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা হবে।

৮.১ : ফসল উৎপাদনে সোলার সেচ পাম্প ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হবে।

৮.২ : সবজি ও ফল শুকানোর জন্য সোলার ড্রায়ার ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হবে।

৮.৩ : সোলার সিস্টেম’ ব্যবহারের মাধ্যমে খামার পর্যায়ে কৃষি পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ উৎসাহিত করা হবে।

৮.৪ : ‘সোলার-সিস্টেম’ ব্যবহারের মাধ্যমে “গ্রিন-হাউজ” পদ্ধতিতে উচ্চ মূল্যের লাভজনক ফসল উৎপাদন সম্ভাবনাকে উৎসাহিত করা হবে।

৮.৫ : কৃষি ও শিল্পের বর্জ্য থেকে জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদন ও ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করা হবে।

৮.৬ : সৌর ও বায়োগ্যাস শক্তি সম্মিলিতভাবে ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন তথা খামার/কমিউনিটি মিনি গ্রিড গড়ে তুলতে উৎসাহিত করা হবে।

৯.০ সংরক্ষণশীল কৃষি (কনজারভেশন এগ্রিকালচার)

সংরক্ষণশীল কৃষি পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে মাটির উর্বরতা ও আর্দ্রতা রক্ষা, ফসল উৎপাদনের খরচ ও সময় সাশ্রয়, গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃস্বরণ হ্রাস এবং ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা যায়। এ লক্ষ্যে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

৯.১ : ফসল ও মাটি ভেদে বিনাচাষ বা স্বল্পচাষের মাধ্যমে ফসল কাটার পর ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটির সাথে মিশিয়ে চাষ করার পদ্ধতিকে জনপ্রিয় এবং এ লক্ষ্যে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি করার পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

৯.২ : সংরক্ষণশীল কৃষি সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এর সঙ্গে সম্পর্কিত কৃষি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার বিষয়ে কৃষক ও কৃষিযন্ত্র সেবা প্রদানকারী উদ্যোক্তাদেরকে প্রশিক্ষণ ও উৎসাহ প্রদান করা হবে।

৯.৩ : কৃষি পরিবেশ রক্ষায় শস্য কর্তন পরবর্তী সময়ে ফসলের অবশিষ্টাংশ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উপযুক্ত কৃষি যন্ত্রপাতি উদ্ভাবন ও উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।

৯.৪ : মাটির জৈব পদার্থ বৃদ্ধি ও ভূমি ক্ষয়রোধে সংরক্ষণশীল কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য কর্মকাণ্ড গ্রহণ করা হবে।

৯.৫ : সংরক্ষনশীল কৃষির সাথে সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে আর্থিক প্রণোদনা, ঋণ প্রবাহ বৃদ্ধি ও উন্নয়ন সহায়তা প্রদান করা হবে।

৯.৬ : পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং পানি পরিমাপের জন্য ডিজিটালাইজড্ পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হবে।

১০.০ বিশেষ অঞ্চলভিত্তিক যান্ত্রিকীকরণ

১০.১ হাওর অঞ্চল

আকস্মিক পাহাড়ি ঢল, বন্যা, শিলাবৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে শস্যহানির ঝুঁকি বিদ্যমান। সময়মতো শস্য আহরণ ও চাষাবাদের সময়কাল হ্রাসকল্পে হাওর অঞ্চলে দ্রুত কৃষি যান্ত্রিকীকরণে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

১০.১.১ : শস্য বীজ বপন, ফসলের চারা রোপণ, শস্য কর্তন, মাড়াই ও শুকানো যন্ত্রের দ্রুত সম্প্রসারণের নিমিত্ত অধিক হারে সরকারি উন্নয়ন সহায়তা প্রদান করা হবে।

১০.১.২ : কৃষকের সুবিধার্থে ফসল মাড়াই, ঝাড়াই, শুকানো ও সংরক্ষণ প্রক্রিয়াজাতকরণে সেবা অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হবে।

১০.১.৩ : যন্ত্রপাতি ও কৃষি পণ্য চলাচল সুগম করার লক্ষ্যে উপযুক্ত পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে।

১০.১.৪ : হাওর অঞ্চলকে অগ্রাধিকার দিয়ে যন্ত্র সেবার উদ্যোক্তা সৃষ্টির ব্যবস্থা নেয়া হবে।

১০. ২ উপকূলীয় ও চর অঞ্চল

ঘুর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস, মাটি ও পানির লবণাক্ততা এবং জলমগ্নতার কারণে এ এলাকার কৃষি যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। এ এলাকার শস্য বিন্যাস অনুযায়ী উপযুক্ত যন্ত্র নির্বাচন ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

১০.২.১ : এলাকার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী উপযুক্ত যন্ত্র উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

১০.২.২ : যন্ত্র সরবরাহ বৃদ্ধির প্রয়োজনে এ এলাকায় বর্ধিত হারে উন্নয়ন সহায়তা বা প্রণোদনা প্রদান করা হবে।

১০.২.৩ : ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমি একত্রিত করে বৃহৎ খামার তৈরির উদ্যোগকে উৎসাহিত করা হবে। এক্ষেত্রে ন্যূনতম হারে ঋণ সুবিধা, পরামর্শ ও প্রণোদনা প্রদান করা হবে।

১০.২.৪ : চর ও উপকূলীয় অঞ্চলের উপযোগী মুগ, তিল, সূর্যমুখী, ভুট্টা, সয়াবিন, তরমুজ ইত্যাদি ফসলের জন্য লাগসই যন্ত্রপাতি প্রচলন উৎসাহিত করা হবে।

১০,২.৫ : এ অঞ্চল দূর্গম হওয়ায় কৃষি কাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কৃষি যন্ত্রপাতি চলাচল উপযোগী রাস্তাঘাট নির্মাণের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হবে।

১০.৩ পাহাড়ী ও বরেন্দ্র অঞ্চল

মাটির প্রকৃতি ও সেচ পানির উৎসের ভিন্নতার কারণে এ সকল অঞ্চলে চাষাবাদের যেমন বৈচিত্র্য রয়েছে তেমনি সম্ভাবনাও প্রচুর। এ বিবেচনায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

১০.৩.১ : এলাকাভেদে মাটির উর্বরতা, বন্ধুরতা ও সেচ পানির প্রাপ্যতা অনুযায়ী উপযোগী ফসলের জন্য লাগসাই কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবন, উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

১০.৩.২ : দূর্গম অঞ্চলে কৃষি কাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি হিসেবে সৌরশক্তি, বায়োগ্যাস ইত্যাদি ব্যবহারে উৎসাহিত করা হবে।

১০.৩.৩ : এ সকল এলাকায় ফসল উৎপাদনের জন্য ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে লাগসই সেচযন্ত্র ও পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি (ড্রিপ সেচ, স্প্রিংকলার সেচ ইত্যাদি) ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করা হবে।

১০.৩.৪ : বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে যথাযথ প্রযুক্তির মাধ্যমে সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য গুরুত্বারোপ করা হবে।

১০.৩.৫ : পাহাড়ি অঞ্চল দূর্গম হওয়ায় কৃষি কাজ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কৃষি যন্ত্রপাতি চলাচল উপযোগী রাস্তাঘাট নির্মাণের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হবে।

১০.৩.৬ : অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পাহাড়ি অঞ্চলের কৃষকের সুবিধার্থে ফসল মাড়াই, ঝাড়াই, শুকানো, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে সেবা অবকাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হবে।

১০.৩.৭ : পাহাড়ি ও দূর্গম অঞ্চলে যন্ত্র সরবরাহ বৃদ্ধির প্রয়োজনে বর্ধিত হারে উন্নয়ন সহায়তা বা প্রণোদনা প্রদান করা হবে।

১০.৩.৮ : উদ্যান ফসল স্থাপন, বৃহৎ খামার তৈরির উদ্যোগকে উৎসাহিত করে ন্যূনতম হারে ঋণ সুবিধা, পরামর্শ ও প্রণোদনা প্রদান করা হবে।

১০.৩.৯ : দুর্গম অঞ্চলে ছড়া/ঝর্ণায়/ক্রিক বাধ দিয়ে ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানির ব্যবহার নিশ্চিতকল্পের গ্রেভিটিফ্লোর এর মাধ্যমে বিভিন্ন উদ্যান ফসল এবং জমিতে সেচ প্রদান করা হবে।

১১.০ মান পরীক্ষা ও প্রত্যয়ন

ব্যবহৃত কৃষি যন্ত্রপাতির সর্বোত্তম আয়ুষ্কাল ও কার্যকারিতা প্রাপ্তির অন্যতম শর্ত হলো গুণগতমান সম্পন্ন যন্ত্র ব্যবহার। যন্ত্র প্রস্তুতকারী, বাজারজাতকারী এবং ব্যবহারকারী সকলের জন্যই যন্ত্রের মান নির্ধারণ সুবিধা সহজলভ্য করা খুবই জরুরি।

বাংলাদেশে ভোগ্যপণ্য, নির্মাণ সামগ্রী ইত্যাদির মান নির্ধারণ ও প্রত্যয়নের ব্যবস্থা চলমান থাকলেও বর্তমানে কৃষি যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে মান নির্ধারণ ও প্রত্যয়নের সুযোগ নেই। দেশে গুণগত মানসম্পন্ন যন্ত্রের প্রসার নিশ্চিতকল্পে মান নির্ধারণ অবকাঠামো ও প্রত্যয়নের ব্যবস্থা সৃষ্টির লক্ষ্যে নিম্নলিখিত নীতি গ্রহণ করা হবে।

১১.১ : কৃষি যন্ত্রপাতির মান নির্ধারণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি ও সরঞ্জামাদি সহজলভ্য করতে এবং দক্ষ জনবল সৃষ্টির লক্ষ্যে সহায়তা প্রদান করা হবে।

১১.২ : সরকারি সেবা প্রদানকারী সংস্থা কর্তৃক কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকারক, আমদানিকারক ও ব্যবহারকারীর চাহিদা অনুযায়ী মান নির্ধারণ সেবা প্রদান করা হবে। পাশাপাশি গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ল্যাব সুবিধা বৃদ্ধি করে মান পরীক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এক্ষেত্রে মান নির্ধারণ ও প্রত্যয়নের জন্য প্রয়োজনীয় আইন, বিধি ও পদ্ধতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হবে।

১১.৩ : মান নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা, সুবিধা ও সুফল সম্পর্কে যন্ত্র প্রস্তুতকারী, সরবরাহকারী ও ব্যবহারকারী পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সকল স্টেক হোল্ডারদের মধ্যে প্রচারণা ও সচেতনতা সৃষ্টিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

১২.০ সমন্বয় ও সহযোগিতা

উপযুক্ত কৃষি যন্ত্রপাতি চিহ্নিতকরণ, প্রস্তুতকরণ, সম্প্রসারণ, সমন্বিত, সমলয়ে ও সমবায় ভিত্তিক চাষাবাদ চর্চা, ঋণ প্রাপ্তি, শুল্ক/কর প্রণোদনা ইত্যাদি কার্যক্রম সহজে ও স্বল্প সময়ে সম্পাদনের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। এ ব্যবস্থার উন্নয়নে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

১২.১ : কৃষি যন্ত্রপাতির উদ্ভাবন, প্রোটোটাইপ তৈরি, মাঠ পর্যায়ে ত্রুটি-বিচ্যুতি চিহ্নিতকরণ ও সংশোধন ইত্যাদি বিষয়ে গবেষণা ও প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

১২.২ : যন্ত্র সংশ্লিষ্ট গবেষক, প্রস্তুতকারক, সম্প্রসারণ কর্মী, কৃষক ও কৃষক সমবায় সংগঠন, সেবাদানকারী, কৃষক ও মেকানিকদের মধ্যে সমন্বয়, পারস্পরিক সহযোগিতা ও তথ্য বিনিময়ের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা হবে।

১২.৩ : কৃষিযন্ত্রের প্রস্তুতকরণ শিল্প স্থাপন, যন্ত্র আমদানি, বিপণনের উপর শুল্ক কর আরোপ ও ঋণ প্রদানে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় বৃদ্ধি করা হবে।

১২.৪ : সেবা প্রদানের প্রয়োজনে ভারী কৃষি যন্ত্রপাতি রাস্তায় চলাচল ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয় ও সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি করা হবে।

১৩.০ যুবশক্তির অংশগ্রহণ

গ্রামের শিক্ষিত যুবকদের যন্ত্র সেবা উদ্যোক্তা হিসেবে তৈরি এবং যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণে যুব সম্প্রদায়ের অধিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে নিম্নলিখিত নীতি গ্রহণ করা হবে।

১৩.১ : যন্ত্রপাতির বিক্রোয়োত্তর সেবা, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত সেবা নিশ্চিতকরণে এলাকাভিত্তিক সার্ভিসিং ওয়ার্কশপ এবং যন্ত্র সেবা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় যুব সম্প্রদায়কে উদ্বুদ্ধ করা হবে।

১৩.২ : কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত বেকার যুবকদের যন্ত্র সেবা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে প্রণোদনা, প্রশিক্ষণ, পরামর্শ সহায়তা ও ব্যাংক ঋণ প্রদানে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

১৪.০ নারীর অংশগ্রহণ

কৃষি যন্ত্রপাতি পরিচালনায় নারীর অংশগ্রহণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি যন্ত্রিকীকরণে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

১৪.১ : সচেতনতা বৃদ্ধি ও নিরাপদ যন্ত্র ব্যবহারে নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে উৎসাহিত করা হবে।

১৪.২ : নারীদের কৃষি যন্ত্রপাতি সেবা প্রদানকারী উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে উৎসাহ প্রদান করা হবে।

১৫.০ নিরাপদ ব্যবস্থাপনা

কৃষি যন্ত্রপাতি চলাচলে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, অদক্ষ যন্ত্র চালনা এবং অসতর্কভাবে ঘূর্ণায়মান অংশের সংস্পর্শে আসার ফলে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। কৃষি যন্ত্রপাতির নিরাপদ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

১৫.১ : ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত সকল কৃষি যন্ত্রপাতি অনায়াসে ব্যবহার উপযোগী বিশেষত নারীবান্ধব ও নিরাপদ হিসেবে প্রস্তুত করতে উৎসাহিত করা হবে।

১৫.২ : যন্ত্র বিক্রয়ের সময় প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জামাদি সরবরাহ নিশ্চিত করতে উৎসাহিত করা হবে।

১৫.৩ : যন্ত্রের নিরাপদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে করণীয় সম্পর্কে প্রচারণা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হবে।

 

জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা ২০২০

 

১৬.০ বিনিয়োগ

কৃষিযন্ত্র প্রস্তুতকরণ শিল্প, যন্ত্র মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ কারখানা, ভাড়ায় যন্ত্র সেবা প্রদানকারী, কৃষক গ্রুপ ও ব্যক্তি পর্যায়ে কৃষকদেরকে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হবে। কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকরণ শিল্প থেকে অর্জিত মুনাফার উপর আরোপিত আয়কর রেয়াতি সুবিধা যুক্তিসঙ্গত হারে প্রদান করা হবে |

১৭.০ ব্যাংক ঋণ

কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ক্ষেত্রে কৃষক, যন্ত্র সেবা প্রদানকারী ও স্থানীয় কৃষিযন্ত্র প্রস্তুতকারক পর্যায়ে মূলধনের অপ্রতুলতা রয়েছে। এ বিনিয়োগ ও মূলধন প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

১৭.১ : কৃষিযন্ত্র প্রস্তুতকারকদের মূলধনী যন্ত্র ক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারি বিশেষায়িত ঋণ স্কিমের আওতায় ন্যূনতম হারে ঋণ প্রদান চালু করা হবে।

১৭.২ : কৃষি যান্ত্রিকীকরণ কর্মকান্ড কৃষি খাতের মোট ঋণের একটি নির্দিষ্ট অংশ কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে নির্ধারণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।

১৮.০ নীতিমালা বাস্তবায়নে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, মনিটরিং ও সমন্বয়

নীতিমালাটি অনুমোদন শেষে এর বাস্তবায়নে কৃষি মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজন হবে। অতঃপর প্রণীত নীতিমালা ও কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সমন্বয় ও মনিটরিং এর কাঠামো তৈরি করত: তা সুষ্ঠু বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

 

জাতীয় কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালা ২০২০

 

১৯.০ উপসংহার

গ্রামীণ শ্রমিকের বহুমুখী কর্মক্ষেত্র তৈরি ও অধিক আকর্ষণীয় পেশায় স্থানান্তরের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী দিনের কৃষিযন্ত্র নির্ভর বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। টেকসই যান্ত্রিকীকরণের এই পথ পরিক্রমায় সময়োচিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে কাঙ্খিত সফলতা অর্জন সম্ভব।

এক্ষেত্রে সরকারের এ নীতিমালা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ প্রেক্ষাপটে প্রণীত কৃষি যান্ত্রিকীকরণ নীতিমালার আলোকে সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ ও যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হবে।

Leave a Comment