ধনিয়া চাষ পদ্ধতি

ধনিয়া চাষ নিয়ে আজকের আলোচনা। ধনিয়া বা ধনে একটি সুগন্ধি ঔষধি গাছ। এটি একটি একবর্ষজীবী উদ্ভিদ। দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া ও উত্তর আফ্রিকার স্থানীয় উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Coriandrum sativum। বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকায় ধনে চাষ হয়। এর পাতা ও বীজ খাবারের মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ধনের পাতা এশীয় চাটনি ও মেক্সিকান সালসাতে ব্যবহার করা হয়। এর পাতা ছোট, সবুজ, মসৃণ হয়। ধনিয়া রবি ফসল হলেও এখন প্রায় সারা বছরই এর চাষ হয়। ধনিয়ার কচিপাতা সালাদ ও তরকারিতে সুগন্ধি মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া ধনিয়ার পুষ্ট বীজ বেঁটে বা গুঁড়া করে তরকারিতে মসলা হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

ধনিয়া চাষ পদ্ধতি

ধনিয়া পাতা
ধনিয়া পাতা

 

 

ধনিয়ার জাত :

পাতা উৎপাদনকারী জাতের মধ্যে বারি ধনিয়া-১ বেশ ভালো ফলন দেয়। এছাড়া সুগন্ধা, এলবি-৬০ ও এলবি-৬৫ জাতগুলো সারা বছরই চাষ করা যায়। এই জাতের ধনিয়ার পাতা উজ্জ্বল সবুজ বর্ণের, সুগন্ধযুক্ত ও দেরিতে ফুল উৎপাদনকারী। অর্থাৎ অনেকদিন ধরে পাতা উৎপাদন করে। এছাড়াও বাংলাদেশে বিলাতী জাতের ধনিয়া এবং হাইব্রিড ধনিয়া চাষ করা হয়। এগুলো উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন।

 

ধনিয়া বপনের সময় :

স্থানীয় দেশি জাতের ধনিয়া রবি মৌসুম ছাড়া আগাম চাষ করা যায় না। রবি মৌসুমের জন্য আশ্বিন-কার্তিক (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) মাসে ধনিয়ার বীজ বপন করতে হয়। তবে বর্তমানে সারাবছরব‌্যাপী ধনে চাষ হচ্ছে।

 

ধনিয়া পাতা
ধনিয়া পাতা

 

ধনিয়া চাষের জন্য মাটি :

সব ধরনের মাটিতেই ধনে চাষ করা যায়। তবে বেলে দো-আঁশ থেকে এঁটেল দো-আঁশ মাটি ধনে চাষের জন্য উপযোগী। ধনে আবাদের জন্য পানি নিষ্কাশনের সুবিধা থাকতে হবে।

 

ধনিয়া পাতা
ধনিয়া পাতা

 

ধনিয়া চাষের জন্য জমি তৈরি ও বীজ বপন :

মাটি ও জমির প্রকারভেদে ৪ থেকে ৬টি চাষ ও মই দিতে হয়। বীজ বপনের আগে প্রতি লিটার পানিতে ১ গ্রাম কার্বেন্ডাজিম জাতীয় ছত্রাকনাশক মিশিয়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখতে হয়। এতে বীজ শোধন ও বীজের ত্বক নরম হয়ে অঙ্কুরোদ্গমে সহায়ক হয়।

জমি ভালোভাবে চাষ ও মই দিয়ে ঝুরঝুরে এবং সমান করার পর ১ মিটার প্রস্থের বেড তৈরি করতে হয়। বেডে ২০ সেন্টিমিটার দূরত্বে সারি করে বীজ ছিটিয়ে বুনে দিতে হয়। বেডে সারি বরাবর একটি রশি টেনে রশি ধরে হাতের আঙুল বা একটি কাঠি দিয়ে ২-৩ সেন্টিমিটার গভীর করে নালা করতে হয়। নালায় বীজ ফেলে হালকা মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে হয়।

প্রতি শতকে ৭০ থেকে ৮০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়। এই পরিমাণ বীজে প্রায় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ধনিয়া গাছ পাওয়া যায়। বীজ ছিটিয়ে বপন করলে হেক্টরপ্রতি ৮ কেজি বীজ ব্যবহার করতে হয়। মিশ্র ফসল হিসেবে সার পদ্ধতিতে বপনের জন্য ৪-৫ কেজি বীজের প্রয়োজন হয়।

 

বিলাতি ধনিয়া পাতা
বিলাতি ধনিয়া পাতা

 

ধনিয়া চাষে সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি :

ধনে চাষের জন্য জমি তৈরির সময় জমির পরিমাণ ও সারের মাপ অনুযায়ী অর্ধেক গোবর, টিএসপি ও এমপি সার মিশিয়ে দিতে হবে। বাকি অর্ধেক গোবর চারা রোপণের এক সপ্তাহ আগে মাদার দিয়ে মিশিয়ে রাখতে হবে। এর পর চারা রোপণ করে সেচ দিতে হয়। ইউরিয়া এবং বাকি অর্ধেক এমপি সার দুই কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। চারা লাগানোর ৮ থেকে ১০ দিন পর প্রথম কিস্তিতে এবং চারা লাগানোর ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর বাকি সার উপরি প্রয়োগ করতে হবে।

ধনিয়া চাষে সারের পরিমাণ :

সারএক শতকেহেক্টর প্রতি
পচা গোবর/কম্পোস্ট২০ কেজি৫ টন
ইউরিয়া০.৬১-০.৭৩ কেজি৭৫-৯০ কেজি
টিএসপি০.৪৪-০.৫৩ কেজি১১০-১৩০ কেজি
এমওপি/পটাশ০.৩৬-০.৪৪ কেজি৪৫-৫৫ কেজি

 

ধনিয়া পাতা
ধনিয়া পাতা

 

ধনিয়া চাষে সেচ :

পাতা সংগ্রহের জন্য ধনিয়ার চাষ করলে ৩/৪ দিন পর হালকাভাবে সেচ দিতে হবে। ধনিয়ার জমিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতিবার সেচের পর ‘জো’ আসার পর মাটির চটা ভেঙে দিন। গ্রীষ্মকালে বীজ ফেলার পর বেডের ওপর হালকা করে খড় বিছিয়ে দিন। এতে সেচ বা বৃষ্টির পানিতে ভিজে পাতায় মাটি লাগার হাত থেকে রক্ষা পাবে।

 

ধনিয়া পাতা
ধনিয়া পাতা

 

ধনিয়া চাষে পরিচর্যা :

পাতা ফসলের ক্ষেত্রে চারা গজানোর ১০ থেকে ১৫ দিন পর প্রতি সারিতে ৫ সেন্টিমিটার পরপর একটি চারা রেখে বাকি চারা তুলে ফেলতে হবে। বীজ ফসলের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ সেন্টিমিটার পরপর একটি চারা রাখতে হবে। নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার এবং মাটি ঝুরঝুরে করে দিতে হবে।

প্রতিবার সেচের পর জমির ‘জো’ আসামাত্র মাটির জটা ভেঙে দিলে গাছের শিকড় প্রচুর আলো-বাতাস পাবে। ফলে গাছ দ্রুত বাড়বে। ধনে গাছ জমির পানি জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে না। তাই জমাকৃত অতিরিক্ত সেচের পানি বা বৃষ্টির পানি এক থেকে দুই ঘণ্টার মধ্যেই বের করে দিতে হবে।

 

ধনিয়া পাতা
ধনিয়া পাতা

 

ধনিয়ার রোগবালাই :

ধনিয়া পাতার দাগ রোগ :

ছত্রাকের আক্রমণে ধনিয়া পাতার বাড়ন্ত পর্যায়ে দাগ রোগ হয়। এতে প্রথমে পাতায় হলুদ রংয়ের দাগ পড়ে, পরে সাদা হয়ে যায়। দাগগুলো একত্র হলে সম্পূর্ণ পাতাটি নষ্ট হয়। রোগের জীবাণু বাতাসে ছড়ায়। দাগ রোগে পাতা আক্রান্ত হলে কার্বেন্ডাজিম জাতীয় বালাইনাশক (এইমকোজিম/নোইন ২০ গ্রাম ১০ লিটার পানিতে মিশিয়ে) ১০ দিন পর পর ২-৩ বার স্প্রে করতে হবে।

 

ধনিয়ার জাবপোকা :

ধনিয়া গাছ একটু বড় হলে তাতে জাবপোকার আক্রমণ হতে পারে। জাবপোকার হাত থেকে ফসল বাঁচাতে ডাইফেনথিউরন ০.৫ গ্রাম/লিটার, থায়মিথস্কাম ০.৫ গ্রাম/লিটার, ফিপ্রনিল ১ মিলি/লিটার, স্পাইরোমেসিফেন ০.৫ মিলি/লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।

ধনিয়া চাষ পদ্ধতি

 

ধনিয়া পাতা কাটা পোকা :

পাতা কাটা পোকার আক্রমণ থেকে ধনিয়ার ফসল রক্ষা করতে ইমিডাক্লপ্রিড ০.২৫ মিলি/লিটার, অ্যাসিটাপ্রিমিড ০.৫ মিলি/লিটার, অ্যাসিফেট ০.৭৫ গ্রাম/লিটার, কার্বোসালফান ২ মিলি/লিটার একক বা মিশ্রন পানিতে মিশিয়ে প্রয়োগ করতে হবে।

 

ধনিয়া পাতা মোড়ানো রোগ :

ধনিয়ার মোল্ড বা পাতা পাতা মোড়ানো রোগ থেকে ফসলকে রক্ষার জন্য শস্য বের হওয়ার ২০ দিন পরে ২০০ গ্রাম/প্রতি একর জমিতে কার্বেন্ডাজিম স্প্রে করতে হবে।

 

ধনিয়ার শিকড় পচা রোগ :

ধনিয়ার শিকড় পচা থেকে রক্ষা করতে প্রতিরোধের ব্যবস্থা হিসেবে নিমের কেক ৬০ গ্রাম/একর প্রতি ব্যবহার করতে হবে। এছাড়া Carbendazim ৫ গ্রাম/লিটার পানিতে অথবা কপার অক্সি ক্লোরাইড ২ গ্রাম/লিটার পানিতে মিশিয়ে মাটিতে ঢালতে হবে।

 

ধনিয়ার ফসল সংগ্রহ :

বীজ বপনের ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর পাতা সংগ্রহ শুরু করা যায়। পরবর্তী প্রায় ১ মাস ধরে পাতা সংগ্রহ করা যায়। সঠিক পদ্ধতিতে চাষ করতে পারলে ১ শতক জমিতে ১৫ থেকে ২০ কেজি পাতা পাওয়া যায়। তবে বীজ সংগ্রহের জন্য গাছ রেখে দিলে বীজ সম্পূর্ণভাবে পাকলে প্রতি শতকে ৮ থেকে ১০ কেজি বীজ পাওয়া যায়।

 

ধনিয়ার পুষ্টিগুণ :

ধনিয়ায় প্রচুর পুষ্টিগুণ রয়েছে। প্রতি ১০০ গ্রাম ধনিয়া পাতায় ৩.৩ গ্রাম আমিষ, ৪.১ গ্রাম শর্করাসহ ৬ হাজার ৭২ মাইক্রোগ্রাম ক্যারোটিন রয়েছে। এছাড়া ভিটামিন ‘বি২’ বা রিবোফ্লাভিন ০.১৮ মিলিগ্রাম, ভিটামিন-‘বি’ ১৩৫ মিলিগ্রাম, আয়রন ২০.১ মিলিগ্রাম ও ২৯০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। এছাড়াও পটাশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ ও ম্যাগনেশিয়াম রয়েছে ধনেপাতায়।

ধনেপাতা রক্তপ্রবাহ থেকে ক্যান্সার, হৃদরোগ, মস্তিষ্কের বিভ্রাট, মানসিক রোগ, কিডনি ও ফুসফুসের অসুখ এবং হাড়ের দুর্বলতা দূর করে শরীরকে সুস্থ ও সতেজ রাখতে সাহায্য করে। শুধু তাই নয়, এই উদ্ভিদ অ্যান্টিসেপ্টিক, অ্যান্টিফাংগাল এবং যে কোনো চুলকানি ও চামড়ার জ্বলনে অব্যর্থ ওষুধ।

তবে অতিরিক্ত ধনেপাতা খাওয়া ঠিক না। অতিরিক্ত ধনেপাতা লিভারের কার্যক্ষমতাকে খারাপভাবে প্রভাবিত করে। অতিরিক্ত ধনেপাতা নিম্ন রক্তচাপ সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞরা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ধনেপাতা খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

 

Leave a Comment