আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়- নার্সারিতে বেড তৈরি ও বেডে চারা উৎপাদন। কোন একটি নার্সারিতে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে কোথাও গাছের চারা উঁচু করা বেডে অর্থাৎ মাটিতে একসাথে বেড়ে উঠছে। আবার কোথাও ছোট ছোট পলিব্যাগে ঘন করে সারিবদ্ধভাবে অনেক চারা জন্মানো থাকে। মাটিতে কিংবা পলিব্যাগে যেখানে চারা উৎপাদন করা হোক না কেন বেড তৈরি করা প্রয়োজন।
ফলে অল্প জায়গায় অনেক চারা উৎপাদন করা যায় এবং চারার সঠিকভাবে যত্ন করাও সহজ হয়। নার্সারিতে চারা উৎপাদনের জন্য প্রধানত দুই ধরনের বেড ব্যবহার করা হয়। যথা-
১. সরাসরি মাটিতে বেড চারা উৎপাদন।
২. পলিব্যাগে বা ছোট টবে চারা উৎপাদন। মাটিতে চারা উৎপাদনের জন্য বেড তৈরি
প্রথমে জমিটিকে প্রয়োজনমত সমান করে নিন। অতঃপর জমির ক্ষেত্রফল অনুযায়ী ১০০০ ১.৩.৭.০ ১.৩, ১৩ ৩০ ১.৩, ৫০০ ১.৩, ২০১.৩ মিটার আকারের সীমানা ঠিক করুন। মনে রাখবেন, নার্সারি বেড পূর্ব-পশ্চিম লম্বালম্বিভাবে করা উত্তম। এতে চারা পর্যাপ্ত সূর্যালোক পায়।
নির্ধারিত স্থানটিতে লতা-পতা, আগাছা কিংবা যে কোন অপ্রয়োজনীয় পাছ থাকলে তা কেটে পরিষ্কার করুন। এ কাজটি সাধারণত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে করতে হবে। আগাছা পরিষ্কারের পর ১৫-২০ সে.মি. গভীর করে কোদাল দিয়ে ভালোভাবে কুপিয়ে নিন।
এ অবস্থায় দু’চারদিন রেখে দিন যাতে ঢেলাগুলো কিছুটা শুকিয়ে যায় এর পর আগাছা গাছের শিকড়, পাথরসহ অন্যান্য অপ্রজনীয় জিনিস বেছে পরিষ্কার করুন এবং মুগুর দিয়ে ঢেলা ভেঙ্গে মাটি ঝুরঝুরে করে ফেলুন। তবে মাটি যদি এঁটেল প্রকৃতির হয়ে থাকে তবে অন্য সুবিধাজনক স্থান থেকে দো-আঁশ মাটি এনে ঝুরেঝুরে মাটির ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। যদি পুরাতন বেড হয় তবে মাটি কোদাল দিয়ে কুপলেই যথেষ্ট।
Table of Contents
নার্সারিতে বেড তৈরি ও বেডে চারা উৎপাদন

এজিং তৈরি
বেড তৈরি করার পর এতে সরাসরি বীজ বপন বা রোপণ করলে কিনারার চারাগুলো বৃষ্টির পানির স্রোতে নষ্ট হবে। সুতরাং নার্সারি বেডটিকে সুন্দর ও মজবুত রাখার জন্য এর চারদিকে বেষ্টনী দেয়া প্রয়োজন। নার্সারি বেডের মাটিকে চারদিক থেকে আটকে রেখে সুরক্ষিত করার কৌশলকে এজিং বলে। ছোটবাঁশ বা কাঠ (উচ্চতা ০.৩ মিটার) বা ইটের সাহায্যে প্রতিটি বেডের চারদিকে এজং তৈরি করুন।

বেডের মাটি পরিশোধন
মাটিতে যদি রোগ জীবাণু থাকার সম্ভাবনা থাকে তবে এলাকা বিশেষ ১৩০ ১.৩ মি. সাইজের প্রতিটি বেড়ে ২ কেজি গ্যামাক্সিকন অথবা ফরমালডিহাইড প্রয়োগ করে মাটিকে পরিশোধন করুন। ডারায় রোগজীবানুর আক্রমণ কম হবে।
বেডে সার প্রয়োগ
নার্সারি বেডে উত্তম চারা উৎপাদন করতে হলে পরিমিত পরিমাণে বিভিন্ন রকমের সার প্রয়োগ আবশ্যক। সারের পরিমাণ মূলত মাটির উর্ধ্বতা এবং উদ্ভিদের প্রজাতির উপর নির্ভরশীল। বেশি সার প্রয়োগ করলে চারা মোটা ও লম্বা হয়ে যায় এবং পরবর্তী বছর স্ট্যাম্প তৈরি করা যায় না।
আবার খুব কম সার প্রয়োগ করলে চারার বৃদ্ধি কমে যায়। যাহোক, একটি স্থায়ী বীজতলার নার্সারি বেডে (১৩০০১.৩ মিটার) নিম্নলিখিত হারে জৈব ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা যেতে পারে।
শুকনো গোবর
৮০ কেজি
৪০ কেজি
কম্পোস্ট সার
৫০০ গ্রাম
২০০ গ্রাম
টি.এস.পি
এম.পি
ইউরিয়া
বীজ বপনের ১০-১২ দিন আগে গোবর, কম্পোস্ট, টি. এস. পি ও এম. পি. সার ভালোভাবে মাটির সংগে মিশাতে হয়। চারা কিছুটা বড় হওয়ার পর ইউরিয়া পানির সাথে বা ছিটিয়ে কয়েকবার প্রয়োগ করা হয়। অতঃপর বেডের মাটি হালকাভাবে কোদাল দিয়ে কুপিয়ে নির্ধারিত হারে বীজ ছিটানো পদ্ধতিতে বপন করুন।

পলিব্যাগ চারা উত্তোলনের জন্য বেড তৈরি
পলিব্যাগে চারা উৎপাদনের জনা বেডের মাটি চাষ করার প্রয়োজন নেই। কারণ এক্ষেত্রে বীজ পলিব্যাগের মধ্যে অবস্থিত মাটিতে বপন করতে হয়। তবে পলিব্যাগ যেখানে সারিবদ্ধভাবে রাখা হবে সেখানে পূর্বের ন্যায় এজিং করে নিতে হয়।
ফলে পলিব্যাগগুলো সোজাভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। তবে বীজতলার মাটি সমান ও আগাছামুক্ত রাখা একান্ত প্রয়োজন। নার্সারির জন্য প্রয়োজনীয় জমির পরিমাণ নির্ভর করে:-
১. বছরে কতটি চারা উৎপাদন করা হবে।
২. কি কি ধরনের উদ্ভিদের চারা উৎপাদন করা হবে।
৩. নার্সারির উদ্দেশ্য ও এবং স্থায়ীত্ব।
৪. পুঁজি ও অর্থনৈতিক চাহিদা ইত্যাদির উপর। কি পরিমাণ চারা উৎপাদনের জন্য কতটুকু জায়গার প্রয়োজন তা নিচে দেওয়া হলো:
পলিব্যাগের আকার
১৫ সে.মি. ০০১০ সে.মি.
২৫ সে.মি. ১৫ সে.মি. ৪০ সে.মি. ০০ ২৩ সে.মি.
প্রতি বর্গমিটারে উৎপাদিত চারার সংখ্যা
২২০-২২৫ টি
১০০ ১০৫ টি
২৫-৩০টি
সরাসরি বীজতলায় চারা উৎপাদন ও স্ট্যাম্প চারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে চারার সংখ্যা :
চারা থেকে চারার দূরত্ব
প্রতি বর্গমিটারে চারার সংখ্যা
৪ সে.মি. ৪ সে.মি.
৬২৫ ৬৫০টি
৫ সে.মি.৫ সে.মি.
১০ সে.মি. ০৫ সে.মি.
৩৮০-৪০০ টি
১০ সে.মি. ১০ সে.মি.
৯৫ ১০০ টি
নার্সারিতে রাস্তা ও ড্রেনের জন্য বীজতলার সমপরিমাণ জায়গার প্রয়োজন হয়। অফিস বিভিন্ন শেড ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত জায়গার জন্য মোট জায়গার শতকরা ১০ অতিরিক্ত জায়গা রাখতে হবে।
সারমর্ম
নার্সারিতে বেডে ও পলিব্যাগে উভয় পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করা হয়। বেড়ে কম পরিশ্রমে, অল্প খরচে অধিক চারা উৎপাদন করা যায়। পক্ষান্তরে পলিব্যাগে শ্রম ও অর্থ বেশি লাগলেও চারা তুলনামূলকভাবে সুস্থ ও সবল হয়।
