আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়-পোনা মজুদের পরবর্তী পরিচর্যা
পোনা মজুদের পরবর্তী পরিচর্যা
সার প্রয়োগ
পুকুরে পোনা মজুদের পরদিন থেকে নিম্নলিখিত হারে সার প্রয়োগ করতে হয়-
সার পরিমাণ (শতাংশ প্রতি) পরিমাণ (বিঘা প্রতি)
গোবর সার ১৪০-১৫০ গ্রাম ৮ কেজি
মুরগির বিষ্ঠা ১২০-১২৫ গ্রাম ৪ কেজি
ইউরিয়া ৪-৫ গ্রাম ১৫০-২০০ গ্রাম
টি.এস.পি. ২-৩ গ্রাম ১০০ গ্রাম
উপরোক্ত তিন ধরনের সার একত্র করে তিনগুণ পানিতে ভিজিয়ে রেখে পরদিন সকালে সমস্ত পুকুরে ছিটিয়ে দিতে হবে।

সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ
পোনার ভালো বৃদ্ধি এবং বেশি উৎপাদনের জন্য পোনার সংখ্যা ও দেহের ওজনের অনুপাতে প্রতিদিন সম্পূরক খাদ্য প্রয়োগ করতে হয়। সম্পূরক খাদ্য হিসেবে চালের কুঁড়া বা গমের ভূষি, খৈল, গবাদি পশুর রক্ত, ফিশমিল, সে পানা এসব ব্যবহার করা যায়। পুকুরে প্রতিদিন খাবার দেয়ার তালিকা (প্রতি শতাংশ) নিচে দেওয়া হলোঃ
উপাদান%
দিন পরিমাণ (গ্রাম) খৈল ভুষি গবাদিপশুর রক্ত/ ফিশমিল

উপরের উপাদানগুলো পানিতে মিশিয়ে প্রতিদিন পোনা মাছকে খাওয়াতে হবে। পুকুরের একটি নির্দিষ্ট স্থানে মোট খাবারের অর্ধেক সকালে এবং বাকি অর্ধেক বিকালে সরবরাহ করতে হবে। পুকুরে যদি গ্রাসকার্প বা থাই সরপুটি মজুদ করা হয় তবে ক্ষুদে পানা দিতে হবে।
পরিচর্যা
১. পোনা ছাড়ার পরদিন থেকে ১-২ দিন পর পর পুকুরে ‘হররা’ টানতে হবে। এ কাজ সকাল বেলা করা উত্তম।
২ পোনা ছাড়ার ১০-১২ দিন পর পর পুকুরে জাল টেনে মাছের স্বাস্থ্য, ওজন, বৃদ্ধি এবং আনুমানিক বেঁচে থাকার হার দেখতে হবে।
৩. জলজ আগাছা নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
8. রোগ-বালাই হলে প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে হবে।
পুকুর ও মাছের যত্ন
ভালো ফলনের জন্য মাছ চাষের ক্ষেত্রে মাছের ও পুকুরের যত্ন নেওয়ার যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। পুকুরে মাছ ছাড়ার পর যেমন মাছের খাওয়া-দাওয়া, রোগব্যাধি ইত্যাদি খেয়াল রাখতে হয়, তেমনি পুকুরের পরিবেশের প্রতিও খেয়াল রাখা উচিত।
১. পুকুরের স্বাস্থ্যকর অবস্থা বজায় রাখতে হলে নিচে বর্ণিত বিষয়গুলোর প্রতি খেয়াল রাখতে হবে।
ক. পানির রং পানির রং সবুজ বা বাদামি হলে বোঝা যাবে পানিতে মাছের খাদ্য আছে। সুতরাং পানির রং সবুজ বা বাদামি করার ব্যবস্থা করতে হবে এবং মাছের জন্য বাইরে থেকে খাবার সরবরাহ করতে হবে। পানির রং সবুজ করার জন্য পানিতে নিয়মিতভাবে সার দিতে হয়।
খ. পানির স্বচ্ছতা : পানিতে কনুই পর্যন্ত হাত ডুবানোর পর যদি হাতের তালু দেখা যায় তবে বুঝতে হবে মাছের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য নেই। এক্ষেত্রে নিয়মিতভাবে সার প্রয়োগ করতে হবে।
গ. পুকুরের তলার কাদার অবস্থা: পুকুরে কাদামাটির পরিমাণ ৩০ সে.মি. (১ ফুট) এর বেশি হয় তবে তা তুলে ফেলতে হবে। অতিরিক্ত কাদা মাটির জন্য পুকুরের তলায় বিষাক্ত গ্যাস সৃষ্টি হয়ে পানি দূষিত করে ফেলে। ফলে অক্সিজেনের অভাব ঘটে।
ঘ. বিষাক্ত গ্যাস পরীক্ষা পুকুরে পানির উপর অনেক সময় বুদবুদ দেখা যায়। তখন বুঝতে হবে পানিতে বিষাক্ত গ্যাসের সৃষ্টি হয়েছে। এক্ষেত্রে বিষাক্ত গ্যাস দূর করার জন্য পুকুরে হররা টানতে হবে বা চুন প্রয়োগ করতে হবে। শুষ্ক মৌসুমে পুকুর শুকিয়ে ফেলতে হবে।

মাছ চাষে লক্ষণীয়
পানির রং স্বচ্ছ নিয়মিত সার ব্যবহারের পর পানির রং পরিষ্কার থাকলে নিয়মিত সারের পাশাপাশি শতাংশ প্রতি ১ কেজি খৈল ও ১৫০ গ্রাম ভূষি প্রয়োগ করতে হবে। পানির উপর সবুজ স্তর পুকুরের পানির রং ঘন সবুজ বা পানির উপরিভাগে শেওলার পুরু স্তর পড়লে পুকুরে মাছের খাদ্য ও সার প্রয়োগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে।
পানির উপর লাল স্তর: পানির উপরিভাগে লাল স্তর পড়লে ধানের খড়ের দড়ি বা কলা গাছের পাতা পেঁচিয়ে পানির উপর দিয়ে ভাসমান অবস্থায় টেনে লাল স্তর এক জায়গায় জমা করতে হবে। তারপর কাপড় দিয়ে তা তুলে পুকুরের পানি পরিষ্কার করে ফেলতে হবে।
মাছের খাবি খাওয়া ভোর বেলা, মেঘলা দিনে বা দিনের সময় যদি পানির উপর মাছ ভেসে উঠে বা মাছ মুখ হা করে খাবি খেতে থাকে তখন বুঝতে হবে পুকুরের পানিতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ অক্সিজেন নেই। এমতাবস্থায় পানি বাশ দিয়ে পিটিয়ে বা ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের পুকুরের পানিতে সাঁতার কাটিয়ে পানিতে আন্দোলিত করতে হবে। এতে পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কিছুটা বাড়বে এবং মাছের খাবি খাওয়া দূর হবে।
সবুজকণা পানিতে শেওলাজাতীয় একরকম অতি ক্ষুদ্র উদ্ভিদ জন্মায়। এগুলো আকারে এত ছোট যে খালি চোখে দেখা যায় না। পুকুরে এগুলো জন্মালে পানির রং সবুজ দেখায়। এগুলোকে সবুজ কণা বা উদ্ভিদ প্ল্যাংকটন বলে। এগুলো মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে পরিচিত।
প্রাণিকণা :
পানিতে অতি সূক্ষ্ম যেসব প্রাণী জন্মায় সেগুলোকে প্রাণিকণা বা প্রাণী প্ল্যাংকটন বলে। এদের বেশির ভাগই খালি চোখে দেখা যায় না। প্রাণিকণার আধিক্যের কারণে পানির রং বাদামি হয়। এগুলোও মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে পরিচিত।
সারমর্ম:
- পোনা মজুদের পরদিন থেকে পুকুরে সার ও সম্পূরক খাবার দিতে হয়।
- পোনা মজুদের ১-২ দিন পর পর সকালে হররা টানা প্রয়োজন।
- অক্সিজেনের অভাব হলে মাছ খাবি খায়।
- পুকুরে বাঁশ পিটিয়ে বা সাঁতার কেটে অক্সিজেনের অভাব দূর করা যায়।
