‘মাছে-ভাতে বাঙালি’—এই প্রবাদটি আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির সাথে গভীরভাবে মিশে আছে। প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস হিসেবে মাছের গুরুত্ব অপরিসীম। মাছ একটি দ্রুত পচনশীল দ্রব্য, তাই আহরণের পর সঠিক ব্যবস্থা না নিলে এটি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। দুর্ভাগ্যবশত, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মাছকে দীর্ঘসময় টাটকা রাখতে এবং পচন রোধ করতে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বিষাক্ত রাসায়নিক ‘ফরমালিন’ ব্যবহার করে। ফরমালিনযুক্ত মাছ গ্রহণ করলে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভার ড্যামেজসহ নানা জটিল রোগ হতে পারে। তাই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে মাছে ফরমালিনের উপস্থিতি যাচাই করা বর্তমান সময়ে অত্যন্ত জরুরি। আজকের এই ব্যবহারিক পাঠে আমরা রাসায়নিক ‘ফরমালিন শনাক্তকারী কিট’ ব্যবহার করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছের নিরাপত্তা যাচাই করার কৌশল হাতে-কলমে শিখব। এই পাঠটি বাউবির “কৃষি শিক্ষা ২য় পত্র” বিষয় এর ইউনিট – ৫ , পাঠ -৫.৪।
Table of Contents
ব্যাবহারিক : ফরমালিন শনাক্তকারী কীট দ্বারা ফরমালিনযুক্ত মাছ শনাক্তকরণ
ব্যবহারিক : ফরমালিন শনাক্তকারী কিট দ্বারা ফরমালিনযুক্ত মাছ শনাক্তকরণ
পাঠ পরিচিতি:
- বিষয়: কৃষি শিক্ষা (২য় পত্র)
- ইউনিট: ৫ (মৎস্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ)
- পাঠ: ৫.৪
- শিরনাম: ফরমালিন শনাক্তকারী কিট ব্যবহারের মাধ্যমে মাছের নিরাপত্তা যাচাই।
প্রাসঙ্গিক তথ্য ও তাত্ত্বিক আলোচনা (Theoretical Background)
ফরমালিন কী?
ফরমালডিহাইড (Formaldehyde – $HCHO$) গ্যাসের ৩৭% থেকে ৪০% জলীয় দ্রবণকে ফরমালিন বলা হয়। এই দ্রবণকে স্বচ্ছ রাখার জন্য এতে সাধারণত ১০-১৫% মিথানল যুক্ত করা হয়।
ব্যবহার ও অপব্যবহার:
ফরমালিন মূলত একটি শক্তিশালী জীবাণুনাশক (Disinfectant) এবং টিস্যু প্রিজারভেটিভ। এটি চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণাগারে মৃত প্রাণীদেহ, মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ এবং টেক্সটাইল বা প্লাস্টিক শিল্পে ব্যবহৃত হয়। ফরমালিন আমিষ বা প্রোটিনের সাথে বিক্রিয়া করে টিস্যুকে শক্ত করে ফেলে, ফলে ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক আক্রমণ করতে পারে না এবং পচন রোধ হয়।
দুর্ভাগ্যবশত, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মাছ, মাংস, দুধ ও ফলমূলে পচন রোধ করার জন্য এই বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করে। ফরমালিনযুক্ত খাবার মানবদেহে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভার ড্যামেজসহ মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। তাই জনস্বার্থ ও নিরাপদ খাদ্যের জন্য মাছের ফরমালিন শনাক্তকরণ অত্যন্ত জরুরি।
উদ্দেশ্য (Objectives)
এই ব্যবহারিক ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীরা:
১. ফরমালিনযুক্ত ও ফরমালিনমুক্ত মাছের ভৌত লক্ষণগুলো চিনতে পারবে।
২. রাসায়নিক কিট ব্যবহার করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাছে ফরমালিনের উপস্থিতি নির্ণয় করতে পারবে।
৩. নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারবে।
মাছের ভৌত পর্যবেক্ষণ (Physical Observation)
পরীক্ষাগারে রাসায়নিক পরীক্ষার আগে মাছের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য দেখেও প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়। নিচে ফরমালিনমুক্ত (নিরাপদ) এবং ফরমালিনযুক্ত মাছের তুলনামূলক পার্থক্য দেওয়া হলো:
| বৈশিষ্ট্য | ফরমালিনমুক্ত (নিরাপদ) মাছ | ফরমালিনযুক্ত (বিষাক্ত) মাছ |
| চোখ | স্বচ্ছ, উজ্জ্বল এবং বাইরের দিকে সামান্য বের হওয়া। | ঘোলাটে, ফ্যাকাশে এবং কোটরের ভেতরের দিকে ঢুকানো। |
| ফুলকা | প্রাকৃতিকভাবে লালচে বা উজ্জ্বল মেরুন রঙের এবং পিচ্ছিল। | কালচে, ধূসর বা ফ্যাকাশে রঙের এবং শুকনো মনে হবে। |
| দেহ ও ত্বক | প্রাকৃতিকভাবে পিচ্ছিল বা শ্লেষ্মা যুক্ত থাকবে। | খসখসে বা শুকনো মনে হবে, পিচ্ছিল ভাব থাকবে না। |
| মাংসপেশি | চাপ দিলে গর্ত হয়ে যাবে এবং ছেড়ে দিলে দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসবে (ইলাস্টিক)। | রাবারের মতো শক্ত বা অসার মনে হবে। চাপ দিলে সহজে ডেবে যাবে না। |
| আঁশ | আঁশ উজ্জ্বল দেখাবে এবং সহজে উঠে আসবে না। | আঁশ শুষ্ক, মলিন এবং টান দিলে সহজেই উঠে আসতে পারে। |
| গায়ের গন্ধ | মাছের স্বাভাবিক আঁশটে গন্ধ থাকবে। | কোনো আঁশটে গন্ধ থাকবে না, বরং হালকা ঝাঁঝালো বা রাসায়নিক গন্ধ পাওয়া যাবে। |
| মাছি ও পোকা | মাছের গায়ে সাধারণভাবেই মাছি বসবে। | মাছে কোনো মাছি বা পোকামাকড় বসবে না। |
প্রয়োজনীয় উপকরণ (Required Materials)
পরীক্ষাটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য ল্যাবরেটরিতে নিচের উপকরণগুলো প্রস্তুত রাখতে হবে:
- নমুনা: বাজার থেকে সংগ্রহ করা সন্দেহজনক মাছ।
- রাসায়নিক: ফরমালিন শনাক্তকারী কিট (সাধারণত তিনটি দ্রবণ থাকে: সলিউশন-১, সলিউশন-২ এবং সলিউশন-৩)।
- কাঁচের সরঞ্জাম: টেস্ট টিউব, টেস্ট টিউব স্ট্যান্ড, বিকার, মেজারিং সিলিন্ডার, ড্রপার।
- অন্যান্য: পাতিত পানি (Distilled Water), ওয়াশ বোতল, ট্রে বা প্লেট, হ্যান্ড গ্লাভস ও মাস্ক (নিরাপত্তার জন্য)।
কার্যপদ্ধতি (Procedure)
পরীক্ষাটি ধাপে ধাপে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সম্পন্ন করতে হবে:
ধাপ–১: নমুনা প্রস্তুতি
১. প্রথমে সন্দেহযুক্ত মাছটি একটি পরিষ্কার ট্রে-তে রাখতে হবে।
২. ওয়াশ বোতলের সাহায্যে পাতিত পানি দিয়ে মাছটির গা ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। (লক্ষ্য রাখতে হবে যেন মাছের গায়ের রাসায়নিক পদার্থ পানিতে চলে আসে)।
৩. মাছ ধোয়া পানিটি একটি পরিষ্কার বিকারে সংগ্রহ করতে হবে। এটিই আমাদের পরীক্ষণের নমুনা পানি।
ধাপ–২: রাসায়নিক প্রয়োগ
৪. বিকার থেকে মেজারিং সিলিন্ডারের সাহায্যে মেপে ঠিক ৫ মিলি (ml) মাছ ধোয়া পানি একটি পরিষ্কার টেস্ট টিউবে নিতে হবে।
৫. এবার ফরমালিন কিট বক্স থেকে ‘দ্রবণ–১‘ (Solution-1) এর বোতলটি নিয়ে টেস্ট টিউবের পানিতে ১৫ ফোটা যোগ করতে হবে। এরপর টেস্ট টিউবটি ১৫ সেকেন্ড ধরে আলতো করে ঝাঁকাতে হবে।
৬. এরপর ‘দ্রবণ–২‘ (Solution-2) এর ১৫ ফোটা একই টেস্ট টিউবে যোগ করতে হবে এবং পুনরায় ১৫ সেকেন্ড ঝাঁকাতে হবে।
৭. সবশেষে ‘দ্রবণ–৩‘ (Solution-3) এর ১৫ ফোটা টেস্ট টিউবে যোগ করতে হবে এবং শেষবারের মতো ১৫ সেকেন্ড ঝাঁকিয়ে স্থিরভাবে রেখে দিতে হবে।
ধাপ–৩: রং পর্যবেক্ষণ
৮. টেস্ট টিউবের পানির রঙের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কি না তা কয়েক সেকেন্ড বা মিনিটের মধ্যে পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
পর্যবেক্ষণ ও ফলাফল নির্ণয় (Observation & Result Analysis)
রাসায়নিক বিক্রিয়ার পর টেস্ট টিউবের দ্রবণটির রঙের ওপর ভিত্তি করে নিচের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে:
- নেতিবাচক ফলাফল (নিরাপদ): যদি দ্রবণের রঙের কোনো পরিবর্তন না ঘটে অর্থাৎ পানি আগের মতোই বর্ণহীন বা সামান্য ঘোলাটে থাকে, তবে বুঝতে হবে মাছটিতে ফরমালিন নেই।
- ইতিবাচক ফলাফল (বিপজ্জনক): যদি দ্রবণের রং পরিবর্তিত হয়ে গোলাপি, লালচে, বেগুনি বা ম্যাজেন্টা বর্ণ ধারণ করে, তবে বুঝতে হবে মাছটিতে ফরমালিন মেশানো হয়েছে। রঙের গাঢ়ত্ব যত বেশি হবে, ফরমালিনের মাত্রা তত বেশি বলে গণ্য হবে।
সতর্কতা (Precautions)
১. নিরাপত্তা: ফরমালিন এবং কিটের রাসায়নিক দ্রবণ ত্বকের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই গ্লাভস এবং মাস্ক পরিধান করা উচিত।
২. পরিমাপ: মাছ ধোয়া পানি এবং রি-এজেন্ট (কিট সলিউশন) এর পরিমাণ যেন সঠিক হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ফোটা গণনায় সতর্ক থাকতে হবে।
৩. নমুনা পানি: মাছ ধোয়ার সময় খুব বেশি পানি ব্যবহার করা যাবে না, এতে ফরমালিনের ঘনত্ব কমে গেলে কিট কাজ নাও করতে পারে। অল্প পানিতে মাছ ধুতে হবে।
৪. পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা: টেস্ট টিউব এবং অন্যান্য কাঁচের পাত্র ব্যবহারের আগে ও পরে পাতিত পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে শুষ্ক করে নিতে হবে।

উপরোক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে আমরা সহজেই ফরমালিনযুক্ত মাছ শনাক্ত করতে পারি। যদি পরীক্ষায় পজিটিভ ফলাফল (লালচে/গোলাপি রং) আসে, তবে সেই মাছ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে এবং প্রয়োজনে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। এই সহজ পরীক্ষা পদ্ধতিটি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
