আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় ফসল পরিচিতি ও গুরুত্ব – যা কৃষিজ উৎপাদনঃ ফসল এর অন্তর্ভুক্ত ।
Table of Contents
ফসল পরিচিতি ও গুরুত্ব

আদিকালে মানুষ বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদকে খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করত। পরবর্তীতে তারা ধীরে ধীরে বুঝতে শিখল যে, একেক ধরনের উদ্ভিদ থেকে একেক ধরনের দ্রব্য উৎপন্ন হয়। কোনো উদ্ভিদ থেকে নানা, কোনো উদ্ভিদ থেকে চিনি, কোনো উদ্ভিদ থেকে আঁশ ইত্যাদি পাওয়া যায়। মানুষ এসব উদ্ভিদকে সংগ্রহ করে যত্নের সাথে চাষ করে এবং নিজেদের প্রয়োজন মেটায়।
সুতরাং অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্ব সম্পন্ন যে সমস্ত উদ্ভিদ বা গাছপালা মানুষ যত্নের সাথে মাঠে চাষ করে, সেগুলোকে মাঠ ফসল (Field crops) বলা হয়। জমিনে জন্মানো সব উদ্ভিদই ফসল নয় তাই মানুষ প্রয়োজনে যে সমস্ত গাছপালার চাষ করে সেগুলোকেই ফসল বলা হয়।
সাধারণভাবে কৃষিতাত্ত্বিক ফসলগুলোকে (Agronomic crops) মাঠ ফসল এবং বাগান ফসলগুলোকে উদ্যানতাত্ত্বিক ফসল (Horticultural crops) বলা হয়। জমি তৈরি থেকে শুরু করে বীজ উৎপাদন পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে মাঠ ফসল ও উদ্যান ফসলে যত্নের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। মাঠ ফসল ও উদ্যান ফসলের পার্থক্য নিচে তুলে ধরা হলো-
মাঠ ফসল
১। মাঠ ফসল সাধারণত সমষ্টিগতভাবে চাষ করা হয়। যেমন- ধান, গম, পাট ইত্যাদি।
২। মাঠ ফসলে সাধারণত বেড়া নির্মাণের প্রয়োজন হয়
৩। মাঠ ফসল সাধারণত এক সাথে পরিপক্ক হয় বিধায় এক সাথেই সংগ্রহ করা হয়।
8। মাঠ ফসল সাধারণত শুকিয়ে ব্যবহার করা হয়। যেমন- ধান, পাট, ডাল ইত্যাদি।
উদ্যান ফসল
১। সাধারণত প্রতিটি গাছকে এককভাবে যত্ন নেয়া হয়। যেমন- আম, জাম, কলা ইত্যাদি।
২। উদ্যান ফসলে বেড়া নির্মাণের প্রয়োজন হয়।
৩। উদ্যান ফসল পর্যায়ক্রমে পরিপক্ষ হয় বিধায় ধাপে ধাপে সংগ্রহ করা হয়। যেমন- টমেটো, বেগুন ইত্যাদি।
৪। উদ্যান ফসল সাধারণত তাজা অবস্থায় ব্যবহার করা হয়। যেমন-বিভিন্ন ধরনের সবজি ও ফল ।
বিভিন্ন ধরনের মাঠ ফসল আমরা জমিতে জন্মাতে দেখি। এবার দেখা যাক মাঠ ফসলের কৃষিতাত্ত্বিক শ্রেণিবিভাগ
১। তণ্ডুল বা দানাজাতীয় শস্য: এরা গ্রামিনী পরিবারের অন্তর্গত। এ পরিবারের খাবার উপযোগী দানা জাতীয় শসাগুলোকেই তন্ডুল ফসল বলে। যেমন- ধান, গম, ভূট্টা, যথ, চীনা, কাওন ইত্যাদি।
২। ফসল: পিগুমিনোসি পরিবারের প্যাপিলিওনেসি উপ-পরিবারের যে সমস্ত দানাজাতীয় ফসল ভালের জন্য চাষ করা হয়, সেগুলোকে ভাল ফসল বলা হয়। যেমন- মসুর, খেসারি, মুগ, ছোলা, মাসকালাই ইত্যাদি ।
৩। তৈল ফসল: যে সমস্ত ফসলের বীজ থেকে তেল সংগ্রহ করা হয়। সেগুলোকে তৈল ফসল বলা হয়। যেমন- সরিষা, সয়াবিন, তিল, তিসি, সূর্যমুখী ইত্যাদি ।
৪। চিনি ফসল: যে সমস্ত ফসলের রস থেকে মিষ্টিজাতীয় পদার্থ যেমন- চিনি, গুড়, মিছরি ইত্যাদি তৈরি করা হয়, সেগুলোকে চিনি ফসল বলে। যেমন- আয, বিট, খেজুর, তাল ইত্যাদি । খেজুর, তাল মাঠ ফসলের আওতাধীন না হলেও এর চিনি ফসলের অন্তর্ভুক্ত।
৫। আঁশ ফসল: আঁশ পাওয়ার জন্য যে সমস্ত ফসল চাষ করা হয়, সেগুলোকে আঁশ ফসল বলা হয়। যেমন- পাট, তুলা, শনপাট, কেনাফ, রামী ইত্যাদি ।
৬| নেশা ফসল: নেশাজাতীয় দ্রব্য উৎপাদানের জন্য যে সমস্ত ফসল চাষ করা হয়, সেগুলোকে নেশা ফসল বলে। যেমন- তামাক, গাঁজা, আফিম, কুঝি, যেনবেন ইত্যাদি।
৭। পানীয় ফসল: যে সকল ফসল পানীয় দ্রব্য উৎপাদনের জন্য চাষ করা হয়, সেগুলোকে পানীয় ফসল বলে । যেমন- চা, কফি, কোকো ইত্যাদি ।
৮। পশুখাদ্য ফসল: পশুর খাদ্যের জন্য যে সমস্ত ফসল চাষ করা হয়। সেগুলোকে পশুখাদ্য ফসল বলে । যেমন- প্যারা ঘাস, নেপিয়ার ঘাস, ভূট্টা, জোয়ার, খেসারি, মাসকালাই ইত্যাদি ।
৯। সবুজ সার ফসল: যে সমস্ত সবুজ ফসল জন্মানোর একটা নির্দিষ্ট সময় পর মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে জৈব সার তৈরির জন্য চাষ করা হয়, সেগুলোকে সবুজ সার ফসল বলে। যেমন- ধইঞ্চা, শনপাট ইত্যাদি ।
নিচে প্রধান প্রধান কিছু ফসলের বাংলা, ইংরেজি ও বৈজ্ঞানিক নাম উল্লেখ করা হলো-

ফসল চাষের গুরুত্ব
বেঁচে থাকার জন্য মানুষের পুষ্টির প্রয়োজন। আর এই পুষ্টি উপাদান আসে বিভিন্ন প্রকার খাবার থেকে। ফসল, পশুপাখি ও মাছ থেকে আমরা আমাদের খাবার পেয়ে থাকি। জীবনকে সুস্থ, সবল, সচল, কর্মক্ষম ও দেহের বৃদ্ধিসাধনের জন্য যে সব উদ্ভিদজাত দ্রব্য প্রয়োজন হয় সেগুলোকে উদ্ভিদজাত খাদ্য বলা হয় ফসল হলো মানুষের খাদ্যের প্রধান উৎস। বিভিন্ন প্রকার ফসলের মধ্যে ধান আমাদের প্রধান। কারণ ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য।
সারা বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যাই খাদ্য হিসেবে ভাত গ্রহণ করে। বাংলাদেশে মোট আবাদি জমির প্রায় ৮০% জমিতেই ধান চাষ করা হয়। পার্শ্ববর্তী ভারতে ধান চাষে সবচেয়ে বেশি জমি ব্যবহৃত হয়। ধান প্রধানত শর্করা জাতীয় খাবারের চাহিদা মিটিয়ে থাকে। তবে এতে ৮% আমিষও রয়েছে। বাচ্চা থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষ নিরাপদে এ খাবার খেতে পারে।
মসুর, ছোলা, মুগ, অড়হর, মটর, মাসকালাই ইত্যাদি ডালজাতীয় ফসল মাঠে চাষ করা হয়। এ ফসলগুলো আমিষ সমৃদ্ধ ও মাংসের তুলনায় সস্তা বিধায় এদেরকে গরীবের মাংস বলা হয়। কৃষি প্রধান বাংলাদেশে ভূমির উর্বরতা রক্ষায় এজাতীয় ফসল অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। নিবিড় শস্য চাষ করলে জমিতে জৈব পদার্থ ধীরে ধীরে হ্রাস পায়। জৈব পদার্থ হলো মাটির প্রাণ। ডালজাতীয় শস্য চাষ করলে মাটিতে প্রচুর পরিমাণ জৈব পদার্থ ও নাইট্রোজেন সার যোগ হয়।
এ জাতীয় ফসল মানুষের পুষ্টির পাশাপাশি আমিষ সমৃদ্ধ পশুখাদ্য হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। এছাড়া তৈলবীজ ফসল আমাদের স্নেহজাতীয় পদার্থের যোগান দিয়ে থাকে। আঁশজাতীয় ফসল চাষ করে আমরা আমাদের দৈনন্দিন অনেক চাহিদাই মিটিয়ে থাকি।
কিছু আঁশ ফসল আছে যেগুলো রপ্তানি করে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হয়। মোদ্দা কথা ফসলের চাষাবান খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং পুষ্টিহীনতা দূর করতে যথেষ্ট ভূমিকা রাখে। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর পুষ্টির যোগান দিতে এদের অবদান অনস্বীকার্য ।
সারসংক্ষেপ
কৃষিজ উৎপাদন বলতে বিভিন্ন ধরনের মাঠ ও উদ্যান ফসল ঔষধি গাছপালা, গৃহপালিত পশুপাখি মাছ ইত্যাদির চাষ বা উৎপাদনকে বুঝানো হয়ে থাকে। আদিকালে মানুষ বিভিন্ন ধরণের উদ্ভিদকে খাবার হিসেবে গ্রহণ করলেও পরবর্তীতে তারা জানতে পারল যে, একেক উদ্ভিদ থেকে একেক ধরনের দ্রব্য উৎপন্ন হয়। মাঠে সমষ্টিগতভাবে চাষ করা হয় এবং যাদের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আছে এমন ফসলকে মাঠ ফসল বলে।
আবার বাগান ফসল যেখানে প্রতিটি গাছকে আলাদাভাবে যত্ন নেবার প্রয়োজন হয়, তাদেরকে উদ্যান ফসল বলা হয়। মানুষের জীবনকে সুস্থ, সচল, সবল, কর্মক্ষম ও দেহের বৃদ্ধিসাধনের জন্য উদ্ভিদজাত খাবার অপরিহার্য।
