বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফসলের অবদান

বাংলাদেশ একটি কৃষি নির্ভর দেশ। দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকা প্রধানত কৃষি কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীল। কৃষি শুধু খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না, বরং বৈদেশিক মুদ্রা আয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পখাতের কাঁচামালের যোগান দানের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ গঠন করে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৮.৫% মানুষ কৃষি কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত এবং কৃষি খাত থেকে দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের প্রায় ৩৫% আসে। এছাড়াও, জাতীয় আয়ের প্রায় ৩৯.৩৭% আসে এই খাত থেকে (বি.বি.এস., ১৯৯৪)।

কৃষি প্রধান হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের কৃষি আবাদযোগ্য জমি ক্রমহ্রাসমান। ১৯৭০-এর দশকে মাথাপিছু জমির পরিমাণ প্রায় এক একর হলেও বর্তমানে তা প্রায় ০.২৫ একর। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিভিন্ন ফসল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিগত কয়েক দশকে খাদ্যশস্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৫০-৫১ অর্থ বছরে খাদ্য উৎপাদন ছিল ৬২ লক্ষ টন; ১৯৬০-৬১ অর্থ বছরে তা বেড়ে ৯৭ লক্ষ টনে উন্নীত হয়। ১৯৮৯-৯০ সালে খাদ্যশস্যের উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ৬৪ লক্ষ টনে পৌঁছায় এবং ১৯৯২-৯৩ সালে তা ১ কোটি ৭২ লক্ষ টনে উন্নীত হয়। এই ২৯ বছরের সময়ে খাদ্য উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে।

উৎপাদনের এই বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার, উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন এবং কৃষকদের কার্যকর চাষপ্রণালী। তবে উৎপাদন বৃদ্ধি সত্ত্বেও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে খাদ্য ঘাটতি পূর্ণভাবে দূর হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, ফসলের উৎপাদন ও কৃষি প্রযুক্তি বাংলাদেশ অর্থনীতিতে একটি অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা পালন করছে।

 

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফসলের অবদান

 

প্রধান ফসল তাদের অবদান

বাংলাদেশের প্রধান ফসলগুলোর মধ্যে ধান, গম, পাট, আখ, চা, তামাক, আলু, ডাল, তৈলবীজ এবং ফল-শাক উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি ফসল দেশের অর্থনীতিতে অনন্য অবদান রাখে।

ধান

বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য। বর্তমানে দেশে ৩৯টি উচ্চফলনশীল জাতের ধান উদ্ভাবন করা হয়েছে, যার অধিকাংশই কৃষক মাঠে চাষ করছেন। ধানের জমি কম হলেও উৎপাদন হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ধানের মোট উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭০ সালে দেশের চাল উৎপাদন প্রায় ১০ মিলিয়ন টন হলেও বর্তমানে তা প্রায় ১৯ মিলিয়ন টনে উন্নীত হয়েছে। ধানের উচ্চ ফলনশীল জাতের ব্যবহার, উন্নত সার ও সেচ প্রযুক্তি এবং আধুনিক চাষপদ্ধতি চালের উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে দেশে এখনও চালের কিছু অংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়।

গম

বাংলাদেশের প্রধান সহায়ক খাদ্যশস্য। যদিও গমের ভূমিকা ধানের তুলনায় সীমিত, তবুও দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এটি অপরিহার্য। বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) ১৬টি উচ্চফলনশীল গমের জাত উদ্ভাবন করেছে এবং কৃষকরা এগুলো মাঠে চাষ করছেন। ১৯৯৭-৯৮ অর্থ বছরে ৮০.৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে প্রায় ১৮ লক্ষ মেট্রিক টন গম উৎপাদিত হয়েছে।

পাট

বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। বিশ্ববাজারে চাহিদার পরিবর্তনের কারণে পাটের মূল্য কমলেও পাট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ১৯৯২-৯৩ অর্থ বছরে পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি থেকে প্রায় ৭৮৮ কোটি টাকা এবং কাঁচা পাট রপ্তানি থেকে প্রায় ২২৪ কোটি টাকা আয় হয়। এই আয় বৈদেশিক মুদ্রার গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এছাড়াও পাট ব্যবহৃত হয় স্থানীয় শিল্প এবং পরিবেশ রক্ষা কাজে।

চা

চা বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান অর্থকরী ফসল। দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে বিস্তৃত চা বাগানগুলো দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। ১৯৯৭–৯৮ অর্থ বছরে চা বাগানের আওতায় জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪৮.৫ হাজার হেক্টর এবং উৎপাদন দাঁড়িয়েছিল ৫০.৫ হাজার মেট্রিক টনে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে প্রায় অর্ধেক চা বিদেশে রপ্তানি করা হয়। চা রপ্তানি থেকে বছরে প্রায় ১২০০–১৫০০ মিলিয়ন টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আসে, যা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চা শিল্পে কর্মসংস্থানও উল্লেখযোগ্য; হাজার হাজার মানুষ চা বাগানে এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে কাজ করছেন। চা উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে উন্নত জাতের চা উদ্ভাবন, আধুনিক চাষপ্রণালী এবং বাগান ব্যবস্থাপনার কারণে।

আখ

আখ বাংলাদেশের চিনি ও গুড় উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল। দেশের ১,৭৪,০০০ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয় এবং বার্ষিক উৎপাদন প্রায় ৭২–৭৬ লক্ষ টন। এর মধ্যে প্রায় ২৩ লক্ষ টন চিনি উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয় এবং ৩১ লক্ষ টন গুড় উৎপাদনের জন্য। বাকি আখ বীজ হিসেবে বা সরাসরি চিবিয়ে খাওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়। দেশে চিনি ও গুড়ের চাহিদা যথাযথভাবে পূরণের জন্য প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ১০ লক্ষ টন আখ উৎপাদন প্রয়োজন। আখের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট ২৩টি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। আখ উৎপাদন দেশের খাদ্য শিল্প ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

তামাক

তামাক বাংলাদেশের আরেকটি অর্থকরী ফসল এবং সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বর্তমানে ৮৯ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ৩৬ হাজার মেট্রিক টন তামাক উৎপাদিত হয়। তামাক চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাত বহু শ্রমিককে কর্মসংস্থান প্রদান করে এবং সরকারের রাজস্ব সংগ্রহে সহায়ক। তামাকের রপ্তানি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও অবদান রাখে।

ডাল জাতীয় শস্য

ডাল জাতীয় শস্য দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য, বিশেষ করে প্রোটিনের প্রধান উৎস হিসেবে। তবে, দেশে ডালের চাহিদার বেশির ভাগই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। বিগত কয়েক বছরে ডালের চাষের জমি হ্রাস পেয়েছে। সেচের আওতায় জমির উন্নয়নের কারণে কৃষকরা ধান বা অন্যান্য উচ্চমূল্য ফসলের দিকে ঝুঁকেছেন। তবে, ডালের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য সরকার এবং কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান—যেমন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি ইনস্টিটিউট—মসুর, ছোলা, মুগ ও মাষ কলাইয়ের উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে।

তৈলবীজ জাতীয় শস্য

বাংলাদেশে সরিষা প্রধান তৈলবীজ শস্য হিসেবে চাষ হয়। এছাড়াও, সয়াবীন চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, সয়াবীনের প্রক্রিয়াজাতকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে তেলের ঘাটতি পূরণে প্রতি বছর ৩–৬ হাজার মিলিয়ন টাকার সয়াবীন তেল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। দেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সরিষার ১০টি, চীনাবাদামের ৬টি, গর্জনতিলের ৩টি এবং তিষির ১টি উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করেছে। এই জাতগুলো চাষের আওতায় আনা গেলে দেশের তৈলবীজ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় সম্ভব হবে।

রাবার

বাংলাদেশে রাবারের চাষ বৃদ্ধি পাওয়ায় কাঁচা রাবার আমদানি ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে, যা বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৯৪–৯৫ অর্থ বছরে এ সাশ্রয়ের পরিমাণ প্রায় ২০ কোটি টাকা হিসেবে ধরা হয়। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন রাবার বাগান থেকে প্রায় ৩ হাজার টন কাঁচা রাবার উৎপাদন হচ্ছে। এটি দেশের ২৫০টি রাবারজাত দ্রব্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক চাহিদার প্রায় ৩০% মিটাতে সক্ষম। রাবার শিল্পে কর্মসংস্থানও উল্লেখযোগ্য; হাজার হাজার লোক সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এ খাতে যুক্ত।

ফুল

ফুলের বাণিজ্য বাংলাদেশে গত কয়েক বছর ধরে ক্রমবর্ধমান। ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় ৫ লক্ষ টাকা মূল্যের তাজা ফুল বিক্রি হচ্ছে। দেশে প্রায় ২ হাজার বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ হয় এবং প্রায় ১৫ হাজার লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ফুল ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। ১৯৯৩–৯৪ অর্থ বছরে বাংলাদেশ সৌদি আরবে ১২ লক্ষ টাকা মূল্যের তাজা ফুল রপ্তানি করে। ফুল শিল্প দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

ফল

বাংলাদেশে ফলের উৎপাদন দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। কাঁঠাল, আম, কলা, লিচু, কিউই এবং অন্যান্য ফলের চাষ দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে যথেষ্ট অবদান রাখছে। এছাড়াও কিছু ফল বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, কাঁঠাল, আম এবং কিছু অন্যান্য ফল ১৫টিরও অধিক দেশে রপ্তানি করা হয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়াতে সাহায্য করে।

সব্জি

সব্জি উৎপাদন বাংলাদেশের কৃষি ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় ৫ লক্ষ টাকার তাজা সব্জি বিক্রি হয়। ১৯৯২–৯৩ অর্থ বছরে বাংলাদেশ ৩১৩.৫ মিলিয়ন টাকার সব্জি বিদেশে রপ্তানি করেছে। ১৯৯৩–৯৪ অর্থ বছরে এই রপ্তানি বেড়ে ৩২৩.৫ মিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ও বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়াতে সব্জির উৎপাদন বৃদ্ধি অপরিহার্য। বিভিন্ন উচ্চ ফলনশীল জাতের উদ্ভাবনের ফলে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কৃষকরা অধিক লাভবান হচ্ছেন।

 

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফসলের অবদান

বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রা কৃষির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বাংলাদেশের প্রধান পেশা হলো কৃষি, বিশেষ করে ফসল উৎপাদন। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ৬৮.৫% মানুষ কৃষিকাজে নিয়োজিত এবং মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের প্রায় ৩৫% আসে কৃষি খাত থেকে। জাতীয় আয়ের প্রায় ৩৯.৩৭% যোগান দেয় এই খাত, যা দেশের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব প্রতিফলিত করে।

কৃষি উৎপাদন এবং ফসল চাষের ক্ষেত্রে দেশের প্রধান সমস্যা হলো জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সীমিত জমির পরিমাণ। ১৯৭০-এর দশকে মাথাপিছু কৃষিজমি প্রায় এক একর হলেও বর্তমানে তা ০.২৫ একরে নেমে এসেছে। তবুও বাংলাদেশের বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে ধান ও গমের ক্ষেত্রে। ১৯৫০-৫১ অর্থ বছরে খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৬২ লক্ষ টন, যা ১৯৬০-৬১ সালে ৯৭ লক্ষ টনে উন্নীত হয়। ১৯৮৯-৯০ অর্থ বছরে তা ১ কোটি ৬৪ লক্ষ টনে এবং ১৯৯২-৯৩ সালে ১ কোটি ৭২ লক্ষ টনে পৌঁছায়। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে জমির পরিমাণ হ্রাস সত্ত্বেও খাদ্যশস্য উৎপাদনের বৃদ্ধি বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এটি সম্ভব হয়েছে উন্নত প্রযুক্তি এবং উচ্চ ফলনশীল জাতের উদ্ভাবনের মাধ্যমে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফসলের অবদানকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বিভিন্ন ফসলের মধ্যে ধান দেশের প্রধান খাদ্যশস্য হিসেবে স্থান দখল করেছে। বর্তমানে ৩৯টি উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে, যার অধিকাংশই মাঠ পর্যায়ে চাষ করা হয়। প্রতিটি হেক্টর জমিতে ধানের উৎপাদন ২–৩ টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫–৬ টনে পৌঁছেছে। ১৯৭০ সালে চালের উৎপাদন প্রায় ১০ মিলিয়ন টন হলেও বর্তমানে তা প্রায় ১৯ মিলিয়ন টনে উন্নীত হয়েছে। তবুও ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী আমদানি প্রয়োজন হয়।

গম ধানের পরের প্রধান খাদ্যশস্য। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গমের ভূমিকা সীমিত হলেও এটি ধানের সহকারী খাদ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশে সেচের আওতায় জমি বাড়ার কারণে এবং ভাতভিক্ষণমূলক খাদ্যপ্রিয় বাঙালি জনগণের কারণে গমের চাষ স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট ১৬টি উচ্চ ফলনশীল গমের জাত উদ্ভাবন করেছে, যা কৃষকের মাঠে চাষ হচ্ছে। ১৯৯৭-৯৮ অর্থ বছরে ৮০.৪ লক্ষ হেক্টর জমিতে ১৮ লক্ষ মেট্রিক টন গম উৎপাদন হয়েছে।

পাট বাংলাদেশের প্রধান অর্থকরী ফসল। অতীতের তুলনায় বিশ্ববাজারে চাহিদা কমার কারণে পাটের দাম কমে গেছে এবং কৃষকদের উৎসাহও কমেছে। এর আগে বাংলাদেশ ৬৯টি দেশে পাট রপ্তানি করত। উৎপাদিত পাট ও পাটজাত দ্রব্যের ৭০% বিদেশে রপ্তানি করা হয়। ১৯৯২-৯৩ অর্থ বছরে ৭৮৮ কোটি ৯০ লক্ষ টাকা মূল্যের পাটজাত দ্রব্য এবং ২২৪ কোটি ৯০ লক্ষ টাকার কাঁচা পাট রপ্তানি হয়। পাট রপ্তানি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

চা বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রধান অর্থকরী ফসল। ১৯৯৭-৯৮ অর্থ বছরে চা বাগানের আওতায় ৪৮.৫ হাজার হেক্টর জমি এবং ৫০.৫ হাজার মেট্রিক টন উৎপাদন হয়। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে এর প্রায় অর্ধেক বিদেশে রপ্তানি করা হয়। ১৯৯০-এর দশকে চা রপ্তানি থেকে বছরে প্রায় ১২০০–১৫০০ মিলিয়ন টাকার আয় হয়। দেশের অর্থনীতিতে চা শিল্প গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে এবং কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি করে।

আখ বাংলাদেশের চিনি ও গুড় উৎপাদনকারী প্রধান অর্থকরী ফসল। বর্তমানে দেশে প্রায় ১,৭৪,০০০ হেক্টর জমিতে আখ উৎপন্ন হয়। বার্ষিক গড় উৎপাদন ৭২–৭৬ লক্ষ টন। আখের একটি অংশ চিনি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় এবং প্রায় ৩১ লক্ষ টন আখ গুড় উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়। দেশের চিনি ও গুড়ের চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে চিনির আমদানি প্রয়োজন হয়। ইক্ষু গবেষণা ইনস্টিটিউট উচ্চ ফলনশীল আখের ২৩টি জাত উদ্ভাবন করেছে, যা উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক।

তামাক দেশের আরেকটি অর্থকরী ফসল এবং সরকারের রাজস্ব আহরণের একটি উৎস। প্রায় ৮৯ হাজার হেক্টর জমিতে ৩৬ হাজার মেট্রিক টন তামাক উৎপন্ন হয়। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে সক্ষম।

ডাল জাতীয় শস্যের চাষ দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও, চাহিদার বেশিরভাগই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। সেচের আওতায় জমি বাড়ার কারণে কৃষকরা ধানের চাষে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। তবে উন্নত জাতের মসুর, ছোলা, মুগ ও মাষ কলাই উদ্ভাবনের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে।

তৈলবীজ জাতীয় শস্যের মধ্যে সরিষা প্রধান। এছাড়াও সয়াবিন চাষের সম্ভাবনা রয়েছে, তবে প্রক্রিয়াজাতকরণের সীমাবদ্ধতার কারণে তেলের ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে সয়াবিন তেল আমদানি করতে হয়। উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে তৈলবীজের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।

রাবার, ফুল, ফল ও সব্জির উৎপাদন দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও আয় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে ৩ হাজার টন রাবার উৎপাদন দেশের রাবার শিল্পের চাহিদার প্রায় ৩০% মিটাচ্ছে। প্রতিদিন ঢাকায় ৫ লক্ষ টাকার তাজা ফুল বিক্রি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন রপ্তানির জন্য কাঁচা ফল ও সব্জি উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং ১৯৯২–৯৩ অর্থ বছরে সব্জি রপ্তানি ৩১৩.৫ মিলিয়ন টকে পৌঁছেছে।

উপসংহারে বলা যায়, বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন কারণে ফসলসমূহের অর্থনৈতিক অবদান প্রত্যাশার তুলনায় কম। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অপ্রতুল পরিকল্পনা, কৃষি নীতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা, কৃষকদের অজ্ঞতা ও দারিদ্র্য এবং গবেষণা ও সম্প্রসারণ কার্যক্রমের মধ্যস্থ যোগাযোগের অভাব এ সমস্যার মূল কারণ। তবে, যদি এসব সীমাবদ্ধতা দূর করা যায়, ফসলের উৎপাদন ও অর্থনৈতিক অবদান আরও বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রার আয় আরও শক্তিশালী হবে।

সূত্র: “কৃষি পরিচিতি ও পরিবেশ” বিষয়ের “পরিবেশের উপাদান” বিষয়ের ইউনিট ১ এর ১.৬ নং পাঠ।

Leave a Comment