প্রতিকূল বা বিরূপ আবহাওয়ায় ফসল ও পশুপাখি রক্ষার কৌশল

আজকের আলোচনার বিষয় প্রতিকূল বা বিরূপ আবহাওয়ায় ফসল ও পশুপাখি রক্ষার কৌশল। এই পাঠটি ষষ্ঠ ইউনিটের “কৃষি জলবায়ু” অধ্যায়ের ৬.৫ নং পাঠ

প্রতিকূল আবহাওয়া বলতে এমন সব অস্বাভাবিক জলবায়ুগত অবস্থাকে বোঝায় যা ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও উৎপাদনে বাধা সৃষ্টি করে বা ক্ষতি করে। ফসল উৎপাদনের সময় যদি তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাত, বাতাস বা অন্যান্য আবহাওয়ার উপাদান স্বাভাবিক মাত্রা থেকে বিচ্যুত হয় এবং ফসলের ক্ষতি করে, তখন সেটিকে বলা হয় প্রতিকূল বা বিরূপ আবহাওয়া

এমন পরিস্থিতিতে উদ্ভিদ টিকে থাকার জন্য বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় ও জৈবরাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিতে চেষ্টা করে। কৃষকদের জন্য তাই প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে আবহাওয়ার পরিবর্তন অনুযায়ী ফসল ও পশুপাখি রক্ষার উপযুক্ত কৌশল ও ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা।

প্রতিকূল বা বিরূপ আবহাওয়ায় ফসল ও পশুপাখি রক্ষার কৌশল

প্রতিকূল বা বিরূপ আবহাওয়ায় ফসল ও পশুপাখি রক্ষার কৌশল

বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ। কৃষি উৎপাদন সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে জলবায়ুর ওপর। তাই আবহাওয়ার প্রতিকূলতা দেখা দিলে ফসল উৎপাদনে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। যদিও এই বিরূপ আবহাওয়া সাধারণত স্বল্পকালীন হয়, তবুও এ সময়ের প্রভাব হতে পারে দীর্ঘমেয়াদী—ফসল নষ্ট হওয়া, পশুপাখির মৃত্যু, খাদ্য ঘাটতি এবং কৃষকের আর্থিক ক্ষতি ইত্যাদি।

প্রতিকূল বা বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যে প্রধান উদাহরণ হলো— অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, শিলাবৃষ্টি, খরা, অতিরিক্ত গরম, প্রচণ্ড ঠান্ডা, ঝড়-তুফান ও ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি। এসব পরিস্থিতিতে কৃষককে সচেতনভাবে কিছু প্রতিরোধমূলক ও পুনরুদ্ধারমূলক ব্যবস্থা নিতে হয়। নিচে বাংলাদেশে প্রচলিত কিছু কার্যকর কৌশল উপস্থাপন করা হলো—

বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় ফসল রক্ষার কৌশল :

১. অতিবৃষ্টি :

বাংলাদেশে জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত বর্ষাকাল থাকে। এই সময়ে কখনও কখনও একটানা কয়েকদিন ভারি বৃষ্টিপাত হলে তাকে বলা হয় অতিবৃষ্টি। এতে ফসলের গোড়া নরম হয়ে গাছ হেলে পড়ে বা পচে যেতে পারে।
👉 করণীয়:

  • ফসলের গাছ সোজা করে গোড়ায় মাটি চেপে বাঁশের খুঁটির সাথে বেঁধে দেওয়া
  • পানি নিষ্কাশনের জন্য নালা তৈরি করা
  • বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জমিতে জৈব সার প্রয়োগ ও শুকনো অবস্থায় পুনরায় চাষাবাদ করা।
  • শাকসবজির ক্ষেত্রে মাঠে উঁচু বেড তৈরি করে চাষ করলে ক্ষতি কমানো যায়।
২. অনাবৃষ্টি :

যদি শুষ্ক মৌসুমে টানা ১৫ দিন বা তারও বেশি সময় বৃষ্টি না হয়, তাকে বলা হয় অনাবৃষ্টি। এতে মাটির আর্দ্রতা কমে গিয়ে ফসল শুকিয়ে যেতে পারে।
👉 করণীয়:

  • ফসলের জন্য সেচের ব্যবস্থা করা (বিশেষত আমন ধান চাষে)।
  • জমিতে নিড়ানি দিয়ে মাটির ফাঁক বন্ধ করে আর্দ্রতা ধরে রাখা
  • সবজি ক্ষেতে জাবড়া বা মালচিং প্রয়োগ করে পানি সংরক্ষণ করা।
  • প্রয়োজনে ড্রিপ সেচ ব্যবস্থা বা স্প্রিঙ্কলার সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।
৩. শিলাবৃষ্টি :

বাংলাদেশে সাধারণত মার্চ ও এপ্রিল মাসে শিলাবৃষ্টি হয়ে থাকে। এর ফলে বিশেষ করে রবি ফসল যেমন—পেঁয়াজ, রসুন, গম, আলু, মসুর, সরিষা ইত্যাদি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
👉 করণীয়:

  • ক্ষতির পর দ্রুত ক্ষেতে ভাঙা ডালপালা ছেঁটে সার ও সেচ দিয়ে পুনরুদ্ধার করা
  • ছোট ফসল যেমন শাকসবজি বা টমেটো ক্ষেতে নেট বা পলিথিন শেড ব্যবহার করে সুরক্ষা দেওয়া।
  • শিলাবৃষ্টির পূর্বাভাস পেলে ফসল আগেই সংগ্রহ করে ফেলা
৪. জলাবদ্ধতা :

অতিবৃষ্টি বা বন্যার কারণে কোনো এলাকায় পানি জমে স্থায়ীভাবে থেকে গেলে তাকে জলাবদ্ধতা বলে। এর ফলে ফসলের শিকড় অক্সিজেনের অভাবে পচে যায়।
👉 করণীয়:

  • জমিতে নিষ্কাশন নালা তৈরি করে পানি বের করে দেওয়া
  • হাওর বা বন্যাপ্রবণ এলাকায় ভাসমান কৃষি বা উঁচু মাচায় সবজি চাষ করা।
  • ফসলের ক্ষতি বেশি হলে ধানের শীষ কেটে দ্রুত ফসল সংগ্রহ করা।
  • পুনরায় চাষের আগে মাটি শুকিয়ে জৈব সার মিশিয়ে মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে আনা

 

খরা অবস্থায় ফসল রক্ষার কৌশল:

খরা বাংলাদেশের একটি অতি পরিচিত ও পুনরাবৃত্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষত রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও কুষ্টিয়া অঞ্চলে প্রায় প্রতি বছরই শুকনো মৌসুমে খরার প্রভাব দেখা যায়। বৃষ্টির অভাবে নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর ও জলাশয় শুকিয়ে যায়, মাটির আর্দ্রতা নষ্ট হয়, ফলে ফসল ও পশুপাখির জীবন কঠিন হয়ে পড়ে। মাঠ ফেটে যায়, ঘাস ও খাদ্যশস্য শুকিয়ে যায়, এবং কৃষকের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।

তবে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা ও বৈজ্ঞানিক কৃষি কৌশল গ্রহণ করলে খরার মধ্যেও লাভজনকভাবে ফসল উৎপাদন ও পশুপালন করা সম্ভব। নিচে খরা মোকাবিলায় কিছু কার্যকর উপায় তুলে ধরা হলো—

১. উপযুক্ত ফসল ও জাত নির্বাচন

খরা শুরু হওয়ার আগেই ফসল তোলা যায় এমন স্বল্পমেয়াদি বা খরা সহনশীল জাতের চাষ করা উচিত। এসব জাত স্বল্প পানিতেও ভালো ফলন দেয়।
🔹 উদাহরণ:

  • ধান: বিনা ধান-৭, ব্রি ধান-৩৩ — আগেভাগে পাকে এবং খরা থেকে ফসল রক্ষা করে।
  • গম: বিজয়, প্রদীপ — খরা সহনশীল জাত, কম পানিতে ভালো ফলন দেয়।
  • ভুট্টা, বাজরা, সরিষা ও মুগডাল— এ জাতীয় ফসল খরায় তুলনামূলকভাবে সহনশীল।
২. মাটির ছিদ্র নষ্টকরণ ও আর্দ্রতা সংরক্ষণ

বৃষ্টির মৌসুম শেষে খরা কবলিত এলাকায় অগভীর চাষ দিয়ে মাটির সূক্ষ্ম ছিদ্রগুলো বন্ধ করে রাখতে হয়, যাতে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে পানি হারিয়ে না যায়।
👉 এতে মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকে এবং ফসলের শিকড়ে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত হয়।

৩. অগভীর চাষ ও মই ব্যবহার

অগভীর চাষ মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
প্রতি চাষের পর মই দিয়ে মাটিকে আঁটসাঁট করে দিলে মাটির ভেতরে থাকা আর্দ্রতা আটকে থাকে, ফলে শুষ্ক অবস্থাতেও ফসল টিকে থাকতে পারে।
👉 এটি খরাপ্রবণ এলাকায় একটি অতি সহজ ও সাশ্রয়ী কৃষি কৌশল

৪. জাবড়া (Mulching) প্রয়োগ

খরা পরিস্থিতিতে মালচিং বা জাবড়া প্রয়োগ একটি অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি।
এতে ফসলের চারপাশে শুকনো খড়, লতাপাতা, কচুরিপানা ইত্যাদি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়।
👉 এর ফলে—

  • মাটির আর্দ্রতা দীর্ঘস্থায়ী হয়,
  • সূর্যের তাপে পানি দ্রুত বাষ্পীভূত হয় না,
  • আগাছা জন্মানো কমে যায়,
  • মাটির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকে।
    অনেক দেশে কালো পলিথিন শিট (Black Plastic Mulch) ব্যবহার করা হয়, যা পানির ক্ষয় রোধের পাশাপাশি আগাছা দমনেও সাহায্য করে।

 

৫. পানি সংরক্ষণ বা “Water Harvesting”

খরাপ্রবণ অঞ্চলে বৃষ্টির সময় ছোট নালা, খাত বা গর্ত তৈরি করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা হয়।
👉 এতে—

  • মাটিতে পানি শোষিত হয়,
  • ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বৃদ্ধি পায়,
  • পরবর্তীকালে সেচের কাজে এই পানি ব্যবহার করা যায়।
    গ্রামাঞ্চলে ছোট পুকুর বা জলাধার তৈরি করে বর্ষার পানি সংরক্ষণ করলে তা শুষ্ক মৌসুমে অমূল্য সম্পদ হয়ে ওঠে।

 

 

প্রতিকূল বা বিরূপ আবহাওয়ায় পশুপাখি রক্ষার কৌশল

বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই বন্যা, খরা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও শিলাবৃষ্টি প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। এসব দুর্যোগে শুধুমাত্র ফসলই নয়, গবাদিপশু ও পাখির জীবনও বিপন্ন হয়। খাদ্যাভাব, অপুষ্টি, রোগবালাই ও আশ্রয়ের অভাবে পশুপালন খাতও ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।

নিচে কিছু কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা তুলে ধরা হলো—

১. খাদ্য ও পানি সংরক্ষণ

খরা বা বন্যার আগেই পশুর জন্য খাদ্য ও ঘাস সংরক্ষণ করতে হবে।

  • শুকনো খড়, ভুসি, কলাপাতা ইত্যাদি শুকিয়ে মজুত রাখা।
  • পর্যাপ্ত পরিষ্কার পানির উৎস নিশ্চিত করা।
২. নিরাপদ আশ্রয়

প্রতিকূল আবহাওয়ায় গবাদিপশুদের উঁচু ও নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর করা উচিত।

  • ঘর যেন বাতাস চলাচলের উপযুক্ত হয়।
  • গরমে ছায়া ও শীতে তাপ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা।
৩. স্বাস্থ্যসেবা ও টিকাদান

খরা বা দুর্যোগের পর পশুর রোগবালাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
তাই—

  • নিয়মিত টিকা প্রদান ও পশুচিকিৎসা পরামর্শ নিতে হবে।
  • অসুস্থ পশু আলাদা করে রাখতে হবে।

খরা বাংলাদেশের কৃষি ও পশুপালনের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সচেতন কৃষি ব্যবস্থাপনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং কৃষকের প্রশিক্ষণ এর মাধ্যমে এ দুর্যোগের ক্ষতি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।

যথাযথ পরিকল্পনা ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপই পারে বাংলাদেশের কৃষিকে টেকসই ও খরা-সহনশীল করে তুলতে।

 

 

খরা মৌসুমে পশুপাখির বিকল্প খাদ্য :

খরা মৌসুমে সবুজ ঘাসের অভাব দেখা দেওয়া বাংলাদেশের কৃষক সমাজের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ সময়ে গবাদি পশুর খাদ্যসংকট মেটাতে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। খরা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই ঘাস কেটে হে (Hay) বা সাইলেজ (Silage) তৈরি করে সংরক্ষণ করা উচিত। এতে খরা চলাকালেও গবাদি পশুর জন্য পুষ্টিকর খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করা যায়।

শুধু শুকনো খড় খাওয়ালে গবাদি পশুর পুষ্টিহানি ঘটে। তাই খড়কে ইউরিয়া-মোলাসেস প্রক্রিয়াজাত (Urea-Molasses Treatment) করে খাওয়ানো অনেক বেশি উপকারী। এতে খড়ের পুষ্টিমান বৃদ্ধি পায় এবং পশু বেশি খাদ্য উপাদান পায়।

সবুজ ঘাসের বিকল্প হিসেবে বিভিন্ন ফডার ট্রি (Fodder Tree) বা খাদ্যোপযোগী বৃক্ষের পাতা ব্যবহার করা যায়। যেমন— ইপিল ইপিল, নীল, শণপাট, জিগা, কাঁঠাল, বাবলা, ডেউয়া, ডুমুর, মান্দার, কৃষ্ণচূড়া ও আমের পাতা

এই গাছগুলো বসতবাড়ির আশেপাশে, সড়কের পাশে, পতিত জমিতে, বাঁধের ধারে ও পুকুরের পাড়ে লাগানো যেতে পারে। ফলে একদিকে পরিবেশ রক্ষা হবে, অন্যদিকে খরা মৌসুমে গবাদি পশুর জন্য বিকল্প খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত হবে।

তাছাড়া, মানুষের খাদ্যের উপজাত দ্রব্য যেমন— গমের ভূষি, চালের কুঁড়া, ডালের ভূষি, সরিষা বা তিলের খৈল ইত্যাদিও পশু-পাখির খাদ্য হিসেবে অত্যন্ত কার্যকর। এগুলো খরা মৌসুমে শুকনো খড়ের সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে।

ঝোলাগুড় ফেলে না দিয়ে বা নষ্ট না করে সংরক্ষণ করা দরকার। খড় কুচি কুচি করে কেটে ভাতের ফ্যানে ভিজিয়ে নিয়ে, তাতে পরিমাণমতো মানুষের খাদ্যের উপজাত মিশিয়ে দিতে হবে। এরপর ঐ মিশ্রণের সঙ্গে ৫০ গ্রাম লবণ৩০০ গ্রাম ঝোলাগুড় যোগ করলে তৈরি হবে উৎকৃষ্ট মানের পশুখাদ্য মিশ্রণ

এই মিশ্রিত খাদ্য গবাদি পশুকে খাওয়ালে তারা প্রয়োজনীয় প্রোটিন, খনিজ ও শক্তি পায়, যা তাদের উৎপাদনক্ষমতা ও কর্মক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখতে সাহায্য করে।

খরা মৌসুমে ইউরিয়া-মোলাসেস ব্লক (Urea Molasses Block) তৈরি করে খাওয়ানোও খুবই কার্যকর একটি পদ্ধতি। এটি পশুর পুষ্টি ঘাটতি পূরণে সহায়তা করে। তবে মনে রাখতে হবে, এ সময় গবাদি পশুকে পর্যাপ্ত পরিমাণে পরিষ্কার পানি খাওয়ানো অত্যন্ত জরুরি।

পরিকল্পিতভাবে এসব খাদ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা করলে খরা মৌসুমেও গবাদি পশু সুস্থ, পুষ্ট ও উৎপাদনক্ষম থাকবে — যা কৃষকের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

খরা মৌসুমে পশুপাখির রোগ ব্যাধি :

খরা মৌসুমে গবাদি পশু ও পাখি নানা ধরনের রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পানির স্বল্পতা, তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, অপর্যাপ্ত খাদ্য এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ—সব মিলিয়ে এই সময়ে পশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।

🐄 খরা মৌসুমে সাধারণ রোগব্যাধি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা

খরা মৌসুমে পশুর মধ্যে বিভিন্ন সংক্রামক ও ত্বকের রোগ দেখা দিতে পারে। এজন্য—

  • গবাদি পশুকে নিয়মিতভাবে প্রতিষেধক টিকা (Vaccination) দিতে হবে।
  • বহিঃদেহের পরজীবী যেমন— আটালি, উকুন, মাছি, মশা ইত্যাদির উপদ্রব বেড়ে যায়। তাই নিয়মিত পশুর শরীর পরিষ্কার করে ধোয়া ও ঘষে মুছে রাখা অত্যন্ত জরুরি।
  • পরজীবী নাশক ওষুধ প্রয়োগে পশু চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
  • অতিরিক্ত গরমে পশু ও পাখিকে নিয়মিত গোসল করানো ও ছায়াযুক্ত স্থানে রাখা উচিত।
  • পশুর মধ্যে যদি কোনো অস্বাভাবিক আচরণ, জ্বর, ক্ষুধামান্দ্য, বা চর্মরোগের লক্ষণ দেখা যায়, তবে অবিলম্বে পশু চিকিৎসকের সাহায্য নিতে হবে

এই মৌসুমে গবাদি পশুর পানির চাহিদা বেশি থাকে। তাই প্রতিদিন পরিষ্কার ও পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পানি স্বল্পতা থাকলে পশুর হজমক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং তাপজনিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে।

 

বন্যায় পশু পাখির খাদ্য :

চারদিক যখন জলমগ্ন থাকে তখন পশু পাখির খাদ্য সংকট চরমে ওঠে। পশুর জন্য ঘাস পাওয়া যায় না। লতাপাতা বা কচুরিপানা বেশি পরিমাণে খেলে রোগাক্রান্ত হওয়ার ভয় থাকে। জলমগ্ন এলাকার পঁচা পানি খেয়েও পশুর রোগ হতে পারে। ঘাসের অভাবের কারণে পশু পাখির জন্য এসময়ে বিকল্প খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। খড়, চাউলের কুঁড়া, গমের ভূষি, খৈল প্রভৃতি পশু পাখির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যায়। উঁচু স্থানে মাচা তৈরি করে তার ওপরে যত্ন সহকারে রাখলে খড় পঁচার ভয় থাকেনা।

তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন খড় পানিতে না ভেজে। খড় ছাড়াও অন্যান্য দানাদার খাদ্য এমনভাবে সযত্নে সংরক্ষণ করতে হবে যেন তা বৃষ্টির পানিতে না ভেজে। বৃষ্টির পানিতে ভিজলে ঐসব খাদ্য সঁ্যাতসেঁ্যতে হয়ে যেতে পারে। আর এ ধরনের ভেজা সঁ্যাতসঁ্যাতে খাদ্য খাওয়ালে পশু পাখির দেহে বিষক্রিয়া দেখা দিতে পারে। বন্যার সময় প্রচুর পরিমাণে কচুরিপানা, কলমিশাক, লতা—গুল্মাদি জন্মে। সবুজ ঘাসের অভাবে এসব কলমি শাক, কচিুরপানা বা লতাগুল্ম পশুকে খাওয়ানো যায়। কলাগাছের বাকলও গবাদি পশুকে খাওয়ানো যায়।

তবে এসব খাদ্য খেয়ে অনেক সময় পশু পাখি উদরাময় সহ অন্যান্য পেটের পীড়ায় ভোগে। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সাথে সাথে মাঠে প্রচুর ঘাস গজিয়ে ওঠে। এসব ঘাস পশুকে খাওয়ানো অনুচিত। তবে দুই এক পশলা বৃষ্টি হলে বা মাঠ শুকানোর পর এসব ঘাস পশুকে খাওয়ানো যায়।

তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিলে পশুকে কাঁঠাল পাতা, কলাপাতা, বাঁশপাতা, হিজলপাতা, বাবলা পাতা খাওয়ানো যায়। কচুরিপানা বা এসব ঘাস শুকিয়ে খাওয়ালে রোগব্যাধির আশংকা কম থাকে। এসব খাদ্য অল্প অল্প করে শুকালে দানাদার খাদ্যের সাথে মিশিয়ে খাওয়ানো যায়। এসব খাদ্য একসাথে বেশি খাওয়ানো যাবেনা। কারণ তাতে পশুর উদরাময় দেখা দিতে পারে। এমনকি পশুর শরীরে বিষক্রিয়াও দেখা দিতে পারে। সম্ভব হলে পশুকে ইউরিয়া মোলাসেস ব্লক খাওয়ানো যেতে পারে।

ডোবা—নালা বা আবদ্ধ জলাশয়ের দূষিত পানি পশু পাখি কোনভাবে খাওয়ানো যাবেনা। তবে পশুকে অবশ্যই প্রচুর পরিমাণে পরিষ্কার নিরাপদ পানি খাওয়াতে হবে। বন্যায় পশু পাখির রোগ বন্যার সময় এবং বন্যা পরবতীর্কালে পশু পাখি বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারে। যেমন—তড়কা, গলাফুলা, ক্ষুরারোগ, বাদলা, ডায়রিয়া, গাভীর বাঁটে ঘা প্রভৃতি। পশুপাখিকে অবশ্যই সংক্রামক রোগের টিকা দিতে হবে।

সম্ভব হলে বর্ষা মৌসুমে আগেই পশু পাখি সংক্রামক রোগের টিকা দেওয়া উচিত। বন্যার আগে টিকা দেয়া না থাকলে জরুরী ভিত্তিতে পশু সম্পদ বিভাগের কমীর্দের সাথে যোগাযোগ করে পশু পাখিকে টিকা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সুস্থ অবস্থাতেই পশুকে টিকা দেয়া বাঞ্ছনীয়। কারণ সাধারণত রোগক্রান্ত পশু পাখিকে বাঁচানো যায় না। কোনভাবে বেঁচে গেলেও এসব পশু তার উৎপাদন ক্ষমতা ও কর্মক্ষমতা হারিয়ে অকেজো হয়ে যায়। আক্রান্ত পশুর চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত জরুরী ভিত্তিতে পশু চিকিৎসাকের পরামর্শমত ব্যবস্থা নিতে হবে।

 

জলোচ্ছাসে পশু পাখি রক্ষার কৌশল :

বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই সামুদ্রিক ঝড় এবং জলোচ্ছ্বাস হয়। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সমুদ্রোপকূল এলাকায় এর তীব্রতা অধিক। প্রায় প্রতিবছরই উপকূলের প্রায় ২.৮৫ মিলিয়ন হেক্টর এলাকা ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সমুদ্রে যখন নিম্নচাপ সৃষ্টি হয় তখন তা সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের আকারে স্থলভাগের দিকে ধেয়ে আসে। এর ফলে সমুদ্রের লোনা পানি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি উঁচু হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই স্থলভাগে ঢুকে পড়ে। তখন তাকে জলোচ্ছ্বাস বলা হয়।

জলোচ্ছ্বাসের ফলে মানুষের প্রাণহানি ঘটে, বসতবাড়ি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, ফসল বিনষ্ট হয়, পশু পাখি ও হাঁস—মুরগির ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। অনেক পশু পাখি মারা যায়। কিছু কিছু পশু মারাত্মকভাবে আহত হয়। আবার জলোচ্ছ্বাসের পরপরই নানা ধরনের রোগও দেখা দেয়। জলোচ্ছ্বাসের পরবতীর্তে পশু খাদ্যেরও সংকট দেখা দেয় এবং অপরিচ্ছন্ন পানি খেয়েও অনেক পশু রোগাক্রান্ত হয়।

জলোচ্ছ্বাসের কবল থেকে পশুসম্পদকে রক্ষার জন্য জরুরী প্রয়োজন হল এদের জন্য যথাযথ আশ্রয়স্থল, খাদ্য পানীয়ের ব্যবস্থা এবং এদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা করা। জলোচ্ছ্বাসের সংকেত পাওয়া গেলেই পশু পাখিকে আশ্রয়স্থানে নিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। সেখানে পশুপাখির জন্য উপযুক্ত খাদ্যেরও ব্যবস্থা করতে হয়। কাঁচা ঘাসের বদলে এসময়ে গবাদি পশু শুকনো খড় ও পাখিকে দানাদার খাদ্য; যেমন— চাউলের কঁুড়া, গমের ভূষি, খৈল প্রভৃতি খাওয়াতে হয়। পশুকে হে বা সাইলেজ খাওয়াতে পারলেও ভালো হয়।

জলোচ্ছ্বাস বা ঘূর্ণিঝড়ের ফলে মানুষও যেমন মারা যায়, তেমনি নানা ধরনের প্রাণী ও পাখিও মারা যায়। প্রতিকূল অবস্থায় মৃত মানুষ, পশু, পাখির সৎকার করা অনেক সময় সম্ভব হয়না। মৃত প্রাণী নদী— নালা, খাল— বিল ও মাঠে— ঘাটে পড়ে থাকে। ফলে মৃত প্রাণী থেকে দুর্গন্ধ বের হয় এবং চারপাশের পরিবেশ দূষিত হয় এবং ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে।

জলোচ্ছ্বাসের পর গবাদিপশু নানা ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়। যেমন— তড়কা, গলাফুলা, ক্ষুরারোগ, বাছুরের বাদলা রোগ, গাভীর বাঁটে ঘা, ছাগল— ভেড়ার গুটি ও সর্দি— কাশি প্রভৃতি। তদুপরি দূষিত পানি খেয়েও পশু পাখি উদরাময়সহ নানা ধরনের পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়। ঝড়— জলোচ্ছ্বাসে আহত পশু পাখির দেহে ক্ষত সৃষ্টি হয়। ক্ষতস্থানে রোগজীবাণুর সংক্রামণ ঘটে এবং অনেক রোগের আক্রমণ ঘটে।

অসুস্থ এবং আহত সকল পশুর চিকিৎসা এসময়ে খুবই প্রয়োজন। অন্যথায় রোগ মহামারী আকারে বিস্তার লাভ করতে পারে। দুযোর্গপূর্ণ এলাকায় এ সময়ে সরকারী বেসরকারী উদ্যোগে ত্রাণ তৎপরতার পাশাপাশি পশু চিকিৎসার জন্য টিমও গঠন করা হয়। পশুর মালিকদের অবশ্যই এসব পশু— চিকিৎসক টিমের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে পশুর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

দুর্যোগের আগেই পশু পাখিকে সংক্রামক রোগের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পশুর দেহের ক্ষতের সুচিকিৎসা করতে হবে এবং ক্ষতস্থানে যাতে মাছি না বসে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কষ্ট করে হলেও পশুকে পরিষ্কার পানি খাওয়াতে হবে। পশু যেন কোন অবস্থাতেই পঁচা বা দূষিত পানি না খেতে পারে সেদিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে। এভাবেই জলোচ্ছ্বাস পরবতীর্ পশু পাখি সংরক্ষণ করা সম্ভব।

Leave a Comment