আজকের আলোচনার বিষয় হলো ভূমিক্ষয়ের কারণ ও রোধের কার্যকরী উপায়সমূহ, যা কৃষি প্রযুক্তি ও ফসল উৎপাদনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ভূমিক্ষয় হলো মৃত্তিকার ক্ষয় বা অপসারণের প্রক্রিয়া, যা সরাসরি ফসলের উৎপাদন ও জমির উর্বরতাকে প্রভাবিত করে। এটি বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে ঘটে, যেমন বৃষ্টিপাতের তীব্রতা, জমির ঢাল, মাটির প্রকার, শস্যের ধরন, চাষ পদ্ধতি, পশুচারণ ও অন্যান্য মানব কার্যক্রম।
ভূমিক্ষয় রোধ করা না গেলে কৃষি জমির উর্বরতা হ্রাস পায় এবং দেশের কৃষি উৎপাদনও প্রভাবিত হয়। সুতরাং, ভূমিক্ষয়ের কারণ সনাক্ত করা এবং কার্যকরী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা কৃষক ও পরিবেশ সংরক্ষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পাঠে আমরা ভূমিক্ষয়ের প্রধান কারণগুলো বিশ্লেষণ করব এবং সেই সঙ্গে কার্যকরী উপায়সমূহ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
Table of Contents
ভূমিক্ষয়ের কারণ ও রোধের কার্যকরী উপায়সমূহ

ভূমিক্ষয় বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণে ঘটে। প্রধান কারণগুলো হলো:
১. বৃষ্টিপাত
ভূমিক্ষয়ের প্রধান কারণ হলো বৃষ্টিপাত। বৃষ্টির তীব্রতা, পরিমাণ ও সময়কাল সরাসরি মাটির ক্ষয়ের মাত্রাকে প্রভাবিত করে। বড় ফোঁটার বৃষ্টি মাটিকে শক্তভাবে আঘাত করলে কণাগুলো পানির সঙ্গে স্থানান্তরিত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে ভারী বৃষ্টিপাত হলে মৃত্তিকার শোষণ ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং অতিরিক্ত পানি মাটির কণার সঙ্গে মিশে নিচের দিকে প্রবাহিত হয়। প্রবাহমান পানির গতি যত বেশি হবে, মাটির ক্ষয়ও তত বেশি হবে।
২. ভূমির ঢাল
ভূমির ঢালও মাটির ক্ষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। ঢালু জমিতে পানি দ্রুত বয়ে যায় এবং এটি মাটির ক্ষয় বৃদ্ধি করে। ঢাল যত বেশি এবং ঢালের দৈর্ঘ্য দীর্ঘ হবে, ততই ভূমিক্ষয়ের সম্ভাবনা বাড়ে।
৩. মাটির প্রকৃতি
মাটির বুনট, কণার আকার এবং জৈব পদার্থের পরিমাণ ভূমিক্ষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হাল্কা, দানাদার ও জৈব পদার্থসমৃদ্ধ মাটি সহজেই পানি শোষণ করতে পারে, ফলে ক্ষয় কম হয়। অন্যদিকে ভারি এঁটেলজাতীয় মাটির রন্ধ্রতা কম হওয়ায় পানি শোষণ ক্ষমতা কম থাকে এবং অল্প বৃষ্টিতেও ক্ষয় বেশি ঘটে।
৪. শস্যের প্রকার
ফসলের ধরনও ভূমিক্ষয়কে প্রভাবিত করে। পাতাযুক্ত ফসল যেমন চীনাবাদাম, খেসারি, বরবটি ও সয়াবিন মাটিকে ঢেকে রাখে, ফলে ক্ষয় কম হয়। অন্যদিকে ইক্ষু, ভূট্টা, তুলা প্রভৃতি কম পাতাযুক্ত ফসলের ক্ষেত্রে ভূমিক্ষয় বেশি ঘটে।
৫. জমির চাষ পদ্ধতি
জমির প্রকৃতি বুঝে না চাষ করলে উপরিস্তরের উর্বর মাটি সহজে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। বিশেষ করে পাহাড়ি বা অসমতল জমিতে ঢালের বরাবর চাষ করলে মাটির ক্ষয় বেশি হয়।
৬. অত্যাধিক পশুচারণ
অত্যাধিক বা অনিয়মিত পশুচারণেও ভূমিক্ষয় বৃদ্ধি পায়। পশুর পায়ের চাপ মাটির উপরের স্তরকে আলগা করে এবং মাটির ক্ষয় বাড়ায়।
৭. মানব কার্যাবলি
মানুষ ভূমিক্ষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অপরিকল্পিতভাবে বন উজাড়, গাছপালা কাটাছেঁড়া বা জমি উন্মুক্ত করা মাটিকে সহজেই ক্ষয়ের প্রতি প্রবণ করে।

ভূমিক্ষয় রোধের কার্যকরী উপায়সমূহ:
আধুনিক কৃষিকাজে মৃত্তিকার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভূমিক্ষয় রোধ। প্রকৃতি এবং মানুষের কার্যাবলীর কারণে ভূমিক্ষয় রোধ না করা হলে দেশের কৃষি সম্পদ বড় হুমকির সম্মুখীন হতে পারে। এজন্য কৃষক এবং সরকারী পর্যায়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। ভূমি সংরক্ষণের কয়েকটি কার্যকরী উপায় নিচে আলোচনা করা হলো:
১. পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ
বৃষ্টির পানির বেগ কমালে ভূমি সংরক্ষণ সহজ হয়। এর জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা যায়—
জমিতে প্রয়োজনীয় স্থানে আড়াআড়িভাবে ছোট আইল বা বাঁধ তৈরি করা।
অসমতল জমি সমতল করা বা মাটি কেটে চাষ করা।
জমির ছোট নালাগুলো ভরাট করা।
বড় নালায় আগাছা জমা করে শেষ প্রান্তে খুঁটি পুঁতে তারের জাল আটকে দেওয়া।
নদীর উজানে আড়াআড়ি বাঁধ তৈরি করে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা।
২. পানি নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা
কৃষি জমিতে পানি দ্রুত বেরিয়ে না গেলে জমে থাকা পানি একত্রিত হয়ে মাঠের উপর চাপ সৃষ্টি করে। ফলে পানির গতিবেগ বেড়ে ভূমিক্ষয় বৃদ্ধি পায়। এই সমস্যার সমাধানে মাটির নিচে টাইল নালা তৈরি করা যেতে পারে, যা পানি ধীরগতিতে সরাতে সাহায্য করে।
৩. পর্যাপ্ত জৈব সার প্রয়োগ
মাটিতে পর্যাপ্ত জৈব সার প্রয়োগ করলে—
মাটির পানি শোষণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
পানি সহজে মাটির ছিদ্রপথে প্রবেশ করতে পারে।
হিউমাসের আঠালো বৈশিষ্ট্যের কারণে মাটির কণা একে অপরের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে বন্ধন স্থাপন করে।
ফলে মাটি সহজেই বায়ু বা পানির কারণে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় না।
৪. বনভূমি সৃষ্টি
যে সব অঞ্চলে বায়ু প্রবাহ দ্বারা ভূমিক্ষয় বেশি হয়, সেসব অঞ্চলে সারি সারি লম্বা গাছ এবং ঝোপজাতীয় গাছ লাগানো উচিত। এই গাছগুলি বায়ু প্রবাহের গতি কমিয়ে ভূমিক্ষয় রোধ করে।
৫. ধাপ চাষ
পাহাড়ি অঞ্চলের ঢালু জমিতে ভূমিক্ষয় কমাতে ধাপ চাষ প্রয়োগ করা হয়। এতে—
শস্যের সারিগুলো একই উচ্চতায় রেখে ঢালের বিপরীতে আড়াআড়িভাবে সাজানো হয়।
পানি সরাসরি গড়িয়ে পড়তে না পারায় ভূমিক্ষয় রোধ হয়।
পাহাড়ের গাত্র কেটে ধাপ তৈরি করা হয়, যা দেখতে অর্ধচন্দ্রাকার হয়।
৬. জমিকে খন্ড খন্ড করে চাষ
পাহাড়ি বা অসমতল জমির সমস্ত ঢাল একইভাবে চাষ না করে খন্ড খন্ড প্লটে বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। এতে জমি অধিকতর স্থিতিশীল থাকে এবং ভূমিক্ষয় কম হয়।
৭. অনিয়মিত পশুচারণ রোধ
অত্যাধিক বা অনিয়মিত পশুচারণে মাটির উপরের স্তর উন্মুক্ত ও আলগা হয়ে যায়। তাই পশুচারণ নিয়ন্ত্রণ করে ভূমি সংরক্ষণ সম্ভব।
৮. বাঁধ বা আইল নির্মাণ
জমির চারপাশে সুষ্ঠুভাবে বাঁধ বা আইল তৈরি করলে বৃষ্টি ও সেচের পানি মাটির ক্ষয় কমায় এবং ভূমি সংরক্ষণ সহজ হয়।
শিক্ষার্থীর কাজ:
শিক্ষার্থী নিজ এলাকা ভূমিক্ষয় পরিদর্শন করে কি উপায়ে ভূমিক্ষয় রোধ করা যাবে তার উপর প্রতিবেদন তৈরি করবেন ।
সারসংক্ষেপ:
বিভিন্ন কারণে ভূমিক্ষয় ঘটতে পারে । বৃষ্টিপাত ভূমির ঢাল, মাটির প্রকৃতি শস্যের প্রকার, চাষ পদ্ধতি, পশুচারণ ও মানুষ্য কার্যাবলী এর জন্য দায়ী। ভূমিক্ষয়ের ফলে যেহেতু পুষ্টি উপাদানের স্থানান্তর ঘটে, এ বিপর্যয় রোধের জন্য কার্যকরি | পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরী। পানি প্রবাহের গতিমুখ পরিবর্তন বা বেগ কমিয়ে ভূমিক্ষয় রোধ করা যায় । এছাড়া পানি | নিষ্কাশনের কার্যকরি ব্যবস্থা, বনভূমি সৃষ্টি, চাষ পদ্ধতির পরিবর্তন, বাঁধ বা আইল তৈরী করেও ক্ষেত্র বিশেষ ভূমিক্ষয় রোধ করা সম্ভব।
