আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় মাছের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব – যা কৃষি ও জলবায়ু এর অন্তর্ভুক্ত ।
Table of Contents
মাছের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

মাছের উপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ২০১৬ প্রতিবেদন অনুযায়ী বিশ্বে আভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মৎস্য আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান ৪র্থ ও মৎস্য চাষে ৫ম। কেননা এদেশের রয়েছে প্রায় ৪.৭ মিলিয়ন হেক্টর মুক্ত ও বন্ধ জলাশয়। সেই সাথে রয়েছে ১,৬৬,০০০ বর্গ কিলোমিটার সামুদ্রিক এলাকা। এটি বাংলাদেশে সামুদ্রিক মাছের একমাত্র উৎস ও বিশ্ব জীববৈচিত্রের অন্যতম ধারক।
এতে রয়েছে ৪৭৫ প্রজাতির মাছ ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি, বিভিন্ন প্রজাতির শামুক, ঝিনুক, কচ্ছপ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক গুরুত্ব সম্পন্ন প্রজাতি। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে মানুষের প্রাণিজ আমিষের ৬০ শতাংশ আসে মৎস্য খাত থেকে এবং সরকারের রূপকল্প ২০২১ অনুযায়ী ২০২০-২০২১ সাল নাগাদ মৎস্য উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে ৪৫.৫০ মেট্রিকটন।
আধুনিক পদ্ধতিতে পরিকল্পিতভাবে মৎস্য চাষের ফলে সামুদ্রিকভাবে মৎস্য উৎপাদন মুক্ত ও বন্ধ জলাশয় বৃদ্ধি পেলেও বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রবৃদ্ধি কাঙ্খিত পর্যায়ে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, ঘরা, বন্যা সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদিজনিত জলবায়ু পরিবর্তন। নিম্নে মৎস্য ক্ষেত্রে এ সমস্ত জলবায়ুজনিত পরিবর্তনের প্রভাব আলোচনা করা হলো :
মাছ চাষ ও পোনা উৎপাদনে প্রভাব
১। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাবে আমাদের দেশে মৌসুমী পুকুরগুলোতে পোনা অবমুক্তকরণ দেরিতে হয়। অন্যদিকে দ্রুত পুকুর শুকিয়ে যাওয়ায় মৎস্য চাষের সময়কাল কমে যায় এবং মাছের আকার ছোট হয় ।
২। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও কম বৃষ্টিপাতের ফলে প্রজনন অনুকূল পরিবেশের অভাবে হ্যাচিরিতে মাছের কৃত্রিম প্রজনন বাধাগ্রস্থ হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে পুকুরের পানির গভীরতা কমে যাওয়ায় মাছ সহজে রোগাক্রান্ত হচ্ছে এবং মাছের মৃত্যুহার বৃদ্ধি পাচ্ছে ।
৩। ঘন ঘন আকস্মিক বন্যা, সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাস হওয়ার কারণে মৎস্য পুকুর ও ঘের ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ায় মৎস্য চাষে খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
৪। পুকুরের পানির স্বাভাবিক গভীরতা ধরে রাখার জন্য চাষীকে পুকুরে পানি সরবরাহের জন্য বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে।

আভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনের প্রভাব
১। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদ-নদীর নাব্যতা কমে যাচ্ছে ফলে একদিকে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র কমে যাচ্ছে এবং অন্যদিকে প্রজননক্ষম মাছ সহজে ধরা পড়ায় নদীতে মাছের উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে এবং জীব বৈচিত্র নষ্ট হচ্ছে।
২। সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে উপকূলীয় এলাকার স্বাদু পানির মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র কমে যাচ্ছে ।
৩। অনিয়মিত ও অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে আমাদের দেশে এপ্রিল মে মাসে আভ্যন্তরীণ জলাশয়ে দেশীয় ছোট মাছের প্রজনন ব্যহত হচ্ছে।
৪। বৈশাখ মাসে বাংলাদেশে প্রচন্ড গরমের পর ভারী বৃষ্টি শুরু হলে রুই জাতীয় মাছ হালদা নদীতে ডিম পাড়ে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে একদিকে ডিমের পরিপক্কতার সময় এগিয়ে আসছে অন্যদিকে বৃষ্টিপাতে দেরি হওয়ায় মাছের শরীরবৃত্তীয় অবস্থায় পরিবর্তনে মাছের ডিম পাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে ।
সামুদ্রিক মৎস্য ক্ষেত্রে প্রভাব
১। গ্রীন হাউজ ইফেক্টের ফলে সমুদ্র পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বাতাসের গতি প্রকৃতি পরিবর্তন হচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাবে সমুদ্রের কোনো অংশের মাছের পরিমাণের অস্বাভাবিক হ্রাস বা বৃদ্ধি পেতে পারে ।
২। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সামুদ্রিক অনেক মাছ তার অভিপ্রায়ন পথ, প্রজনন ক্ষেত্র ও বিচরণ ক্ষেত্রের পরিবর্তন করছে।
দেখা যাচ্ছে মাছ উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চল থেকে মেরু অঞ্চলের সাগরের দিকে সরে যাচ্ছে।
৩। সাগরের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অম্লত্ব বৃদ্ধি, দূষণ ও স্রোতের গতি পরিবর্তনের কারণে সামুদ্রিক প্রবাল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ফলে সামুদ্রিক জীব বৈচিত্র্য বহু হুমকীর মধ্যে পড়ছে।
সারাংশ
আধুনিক পদ্ধতিতে পরিকল্পিতভাবে মৎস্য চাষের ফলে সামুদ্রিকভাবে মৎস্য উৎপাদন মুক্ত ও বন্ধ জলাশয় বৃদ্ধি পেলেও বিভিন্ন প্রকার প্রাকৃতিক ও মনুষ্য সৃষ্ট প্রতিবন্ধকতার কারণে প্রবৃদ্ধি কাঙ্খিত পর্যায়ে ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এসব প্রতিবন্ধকতার মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, ক্ষরা, বন্যা সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাস ইত্যাদি জনিত জলবায়ু পরিবর্তন ।
