মৃত্তিকার অম্লত্ব ও ক্ষারত্ব

অম্ল ও ক্ষার পাঠটি মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিষয়ের ইউনিট–৩ এর পাঠ ৩.৩-এর অন্তর্ভুক্ত। এই পাঠে মৃত্তিকার মৃত্তিকার অম্লত্ব ও ক্ষারত্ব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

মৃত্তিকার অম্লতা বা ক্ষারকত্ব মূলত মৃত্তিকা দ্রবণের পিএইচ (pH) মান দ্বারা প্রকাশ করা হয়। কোনো মৃত্তিকার pH মান যদি ৭-এর কম হয়, তবে সেই মৃত্তিকাকে অম্লীয় মৃত্তিকা বলা হয়। অপরদিকে, মৃত্তিকার pH মান ৭-এর বেশি হলে তাকে ক্ষারীয় মৃত্তিকা বলা হয়। pH মূলত হাইড্রোজেন আয়নের ঘনত্ব বা সক্রিয়তার নির্দেশক।

অতএব বলা যায়, মৃত্তিকার pH হলো মৃত্তিকা দ্রবণে বিদ্যমান হাইড্রোজেন আয়ন (H⁺)-এর ঘনত্বের ঋণাত্মক লগারিদম। অন্যভাবে বলা যায়, কোনো মৃত্তিকা দ্রবণে উপস্থিত হাইড্রোজেন আয়নের ঘনত্বের বিপরীত রাশির লগারিদমিক মানই হলো মৃত্তিকার pH। pH-এর কোনো একক নেই, যদিও হাইড্রোজেন আয়নের পরিমাণ সাধারণত গ্রাম প্রতি লিটার (g/L) হিসেবে প্রকাশ করা হয়।

গাণিতিকভাবে—

pH = –log [H⁺]

মৃত্তিকার pH মান দ্বারা তার অম্লীয় বা ক্ষারীয় ধর্ম বোঝা যায়। কোনো দ্রবণের অম্লতার জন্য মূলত হাইড্রোজেন আয়ন (H⁺)-এর সক্রিয়তা দায়ী, আর ক্ষারীয় ধর্ম প্রকাশ পায় হাইড্রোক্সিল আয়ন (OH⁻)-এর সক্রিয়তার মাধ্যমে। হাইড্রোজেন আয়নকে H⁺ এবং হাইড্রোক্সিল আয়নকে OH⁻ দ্বারা প্রকাশ করা হয়।

এক লিটার পানিতে যত গ্রাম হাইড্রোজেন আয়ন ও হাইড্রোক্সিল আয়ন থাকে, নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় এই দুই আয়নের গুণফল সর্বদা একটি ধ্রুবক মান বজায় রাখে। ২১° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এই ধ্রুবক মান হলো—

[H⁺] × [OH⁻] = 10⁻¹⁴

পানিতে দ্রবীভূত বা বিচ্ছুরিত লবণ, অ্যাসিড কিংবা ক্ষার উপস্থিত থাকলেও এই ধ্রুবক মানের কোনো পরিবর্তন ঘটে না।

সুতরাং কোনো অ্যাসিডের সংস্পর্শে এসে যদি হাইড্রোজেন আয়নের (H⁺) পরিমাণ বৃদ্ধি পায়, তবে একই সঙ্গে হাইড্রোক্সিল আয়নের (OH⁻) পরিমাণ হ্রাস পায়। আবার কোনো ক্ষারের সংস্পর্শে বিপরীত অবস্থা সৃষ্টি হলেও এই ধ্রুবক মান অপরিবর্তিত থাকে। বিশুদ্ধ পানি বা প্রশমিত দ্রবণে সাধারণত হাইড্রোজেন আয়ন ও হাইড্রোক্সিল আয়নের পরিমাণ সমান থাকে, অর্থাৎ উভয়ই 10⁻⁷ গ্রাম প্রতি লিটার।

কোনো দ্রবণ অম্লধর্মী হলে সেখানে হাইড্রোজেন আয়নের পরিমাণ বেশি এবং হাইড্রোক্সিল আয়নের পরিমাণ কম থাকে। অপরদিকে, কোনো দ্রবণ ক্ষারধর্মী হলে হাইড্রোক্সিল আয়নের পরিমাণ বেশি এবং হাইড্রোজেন আয়নের পরিমাণ কম হয়। সাধারণভাবে কোনো দ্রবণের pH মান ৭-এর কম হলে তাকে অম্লীয় এবং ৭-এর বেশি হলে তাকে ক্ষারীয় বলা হয়।

 

মৃত্তিকার অম্ল ও ক্ষার

 

মাটির অম্লতার প্রকারভেদ - Types of Soil Acidity
মাটির অম্লতার প্রকারভেদ

 

মাটির অম্লতার প্রকারভেদ

মাটির অম্লতা বলতে মৃত্তিকায় বিদ্যমান হাইড্রোজেন আয়ন (H⁺)-এর উপস্থিতি ও কার্যকারিতাকে বোঝায়। মাটির অম্লতা প্রধানত দুই প্রকার। যথা—

১. সক্রিয় অম্লতা (Active Acidity)

মাটির দ্রবণে যে পরিমাণ হাইড্রোজেন আয়ন (H⁺) মুক্ত বা সক্রিয় অবস্থায় থাকে, তাকে সক্রিয় অম্লতা বলা হয়। এই অম্লতা সরাসরি মাটির দ্রবণে উপস্থিত থাকার কারণে উদ্ভিদের শিকড়ের উপর তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।

সক্রিয় অম্লতার পরিমাণ নির্ণয় করা হয় pH মান দ্বারা। pH মান যত কম হয়, মাটির সক্রিয় অম্লতা তত বেশি বলে বিবেচিত হয়। সাধারণভাবে এটি মাটির তাৎক্ষণিক অম্লীয় অবস্থাকে নির্দেশ করে।

২. প্রচ্ছন্ন বা পটেনসিয়াল অম্লতা (Potential Acidity)

মাটির কণিকা বা কোলয়েড (বিশেষ করে কাদা ও জৈব কণিকা) যে পরিমাণ হাইড্রোজেন আয়ন শোষিত বা আবদ্ধ (adsorbed) অবস্থায় ধরে রাখে, তাকে প্রচ্ছন্ন বা পটেনসিয়াল অম্লতা বলা হয়।

এই ধরনের অম্লতা মাটির দ্রবণে সরাসরি দৃশ্যমান নয়, কিন্তু প্রয়োজনের সময় (যেমন চুন প্রয়োগ বা আয়ন বিনিময়ের সময়) তা মুক্ত হয়ে মাটির অম্লতা বাড়াতে পারে। সাধারণত মাটিতে প্রচ্ছন্ন অম্লতার পরিমাণ সক্রিয় অম্লতার তুলনায় প্রায় এক হাজার গুণ বেশি হয়ে থাকে। বিশেষ করে এঁটেল মাটিতে এর পরিমাণ আরও বেশি দেখা যায়।

pH নির্ণয়ের ধারণা

বিজ্ঞানী সোরেন সোরেনসেন (Søren Sørensen) pH পরিমাপের জন্য একটি নির্দিষ্ট স্কেল প্রবর্তন করেন, যা কৃষি বিজ্ঞান, রসায়ন এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

এই স্কেল অনুযায়ী—

  • যদি কোনো দ্রবণে এক লিটার পানিতে হাইড্রোজেন আয়নের পরিমাণ 10⁻⁶ গ্রাম হয়, তবে ঐ দ্রবণের pH মান ৬ ধরা হয়।

  • pH মান যত কম হয়, দ্রবণ তত বেশি অম্লীয় হয়।

  • pH মান ৭ হলে দ্রবণটি নিরপেক্ষ এবং ৭-এর বেশি হলে ক্ষারীয় বলে গণ্য হয়।

 

অর্থাৎ সক্রিয় অম্লতা মাটির বর্তমান অম্লীয় অবস্থাকে নির্দেশ করে, যা pH দ্বারা সহজে নির্ণয়যোগ্য। অপরদিকে প্রচ্ছন্ন বা পটেনসিয়াল অম্লতা মাটির ভবিষ্যৎ অম্লীয় ক্ষমতাকে বোঝায়, যা মাটির কণিকায় আবদ্ধ হাইড্রোজেন আয়নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। মাটির সঠিক ব্যবস্থাপনা ও ফসল উৎপাদনের জন্য উভয় প্রকার অম্লতা সম্পর্কে ধারণা থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পিএইচ মান ও হাইড্রোজেন আয়ন - pH scale and hydrogen ions
পিএইচ মান ও হাইড্রোজেন আয়ন

 

পিএইচ মান ও হাইড্রোজেন আয়ন:

পিএইচ (pH) মান মূলত কোনো দ্রবণে বিদ্যমান সক্রিয় হাইড্রোজেন আয়ন (H⁺)-এর ঘনত্বের উপর নির্ভরশীল। পিএইচ মান ও হাইড্রোজেন আয়নের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও বিপরীত সম্পর্ক বিদ্যমান, যা নিম্নোক্ত বিষয়গুলো থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়—

  • পিএইচ মান যত কম হবে, সক্রিয় হাইড্রোজেন আয়নের পরিমাণ তত বেশি হবে।
    অর্থাৎ কোনো দ্রবণে যদি সক্রিয় হাইড্রোজেন আয়নের ঘনত্ব যথাক্রমে 10⁻¹, 10⁻², 10⁻³ … 10⁻¹⁴ হয়, তবে ঐ দ্রবণের পিএইচ মান হবে যথাক্রমে ১, ২, ৩ … ১৪।
  • পিএইচ স্কেলের প্রতিটি একক পরিবর্তনে হাইড্রোজেন আয়নের ঘনত্ব দশ গুণ হারে পরিবর্তিত হয়।
    উদাহরণস্বরূপ, pH ৬ বিশিষ্ট দ্রবণে হাইড্রোজেন আয়নের পরিমাণ pH ৭ বিশিষ্ট দ্রবণের তুলনায় দশ গুণ বেশি। একইভাবে pH ৫ হলে pH ৬-এর চেয়ে দশ গুণ বেশি অম্লীয় হয়।
  • মৃত্তিকায় হাইড্রোজেন আয়নের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে অম্লতা বৃদ্ধি পায়।
    ফলে মাটির pH মান হ্রাস পায় এবং মাটি অধিক অম্লীয় হয়ে ওঠে।
  • পিএইচ নির্ণয়ের জন্য অম্লত্ব ও ক্ষারকত্ব নির্দেশক স্কেল ব্যবহার করা হয়।
    এই স্কেল মাটির বা দ্রবণের অম্লীয়, নিরপেক্ষ বা ক্ষারীয় অবস্থা নির্ণয়ে সহায়তা করে।
  • অম্লত্ব ও ক্ষারকত্ব নির্দেশক স্কেলের পরিসর ১ থেকে ১৪ পর্যন্ত নির্ধারিত।
    এখানে pH ৭ নিরপেক্ষ, ৭-এর নিচে অম্লীয় এবং ৭-এর উপরে ক্ষারীয় অবস্থা নির্দেশ করে।
  • মৃত্তিকার pH মান নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
    বিভিন্ন ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মৃত্তিকার হাইড্রোজেন আয়নের পরিমাণ বাড়ানো বা কমানো যায়, ফলে pH মানও ইচ্ছানুযায়ী বৃদ্ধি বা হ্রাস করা সম্ভব।

 

মৃত্তিকায় অম্লতার কারণ

মাটিতে অম্লতা সৃষ্টি হওয়ার পেছনে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট উভয় ধরনের কারণ বিদ্যমান। প্রধান কারণগুলো নিচে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হলো—

১। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂), সালফার ডাই-অক্সাইড (SO₂), নাইট্রিক অক্সাইড (NOₓ) প্রভৃতি গ্যাস বিদ্যমান থাকে। এসব গ্যাস বৃষ্টির পানিতে দ্রবীভূত হয়ে মাটিতে প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন ধরনের অ্যাসিড উৎপন্ন করে, যা মাটির অম্লতার অন্যতম উৎস।

২। মাটিতে স্বাভাবিকভাবেই নাইট্রিক অ্যাসিড, সালফিউরিক অ্যাসিড ও ফসফরিক অ্যাসিড অল্প পরিমাণে বিদ্যমান থাকে, যা মাটির অম্লতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

৩। অ্যামোনিয়ামজাত সার যেমন— অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, অ্যামোনিয়াম সালফেট ও ইউরিয়া ব্যবহারের ফলে মাটিতে হাইড্রোজেন আয়নের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় এবং অম্লতা বেড়ে যায়।

৪। ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের মতো ক্ষারক লবণের ক্ষয়ের ফলে মাটির অম্লতা বৃদ্ধি পায়। বিশেষত আর্দ্র অঞ্চলে এই ক্ষয়প্রক্রিয়া বেশি ঘটে। কার্বন ডাই-অক্সাইড পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে কার্বনিক অ্যাসিড তৈরি করে, যা এসব ক্ষারক লবণের ক্ষয় ঘটায়।

৫। গ্রানাইটের মতো কিছু শিলা থেকে উৎপন্ন মাটিতে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষারক উপাদানের পরিমাণ কম থাকে। ফলে এসব মাটি সহজেই অম্লীয় প্রকৃতির হয়ে ওঠে। কিছু খনিজ শিলা থেকেও সরাসরি অম্লধর্মী মাটি সৃষ্টি হয়।

৬। জমিতে নিয়মিত ফসল চাষ করা হলে ক্ষারক উপাদানের পরিমাণ কমে যায় এবং পতিত জমিতে তা তুলনামূলকভাবে বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ঋতুভেদেও মাটির অম্লতা সামান্য পরিমাণে বৃদ্ধি বা হ্রাস পেতে পারে।

৭। মাটিতে বিদ্যমান হাইড্রোজেন ও অ্যালুমিনিয়াম আয়ন বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে মাটির দ্রবণে প্রবেশ করে অম্লতা সৃষ্টি করে।

৮। জৈব পদার্থের বিয়োজনের ফলে মাটিতে প্রচুর কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস উৎপন্ন হয়, যা পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে কার্বনিক অ্যাসিড সৃষ্টি করে এবং মাটির অম্লতা বৃদ্ধি করে।
রাসায়নিক বিক্রিয়া:
CO₂ + H₂O → H₂CO₃ → H⁺ + HCO₃⁻

৯। এসিটিক অ্যাসিড, সাইট্রিক অ্যাসিড ও অক্সালিক অ্যাসিডের মতো বিভিন্ন জৈব অ্যাসিডও মাটির অম্লতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

১০। আমাদের দেশের অনেক উচ্চ ও মাঝারি পাললিক ভূমি স্বভাবতই অম্লীয় প্রকৃতির। অধিক বৃষ্টিপাতের কারণে চুয়ানি বৃদ্ধি পায় বলে এমনটি ঘটে। একইভাবে মরুভূমি, জলাভূমি ও পাহাড়ি অঞ্চলের মাটিও অতিরিক্ত চুয়ানির ফলে অম্লীয় হয়ে ওঠে।

১১। উদ্ভিদের মূলের শ্বাসক্রিয়া এবং মাটিস্থ অণুজীবসমূহের শ্বাসক্রিয়ার ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয়। এই CO₂ পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে হাইড্রোজেন আয়ন সৃষ্টি করে, যা কম বাফার ক্ষমতাসম্পন্ন মাটির pH উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
রাসায়নিক বিক্রিয়া:
CO₂ + H₂O → H⁺ + HCO₃⁻

১২। মাটির সিলিকেট কোলয়েডে আবদ্ধ (adsorbed) হাইড্রোজেন, অ্যালুমিনিয়াম ও লৌহ আয়ন পানির সঙ্গে বিক্রিয়া করে অতিরিক্ত হাইড্রোজেন আয়ন উৎপন্ন করে অম্লতা সৃষ্টি করে।
যেমন—
Fe³⁺ + H₂O → Fe(OH)₃ + H⁺
অনুরূপভাবে অ্যালুমিনিয়াম আয়নও হাইড্রোজেন আয়ন উৎপন্ন করে।

 

মাটিতে অম্লতার গুরুত্ব বা প্রভাব

মাটির অম্লতা উদ্ভিদের বৃদ্ধি, পুষ্টি উপাদানের প্রাপ্যতা, অণুজীবের কার্যক্রম এবং সামগ্রিক ফসল উৎপাদনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। মাটিতে অম্লতার প্রধান গুরুত্ব বা প্রভাবসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো—

১। মাটির অম্লতার মান ৪-এর কম হলে অধিকাংশ গাছপালা ও ফসল স্বাভাবিকভাবে জন্মাতে পারে না। এ অবস্থায় গাছ দুর্বল হয় এবং ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

২। অম্লতার ফলে মাটিতে নাইট্রোজেনের অপচয় তুলনামূলকভাবে কম হয়, তবে একই সঙ্গে ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেসিয়ামের প্রাপ্যতা ধীরে ধীরে হ্রাস পায়।

৩। মাটির অম্লতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ও সালফারের দ্রবণীয়তা কমে যায়। বিশেষ করে তীব্র অম্লীয় মাটিতে ফসফরাসের দ্রবণীয়তা মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়।

৪। অম্ল মাটিতে মলিবডেনাম, ম্যাঙ্গানিজ ও বোরনের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পায়, তবে অতিরিক্ত অম্লতার ক্ষেত্রে এসব উপাদানের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।

৫। অম্ল মাটিতে লৌহ, কপার ও দস্তার প্রাপ্যতা বেড়ে যায়। একই সঙ্গে অ্যালুমিনিয়ামের বিষাক্ততা দেখা দেয়, যা উদ্ভিদের শিকড়ের জন্য ক্ষতিকর।

৬। মৃত্তিকার অম্লতা অণুজৈবিক কার্যকলাপ, জৈব পদার্থের বিয়োজন প্রক্রিয়া এবং রাসায়নিক সারের রূপান্তরকে ব্যাহত করে।

৭। অম্ল মাটিতে বীজের অঙ্কুরোদগম সঠিকভাবে হয় না এবং ফসলের গুণগত মান ও উৎপাদন ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৮। অম্লধর্মী মৃত্তিকায় অণুজীবের কার্যাবলীতে বিরূপ প্রভাব পড়ে, যা উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও শস্য উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৯। মৃত্তিকার pH মানের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যায় কোন সার কতটুকু প্রয়োগ করা প্রয়োজন এবং কত পরিমাণ চুন ব্যবহার করলে মাটির অম্লতা নিয়ন্ত্রণে আসবে।

১০। কোন মাটিতে কোন ফসল উপযোগী হবে তা মৃত্তিকার pH মান দ্বারা নির্ধারিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, পাহাড়ি অম্ল মাটিতে চা ফসল ভালোভাবে জন্মে।

১১। মৃত্তিকার ক্যাটায়ন বিনিময় ক্ষমতার ওপর মাটির অম্লতা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে, যা পুষ্টি উপাদান ধারণ ও সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

 

পিএইচ মান ভিত্তিক মৃত্তিকার শ্রেণিবিভাগ

মৃত্তিকার পিএইচ মানের উপর ভিত্তি করে মাটির অম্লত্ব ও ক্ষারকত্ব নির্ধারিত হয়। পিএইচ মান অনুসারে মৃত্তিকাকে প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়—

১। অম্ল বা অম্লীয় মৃত্তিকা
যে মৃত্তিকার pH মান ৭-এর কম, তাকে অম্লীয় মৃত্তিকা বলা হয়।

২। নিরপেক্ষ বা প্রশম মৃত্তিকা
যে মৃত্তিকার pH মান ঠিক ৭, তাকে নিরপেক্ষ বা প্রশম মৃত্তিকা বলা হয়।

৩। ক্ষার বা ক্ষারীয় মৃত্তিকা
যে মৃত্তিকার pH মান ৭-এর বেশি, তাকে ক্ষারীয় মৃত্তিকা বলা হয়।

মৃত্তিকায় বিদ্যমান হাইড্রোজেন ও হাইড্রোজেন আয়নের পরিমাণের উপর ভিত্তি করে মাটির অম্লতা চার ভাগে এবং ক্ষারকত্ব চার ভাগে শ্রেণিবিভাগ করা যায়। নিচের টেবিলে pH মান অনুযায়ী মৃত্তিকার অম্লত্ব ও ক্ষারকত্বের শ্রেণিবিভাগ দেখানো হলো—

টেবিল–১ : পিএইচ মান ভিত্তিক মৃত্তিকার অম্লত্ব ও ক্ষারকত্বের শ্রেণিবিভাগ

pH মানমৃত্তিকার ধরন
৪.৫-এর নিচেতীব্র অম্লীয়
৪.৫ – ৫.৫মাঝারি অম্লীয়
৫.৬ – ৬.৫সামান্য অম্লীয়
৬.৬ – ৭.৩নিরপেক্ষ
৭.৪ – ৮.৪সামান্য ক্ষারীয়
৮.৫ – ৯.০মাঝারি ক্ষারীয়
৯.০-এর উপরেতীব্র ক্ষারীয়

 

মৃত্তিকার অম্লত্ব ও ফসল উৎপাদন একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। অধিকাংশ ফসলই ৫.০ থেকে ৭.৫ pH মানের মধ্যে ভালোভাবে জন্মাতে সক্ষম। আমাদের দেশে উৎপাদিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফসল ও তাদের জন্য উপযোগী pH মান নিচে উল্লেখ করা হলো—

  • ধান : ৫.০ – ৬.৬

  • গম, তামাক ও মিষ্টি আলু : ৫.৫ – ৭.৫

  • আখ, তুলা, তরমুজ, টমেটো ও ডাল জাতীয় শস্য : ৬.০ – ৭.৫

  • বাদাম : ৫.৩ – ৬.৬

  • আলু : ৫.৫ – ৭.০

  • চা : ৫.২ – ৫.৮

সুতরাং, মৃত্তিকার pH মান জানা থাকলে কোন মাটিতে কোন ফসল চাষ উপযোগী হবে তা নির্ধারণ করা সহজ হয় এবং সঠিক মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অধিক ফলন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

মৃত্তিকার বাফার ক্ষমতা

১। কোনো দ্রবণে অল্প পরিমাণ অ্যাসিড বা ক্ষার যোগ করার পর যদি দ্রবণের pH মানে কোনো পরিবর্তন না ঘটে বা অতি সামান্য পরিবর্তন ঘটে, তবে সেই দ্রবণকে বাফার দ্রবণ বলা হয়।

২। মৃত্তিকায় বিদ্যমান কার্বনেট, বাইকার্বনেট এবং বিভিন্ন জৈব যৌগ বাফারিং দ্রব্য হিসেবে কাজ করে।

৩। মাটিতে অণুজীবের ক্রিয়াকলাপের ফলে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন জৈব অ্যাসিড উৎপন্ন হয়, যা উৎকৃষ্ট বাফার দ্রব্য হিসেবে কাজ করে।

৪। মৃত্তিকার অম্লতা বা pH মান দীর্ঘদিন স্থিতিশীল রাখতে হলে মাটিতে উচ্চ বাফার ক্ষমতা থাকা প্রয়োজন।

৫। অধিক বাফার ক্ষমতাসম্পন্ন মাটিতে উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদান গ্রহণ তুলনামূলকভাবে সহজ হয় এবং উদ্ভিদের সুষম বৃদ্ধি নিশ্চিত হয়।

৬। মৃত্তিকার বাফার ক্ষমতা প্রধানত মাটির বুনট, কণার সংযুক্তির ধরন এবং জৈব পদার্থের প্রকার ও পরিমাণের উপর নির্ভর করে।

 

ক্ষার মাটির বৈশিষ্ট্য

১। কোনো মাটিতে ক্ষারজাতীয় লবণ, বিশেষ করে সোডিয়াম কার্বনেটের আধিক্য দেখা দিলে এবং কোলয়েড মাইসেলিতে সোডিয়াম আয়নের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে সেই মাটিকে ক্ষার মাটি বলা হয়।

২। ক্ষার মাটির pH মান সাধারণত ৭-এর বেশি হয়ে থাকে।

৩। বিনিময়যোগ্য সোডিয়ামের পরিমাণ শতকরা ১৫ শতাংশের বেশি থাকে।

৪। ক্ষারীয় বিক্রিয়ার ফলে অনেক জৈব পদার্থ জলীয় দ্রবণে চলে আসে এবং মাটির উপরিভাগে পানি জমে স্তর সৃষ্টি করে।

৫। মাটি শুকিয়ে গেলে নিচের স্তরে অধিক কাদা কণা জমা হয়ে প্রিজমাকৃতির ও স্তম্ভাকৃতির গঠন সৃষ্টি হয়।

৬। ভূ-পৃষ্ঠের কিছু স্থানে সাদা রঙের চাপা আবরণ অথবা কালো রঙের চকচকে মাটির স্তর দেখা যায়।

৭। ক্ষার মাটিতে ভূ-পৃষ্ঠের মাটি অত্যন্ত শক্ত হয়ে পড়ে, ফলে জমি চাষ করা কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে।

৮। বাবলা, খেজুরসহ লবণ সহনশীল উদ্ভিদ এ ধরনের মাটিতে ভালো জন্মে। উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করলে ধান চাষও সম্ভব।

 

ক্ষার মাটি ও গাছপালা

১। মাটির ক্ষারীয় ধর্ম সাধারণত গাছপালার জন্য অনুকূল নয়।

২। ক্ষার মাটি প্রধানত পাঁচটি উপায়ে গাছপালার উপর প্রতিকূল প্রভাব ফেলে—

৩। অতিমাত্রায় তীব্র ক্ষারীয় পরিবেশ সরাসরি উদ্ভিদের জন্য ক্ষতিকর।

৪। কার্বনেট আয়নের বিষক্রিয়ার ফলে উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়।

৫। বিনিময়যোগ্য সোডিয়াম আয়ন উদ্ভিদের শিকড় ও মাটির গঠন ক্ষতিগ্রস্ত করে।

৬। ক্ষার মাটিতে ফসফেট আয়ন এমন অবস্থায় রূপান্তরিত হয়, যা উদ্ভিদ সহজে গ্রহণ করতে পারে না।

৭। ক্ষারীয় পরিবেশ উদ্ভিদের নাইট্রেট গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি করে, ফলে উদ্ভিদের পুষ্টিহীনতা দেখা দেয়।

 

ক্ষার মাটি গাছপালার যে সকল ক্ষতি সাধন করে

ক্ষার মাটি উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ক্ষার মাটির কারণে গাছপালার যে সব ক্ষতি হয়ে থাকে, তা নিচে উল্লেখ করা হলো—

১। ক্ষার মাটিতে গাছপালার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণভাবে বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়।

২। মাটিতে লবণের ঘনত্ব বা ক্ষারের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। কখনও অঙ্কুরোদগম বিলম্বিত হয়, আবার কখনও সম্পূর্ণরূপে অঙ্কুরোদগম ঘটে না।

৩। মাটির লবণের অতিরিক্ত ঘনত্ব বা ক্ষারের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে চারা গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অনেক ক্ষেত্রে মারা যায়।

৪। ক্ষারের তীব্র প্রভাবে গাছের পাতায় দগ্ধ ভাব সৃষ্টি হয় এবং পাতা পুড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়।

৫। মাটির ক্ষারীয় পরিবেশের সংস্পর্শে গাছপালার শিকড়ের কিছু অংশ নষ্ট হয়ে যায়, ফলে পানি ও পুষ্টি উপাদান গ্রহণ ব্যাহত হয়।

 

ক্ষার মাটিকে চাষাবাদের উপযোগী করা

ক্ষার মাটিকে চাষাবাদের উপযোগী করতে হলে মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে হয়—

(ক) মাটির কোলয়েড ও মাটির দ্রবণ থেকে অতিরিক্ত লবণ অপসারণ করতে হবে।
(খ) মাটির কোলয়েড থেকে সোডিয়াম আয়ন দূর করে তার পরিবর্তে ক্যালসিয়াম আয়নের স্থান নিশ্চিত করতে হবে।

এই দুটি শর্ত পূরণের লক্ষ্যে নিচে বর্ণিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা প্রয়োজন—

১। প্রথমে জমির সার্বিক জরিপ করতে হবে, যাতে মাটির প্রকৃতি ও সমস্যার মাত্রা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়।

২। জমি কীভাবে ক্ষারধর্মী হয়েছে সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। সঠিক কারণ নির্ণয় করা গেলে উপযুক্ত পুনরুদ্ধার পদ্ধতির মাধ্যমে দ্রুত মাটিকে চাষাবাদের উপযোগী করে তোলা সম্ভব হয়।

৩। জমির ঢাল ঠিক করা এবং স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় নালা বা ড্রেনেজ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।

৪। পানি সেচ সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত রাখতে হবে। পাশাপাশি সেচের পানির লবণাক্ততা পরীক্ষা না করে চাষাবাদে ব্যবহার করা উচিত নয়।

৫। ক্ষার সহনশীল ফসল নির্বাচন করতে হবে, যাতে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষার মাটিতে ফসল উৎপাদন সম্ভব হয়।

৬। মাটির ক্ষারত্ব বা লবণাক্ততা দূর করার পাশাপাশি মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

৭। বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করেও মাটির ক্ষারত্ব কমানো যায়। যেমন— কালো ক্ষার মাটিতে সালফার প্রয়োগ করা যেতে পারে এবং অতিরিক্ত হাইড্রোজেন আয়ন দূর করতে চুনাপাথর ব্যবহার করা হয়।

৮। কোন সময়ে, কীভাবে এবং কত পরিমাণ রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহার করতে হবে— তা পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী সঠিক সময়ে নির্ধারণ ও প্রয়োগ করতে হবে।

 

ক্ষার মাটি পুনরুদ্ধার পদ্ধতি

ক্ষার মাটিকে চাষাবাদের উপযোগী করে তুলতে বিভিন্ন পুনরুদ্ধার পদ্ধতি গ্রহণ করা যেতে পারে। ক্ষার মাটি পুনরুদ্ধারের প্রধান পদ্ধতিগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো—

১। জমিতে কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে অতিরিক্ত লবণ ও ক্ষারীয় দ্রবণ সহজে বের হয়ে যেতে পারে।

২। পর্যাপ্ত সেচ প্রয়োগের মাধ্যমে লবণ ধুয়ে বের করা (leaching) প্রয়োজন, যাতে মাটির উপরিভাগে জমে থাকা ক্ষারীয় লবণ অপসারিত হয়।

৩। জমির উপরিভাগে জমে থাকা লবণাক্ত বা ক্ষারীয় আবরণ পরিষ্কার করে অপসারণ করতে হবে।

৪। মাটির উপরিভাগ থেকে পানির বাষ্পীভবন কমানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে মালচিং প্রয়োগ একটি কার্যকর পদ্ধতি।

৫। সেচ খাল ও নালা পাকা বা সুরক্ষিত করতে হবে, যাতে সেচের পানি অপচয় না হয় এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধি না পায়।

৬। পর্যাপ্ত পরিমাণে জৈব সার ও সবুজ সার প্রয়োগ করতে হবে, যা মাটির গঠন উন্নত করে এবং ক্ষারত্ব হ্রাসে সহায়তা করে।

৭। প্রয়োজনে অন্য স্থান থেকে উর্বর মাটি এনে ক্ষার মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে, যাতে মাটির গুণগত মান বৃদ্ধি পায়।

Leave a Comment