মৃত্তিকার গঠন ও বুনট – নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি “মৃত্তিকা বিজ্ঞান” বিষয়ের ইউনিট ২ এর পাঠ ২.২ । মৃত্তিকা গঠনকারী উপাদান মৃত্তিকা একটি নিয়ত পরিবর্তনশীল প্রাকৃতিক মিশ্র পদার্থ। ক্ষয়ীভূত শিলা ও খনিজের সাথে জৈব পদার্থ এবং পানির মিশ্রণে মৃত্তিকা সৃষ্টি হয়। যে কোন মৃত্তিকা প্রধানত চারটি উপাদান নিয়ে গঠিত।
Table of Contents
মৃত্তিকার গঠন ও বুনট, মৃত্তিকা বিজ্ঞান
যথা—
১। খনিজ দ্রব্য (Mineral matter)
২। জৈব দ্রব্য (Organic matter)
৩। পানি বা জলীয় অংশ (Water)
8। বায়ু (Air)
সাধারণত কৃষি মাটিতে এ চারটি উপাদান নিম্নবর্ণিত শতকরা হারে উপস্থিত থাকে :


খনিজ দ্রব্য (Mineral matter):
আয়তন ও ওজন ভিত্তিতে মৃত্তিকায় খনিজ দ্রব্যের শতকরা গড় পরিমাণ যথাক্রমে ৪৫ ও ৭৩ ভাগ। মাটিতে খনিজ দ্রব্যের আকার বড় হলে এবং নুড়ি বা স্থূল বালিকণার পরিমাণ বাড়লে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা কমে যায়। খনিজ দ্রব্য মৃত্তিকায় উদ্ভিদ পুষ্টি উপাদানের ভাণ্ডার। খনিজ দ্রবোর বৈশিষ্ট্যের ওপর তা নির্ভরশীল। পাথর খণ্ড, বালি কণা, পলি কণা ও কর্দম কণা সমন্বয়ে মৃত্তিকা খনিজ দ্রব্য গঠিত।

জৈব পদার্থ (Organic matter):
উদ্ভিদ ও প্রাণিদেহের পচনের ফলে সৃষ্ট পদার্থ যা মৃত্তিকায় মিশে আছে তাই মৃত্তিকা জৈব পদার্থ। জৈব পদার্থকে মাটির প্রাণ বলা হয়। জৈব পদার্থের পরিমাণের উপর মাটির উর্বরতা ও উৎপাদন ক্ষমতা সরাসরি নির্ভরশীল। জৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি হলে মাটির গুণাগুণ উন্নত হয়। জৈব পদার্থ অধিকাংশ পুষ্টি উপাদানের ভান্ডার হিসেবে বিবেচিত।
পানি বা জলীয় অংশ (Water):
মৃত্তিকা কণার ফাঁকে অথবা গায়ে শোষিত অবস্থায় যে জলীয় অংশ বিদ্যমান সাধারণভাবে তাকে মৃত্তিকা পানি বলা হয়। বৃষ্টি, সেচ ও বিভিন্ন জলাশয় হলো মৃত্তিকা পানির উৎস। মৃত্তিকা পানিতে উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদানসমূহ আয়ন আকারে অবস্থান করে।
বায়ু (Air):
মৃত্তিকা কণার ফাঁকে বিদ্যমান বায়বীয় অংশই মৃত্তিকা বায়ু। এর মধ্যে রয়েছে নাইট্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন-ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য গ্যাস।
একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন তা হলো : মৃত্তিকায় বায়ু ও পানির পরিমাণ একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। অর্থাৎ মৃত্তিকা বায়ুর পরিমাণ বাড়লে পানির পরিমাণ কমে। জলাবদ্ধ মাটিতে বায়ুর পরিমাণ প্রায় শূন্য কারণ এ অবস্থায় মৃত্তিকা কণার সকল ফাঁক পানি দ্বারা পূর্ণ থাকে।
মৃত্তিকা বুনট কী (What is soil texture)?
আমরা জানি, মাটিতে তিন ধরণের কণা (Soil seperates) বিদ্যমান। এরা হলো বালি, পলি ও কর্দম কণা। মৃত্তিকা বুনট বলতে মৃত্তিকাস্থ বালি, পলি ও কর্দম কণার তুলনামূলক পরিমাণকে বুঝায়। বুনট হলো মৃত্তিকার একটি অন্যতম ভৌত ধর্ম। মাটির অনেক ভৌত গুণাবলী বুনটের ওপর নির্ভরশীল। সংজ্ঞা হিসেবে বলা যেতে পারে যে :
বুনট হলো কোন মৃত্তিকায় বিদ্যমান বালি, পলি ও কর্দম কণার আপেক্ষিক অনুপাত বা শতকরা হার। অন্য কথায় এটি মৃত্তিকা কণার স্থূলতা বা সূক্ষ্ণতাকে বুঝায়। (Soil texture refers to the relative proportion or relative percentage of sand, silt and clay in a soil. In other words, it is the relative coarseness and fineness of soil particles or soil seperates).

মাটিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হলে এর বুনট সম্পর্কে ভাল ধারণা থাকা প্রয়োজন। যেমনঃ যে মাটিতে বালি কণার পরিমাণ অধিক সে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা কম এবং বালি প্রধান মাটিতে মূল জাতীয় ফসল ভাল হয়। সুতরাং সেচ, নিকাশ, ফসল নির্বাচন, শস্য পর্যায়, সারের প্রকৃতি ও প্রয়োগ পদ্ধতি ইত্যাদি ফসল উৎপাদনে ব্যবহৃত ব্যবস্থাপনা কৌশলসমূহ মৃত্তিকা বুনটের ওপর নির্ভরশীল। মৃত্তিকা বুনটের শ্রেণিবিন্যাস (Textural classification of soil)
মৃত্তিকায় বিদ্যমান বালি, পলি ও কর্দম কণার আনুপাতিক উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে মৃত্তিকা বুনটের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। মৃত্তিকা বুনটকে দুই পদ্ধতিতে শ্রেণিবিন্যস করা হয়ে থাকে। এদের একটি হলো যুক্তরাষ্ট্র পদ্ধতি (USDA System) ও অন্যটি হলো আর্ন্তজাতিক পদ্ধতি।

মৃত্তিকার বুনট শ্রেণির উন্নতীকরণ (Development of soil textural class):
এঁটেল বা কাদামাটিকে দোআঁশ মাটিতে রূপান্তরিতকরণ : বালি, ছাই, চুন ইত্যাদি যোগ করে কাদা মাটিকে দোআঁশ মাটিতে রূপান্তরিত করা যায়। কোন কোন সময় গভীরভাবে চাষ দিলে নিচ স্তরের মাটি উপরে উঠে আসে ফলে আংশিকভাবে দোআঁশ মাটিতে পরিণত হয়। কমপোস্ট সার, সবুজ সার পশুপাখির মল-মূত্র, পরিমাণ মত বালি যোগ করেও এ কাজ সমাধা করা যায়।
বেলে মাটিকে দোআঁশ মাটিতে পরিণতকরণ : পার্শ্ববর্তী কোন উঁচু জমি বা খাল, নদী হতে নালা কেটে জমিতে পানি প্রবেশ করিয়ে চারিদিকের আইল বেধে রাখলে ক্রমে ক্রমে বেলে মাটি দোআঁশ মাটিতে পরিণত হয়। এ ছাড়া বেলে মাটির সাথে কাদা/এঁটেল মাটি /সবুজ সার, পশুপাখির মল-মূত্র যোগ করেও বেলে মাটিকে দোআঁশ মাটিতে পরিণত করা যায়।
মৃত্তিকার বুনটের গুরুত্ব (Importance of soil texture):
১। মৃত্তিকার শ্রেণিবিভাগ করতে সহায়তা করে ফলে কোন মাটিতে ফসল উৎপাদন করা যাবে তা নির্ণয় করা যায়।
২। মাটির যথোপযুক্ত ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা করতে সহায়তা করে।
৩। কোন কোন সময় নির্দিষ্ট মাটির pH ও পুষ্টি উপাদানের মাত্রা জানতে সাহায্য করে।
৪। মৃত্তিকার ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক ধর্মাবলী জানতে সাহায্য করে।
৫। মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা জানা যায় ফলে সময় মত সেচ ও নিকাশ করা যায়।
৬। মাটির বয়স জানতে সাহায্য করে।
৭। দালানকোটা, রাস্তা, রেলপথ, প্রভৃতি নির্মাণের জন্য কোন স্থান ভাল তা জানতে সাহায্য করে।
৮। ভূমি কর্ষনের সুবিধা/অসুবিধা সম্পর্কে ধারণা করা যায়।
৯। মাটিকে নির্দিষ্ট দলে শ্রেণিবিভাগ করতে সহায়তা করে।
১০। মাটির উর্বরতা, উৎপাদনশীলতা এবং বায়ু চলাচলে (aeration) সাহায্য করে।
১১। শিলাক্ষয়ের পর্যায় (weathering stage) জানতে সাহায্য করে।
১২। নদীর ধারের মাটিতে অধিক বালি থাকায় তা ভূমিক্ষয়ে সাহায্য করে।
১৩। ক্রমাগত পলির স্তর জমা হয়ে নদীর মোহনায় বিভিন্ন বুনটের মাটি গঠিত হয় যা কৃষি কাজে সহায়তা করে।

