মৃত্তিকার জৈবিক উপাদান

মৃত্তিকার জৈবিক উপাদান নিয়ে আজকের আলোচনা। এই পাঠটি বাউবি’র মৃত্তিকা বিজ্ঞান – ১২০৪ কোর্সের ইউনিট ৪ এর,  ৪.১ নম্বর পাঠ।

মৃত্তিকার জৈবিক উপাদান , পাঠ ৪.১, ইউনিট ৪ , ১২০৪, মৃত্তিকা বিজ্ঞান, বিএজিএড, বাউবি

(BAUBI – মৃত্তিকা বিজ্ঞান ১২০৪ | ইউনিট–৪ | পাঠ–৪.১)

 

Table of Contents

মৃত্তিকার জৈবিক উপাদান

মৃত্তিকা বিজ্ঞান অধ্যয়নে মৃত্তিকার জৈবিক উপাদান একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কারণ মৃত্তিকার উর্বরতা, গঠন, জলধারণ ক্ষমতা, পুষ্টি উপাদানের সহজলভ্যতা এবং অণুজীবীয় কার্যকলাপ—সবকিছুই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৃত্তিকার জৈব উপাদানের উপর নির্ভরশীল। এই পাঠে আমরা মৃত্তিকার জৈবিক উপাদানের প্রকৃতি, গঠন, শ্রেণিবিভাগ এবং কৃষিতে এর ভূমিকা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।

মৃত্তিকার জৈবিক উপাদান কী

মৃত্তিকার জৈবিক উপাদান মূলত দুইটি প্রধান ভাগে বিভক্ত—

১. বিভিন্ন প্রকার জীবিত জীব—যেমন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, শৈবাল, একটিনোমাইসিটিস, কেঁচো, পোকামাকড় ইত্যাদি
২. প্রাণহীন জৈব অবশেষ—যাকে সাধারণভাবে জৈব পদার্থ (Organic Matter) বা হিউমাস (Humus) বলা হয়

এই প্রাণহীন জৈব পদার্থ মূলত উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত দেহ বা দেহাংশের পচনশীল ও অপচনশীল অবশিষ্টাংশ থেকে গঠিত। মৃত্তিকার জৈব পদার্থ মৃত্তিকায় শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে এবং অণুজীবের বেঁচে থাকা ও বংশবিস্তারে সহায়তা করে।

জৈব পদার্থের গঠন ও উপাদান

মৃত্তিকার জৈব পদার্থ বিভিন্ন মৌলিক ও যৌগিক উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। এতে প্রধানত নিম্নলিখিত মৌলগুলো বিভিন্ন অনুপাতে বিদ্যমান থাকে—

  • কার্বন (C)
  • নাইট্রোজেন (N)
  • অক্সিজেন (O)
  • হাইড্রোজেন (H)
  • ফসফরাস (P)
  • সালফার (S)
  • অল্প পরিমাণে ছাই বা ক্ষারীয় পদার্থ

সাধারণভাবে দেখা যায়, মৃত্তিকার জৈব পদার্থে—

  • কার্বন থাকে প্রায় ৫০–৬০%
  • নাইট্রোজেন ৩–৬%
  • অক্সিজেন প্রায় ৩৫%
  • হাইড্রোজেন প্রায় ৫%
  • ছাই বা ক্ষারীয় উপাদান প্রায় ৫% (আনুমানিক)

 

 

নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও সালফারের ভূমিকা

নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও সালফার মৃত্তিকার জৈব পদার্থে অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে এবং সহজে অপচয় হয় না। জৈব পদার্থে কাইটিন, নিউক্লিক এসিড ও নিউক্লিওটাইডের মতো ফসফরাসযুক্ত যৌগ বিদ্যমান থাকে। বিয়োজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এসব যৌগ থেকে ক্যাটায়ন ও অর্থোফসফেট নির্গত হয়, যা উদ্ভিদের জন্য সহজলভ্য পুষ্টি হিসেবে কাজ করে।

এছাড়া এমাইনো এসিড, সিস্টাইন ও সিস্টিনের মতো সালফারযুক্ত যৌগও জৈব পদার্থে উপস্থিত থাকে। সময়ের সাথে সাথে এগুলো বিয়োজিত হয়ে সালফারের অজৈব যৌগে রূপান্তরিত হয়, যা উদ্ভিদ গ্রহণ করতে পারে।

হিউমাস কণিকার মৌলিক গঠন

মৃত্তিকার হিউমাস কণিকায় কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, সালফার, ফসফরাস এবং অন্যান্য খনিজ মৌল বিদ্যমান থাকে। এই হিউমাস কণিকাই মৃত্তিকাকে গাঢ় রঙ প্রদান করে এবং মৃত্তিকার রাসায়নিক ও ভৌত বৈশিষ্ট্য উন্নত করে।

হিউমাস: সংজ্ঞা, উৎপত্তি ও বৈশিষ্ট্য

হিউমাসের সংজ্ঞা

মৃত্তিকার জৈব পদার্থ যখন অণুজীবের ক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে বিয়োজিত হয়ে অপেক্ষাকৃত স্থায়ী, বিয়োজন প্রতিরোধী এবং জটিল রাসায়নিক গঠনের এক বিশেষ রূপ ধারণ করে, তখন সেই অবশিষ্ট পদার্থকে হিউমাস (Humus) বলা হয়।

হিউমাস সাধারণত গাঢ় বাদামী থেকে কালো রঙের হয় এবং এটি সহজে বিয়োজিত হয় না। এটি মূলত উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত দেহাংশের পচনের শেষ পর্যায়ের ফল, যেখানে প্রাথমিক জৈব গঠন ভেঙে গিয়ে অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল যৌগে রূপান্তরিত হয়।

হিউমাসের উৎপত্তি প্রক্রিয়া

মৃত্তিকায় উপস্থিত বিভিন্ন অণুজীব—যেমন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও একটিনোমাইসিটিস—জীবাণু উৎসেচকের (enzyme) অনুঘটক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জৈব পদার্থের বিয়োজন ঘটায়। এই বিয়োজন প্রক্রিয়ায়—

  • সহজপাচ্য কার্বোহাইড্রেট ও প্রোটিন প্রথমে ভেঙে যায়
  • পরবর্তীতে লিগনিন ও জটিল যৌগ আংশিকভাবে পরিবর্তিত হয়
  • ধীরে ধীরে একটি জটিল, অনিয়তাকার ও অসমসত্ব (heterogeneous) মিশ্রণ তৈরি হয়

এই মিশ্রণটি বাদামী বা গাঢ় বাদামী রঙের হয় এবং এতে লিগনিন, প্রোটিন ও প্রোটিন কাদা জাতীয় পদার্থ বিদ্যমান থাকে। এই জটিল মিশ্রণটিই হলো হিউমাস

হিউমাসের বৈশিষ্ট্য

হিউমাসের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যসমূহ নিচে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হলো—

১. রং
হিউমাস গাঢ় বাদামী থেকে কালো বর্ণের হয়, যা মৃত্তিকার রংকে গাঢ় করতে সাহায্য করে।

২. দ্রবণীয়তা
হিউমাস পানিতে অদ্রবণীয় হলেও ক্ষারীয় দ্রবণে দ্রবণীয়।

৩. রাসায়নিক গঠন
হিউমাসের রাসায়নিক গঠন অত্যন্ত জটিল ও অনিয়তাকার।

৪. গঠন উপাদান
হিউমাসে আনুমানিক—

  • ৩০% প্রোটিন বা আমিষ
  • ৩০% লিগনিন
  • ৩০% জটিল শর্করা (Complex carbohydrates) বিদ্যমান থাকে

৫. মৌলিক গঠন
হিউমাসে সাধারণত—

  • কার্বন ৫৫–৫৮%
  • নাইট্রোজেন ৩–৬%
  • এছাড়া সিলিকন, এলুমিনিয়াম ও লৌহ উপস্থিত থাকে

৬. কার্বন-নাইট্রোজেন অনুপাত (C:N)
হিউমাসের কার্বন-নাইট্রোজেন অনুপাত প্রায় ১২:১, যা অধিকাংশ ফসলের জন্য উপযোগী।

৭. ভৌত বৈশিষ্ট্য
হিউমাস সংকোচন ও প্রসারণ গুণে সমৃদ্ধ, ফলে মৃত্তিকার গঠন উন্নত হয়।

৮. ক্যাটায়ন বিনিময় ক্ষমতা
হিউমাসের ক্যাটায়ন বিনিময় ক্ষমতা (CEC) অত্যন্ত বেশি, যা মৃত্তিকাকে পুষ্টি ধারণে সক্ষম করে।

৯. পরিমাণগত গুরুত্ব
মৃত্তিকার মোট জৈব পদার্থের প্রায় ৮৫–৯০% অংশই হিউমাস।

হিউমাস ও জৈব পদার্থের পার্থক্য

বিষয়জৈব পদার্থহিউমাস
বিয়োজন অবস্থাআংশিক বা অসম্পূর্ণ বিয়োজিতপ্রায় সম্পূর্ণ বিয়োজিত
স্থায়িত্বঅস্থায়ীতুলনামূলকভাবে স্থায়ী
রংহালকা বাদামীগাঢ় বাদামী থেকে কালো
বিয়োজনের গতিদ্রুতখুব ধীর
কৃষিগত ভূমিকাশক্তির উৎসউর্বরতা ও গঠন উন্নয়ন

 

কার্বন–নাইট্রোজেন অনুপাত (C:N Ratio)

কার্বন–নাইট্রোজেন অনুপাতের সংজ্ঞা

মৃত্তিকায় বিদ্যমান কোনো জৈব পদার্থে মোট কার্বনের পরিমাণ ও মোট নাইট্রোজেনের পরিমাণের মধ্যকার অনুপাতকে কার্বন–নাইট্রোজেন অনুপাত বা সি–এন (C:N) অনুপাত বলা হয়।

সহজভাবে বলা যায়,

C:N অনুপাত = মোট কার্বন ÷ মোট নাইট্রোজেন

এই অনুপাত মৃত্তিকায় জৈব পদার্থের বিয়োজনের গতি, অণুজীবের কার্যকলাপ এবং উদ্ভিদের জন্য নাইট্রোজেনের সহজলভ্যতা নিয়ন্ত্রণ করে।

চাষের জমিতে C:N অনুপাত

চাষযোগ্য জমিতে জৈব পদার্থের C:N অনুপাত সাধারণত—

  • সর্বনিম্ন: ৮:১
  • সর্বোচ্চ: ১৫:১
  • অধিকাংশ ক্ষেত্রে: ১০:১ থেকে ১২:১

এই অনুপাত কৃষি ফসলের বৃদ্ধির জন্য সর্বাধিক উপযোগী বলে বিবেচিত।

বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, মৃত্তিকার ধরন এবং জৈব পদার্থের গুণাগুণ অনুযায়ী C:N অনুপাতের তারতম্য ঘটে।

বিভিন্ন জৈব পদার্থের C:N অনুপাত (আনুমানিক)

জৈব পদার্থের ধরনC:N অনুপাত
গোবর সার১৫:১
কম্পোস্ট সার১০–১২:১
সবুজ সার১২–২০:১
খড় (ধান/গম)৬০–৮০:১
কাঠের গুঁড়া২০০–৪০০:১
পাতাঝরা আবর্জনা৪০–৬০:১
মৃত অণুজীব দেহ৮:১

 

 

C:N অনুপাতের গুরুত্ব

১. বিয়োজন প্রক্রিয়ার গতি নিয়ন্ত্রণ

যেসব জৈব পদার্থে C:N অনুপাত বেশি, সেগুলিতে কার্বনের পরিমাণ বেশি এবং নাইট্রোজেনের পরিমাণ কম থাকে। ফলে সেগুলোর বিয়োজন ধীরগতিতে ঘটে।

অন্যদিকে, কম C:N অনুপাতযুক্ত জৈব পদার্থ দ্রুত বিয়োজিত হয়।

২. অণুজীবের কার্যকলাপে প্রভাব

উচ্চ C:N অনুপাতযুক্ত জৈব পদার্থ মৃত্তিকায় প্রয়োগ করলে—

  • হেটারোট্রফিক অণুজীব যেমন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও একটিনোমাইসিটিস অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে
  • তারা জৈব পদার্থ ভাঙার জন্য শক্তি হিসেবে কার্বন ব্যবহার করে
  • এই প্রক্রিয়ায় বিপুল সংখ্যক অণুজীব দ্রুত বংশ বিস্তার করে

গবেষণায় দেখা গেছে—

  • প্রায় ৩৫% কার্বন অণুজীব তাদের দেহ গঠনের জন্য গ্রহণ করে
  • অবশিষ্ট ৬৫% কার্বন

    • বায়বীয় অবস্থায় CO₂ হিসেবে
    • জলাবদ্ধ অবস্থায় H₂CO₃ ও CH₄ হিসেবে নির্গত হয়

৩. নাইট্রোজেনের স্থায়ীকরণ (Immobilization)

অধিক সংখ্যক অণুজীব নিজেদের দেহ গঠনের জন্য মৃত্তিকার অজৈব নাইট্রোজেন গ্রহণ করে, যেমন—

  • অ্যামোনিয়াম (NH₄⁺)
  • নাইট্রেট (NO₃⁻)

এর ফলে সাময়িকভাবে গাছের জন্য নাইট্রোজেনের সহজলভ্যতা কমে যায়। এই প্রক্রিয়াকে নাইট্রোজেন স্থায়ীকরণ (Nitrogen Immobilization) বলা হয়।

৪. নাইট্রোজেনের মুক্তি (Mineralization)

সময়ের সাথে সাথে—

  • মৃত্তিকায় কার্বনের পরিমাণ কমে যায়
  • অণুজীবের খাদ্যাভাব সৃষ্টি হয়
  • বহু অণুজীব মারা যায়

এই মৃত অণুজীবের দেহ পুনরায় বিয়োজিত হয়ে—

  • নাইট্রোজেন মুক্ত করে
  • NH₄⁺ ও NO₃⁻ আকারে উদ্ভিদের জন্য সহজলভ্য করে তোলে

এ পর্যায়ে C:N অনুপাত কমে প্রায় ১০:১ এ নেমে আসে, যা সকল কৃষি ফসলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

৫. কৃষিতে ব্যবহারিক গুরুত্ব

  • উচ্চ C:N অনুপাতযুক্ত জৈব পদার্থ ব্যবহারের আগে অতিরিক্ত নাইট্রোজেন সার প্রয়োগ করা উচিত
  • কম C:N অনুপাতযুক্ত সার দ্রুত ফলন বৃদ্ধি করে
  • সঠিক C:N অনুপাত মৃত্তিকার উর্বরতা ও দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করে

 

হিউমাসের প্রধান উপাদান ও তাদের বৈশিষ্ট্য

হিউমাস মূলত কয়েকটি জটিল জৈব যৌগের সমষ্টি। এগুলো মৃত্তিকার ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক বৈশিষ্ট্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হিউমাসের প্রধান উপাদানগুলো হলো—

১. হিউমিক এসিড (Humic Acid)
২. ফালভিক এসিড (Fulvic Acid)
৩. হিউমিন ও এলমিন (Humin & Elmin)
৪. হেমাটোমেলানিক এসিড (Hematomelanic Acid)

১. হিউমিক এসিডের বৈশিষ্ট্য

হিউমিক এসিড হলো হিউমাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর উপাদান। এটি মৃত্তিকার উর্বরতা বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

হিউমিক এসিডের বৈশিষ্ট্যসমূহ—

১. রাসায়নিক গঠন
হিউমিক এসিডে আনুমানিক—

  • কার্বন: ৫০–৬০%
  • হাইড্রোজেন: প্রায় ৪%
  • অক্সিজেন: প্রায় ৪০%

এতে কার্বন–নাইট্রোজেন অনুপাত প্রায় ১৪:১

২. আণবিক ওজন
হিউমিক এসিড উচ্চ আণবিক ওজন সম্পন্ন যৌগ, যার আণবিক ওজন প্রায় ৩০,০০০ থেকে ৫০,০০০

৩. ক্যাটায়ন বিনিময় ক্ষমতা (CEC)
হিউমিক এসিডের ক্যাটায়ন বিনিময় ক্ষমতা অত্যন্ত বেশি, প্রায়
৫৪৯ মিলি-সমতুল্য / ১০০ গ্রাম মাটি,
যা মৃত্তিকায় পুষ্টি ধারণ ও সরবরাহে সহায়তা করে।

৪. দ্রবণীয়তা
হিউমিক এসিড ক্ষারীয় দ্রবণে দ্রবণীয়, তবে পানিতে অদ্রবণীয়।

৫. প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য
পডজল ও চারনোজেম মৃত্তিকা থেকে নিষ্কাশিত হিউমিক এসিড সাধারণত হাইড্রোফিলিক প্রকৃতির হয়।

২. ফালভিক এসিডের বৈশিষ্ট্য

ফালভিক এসিড হিউমাসের অপেক্ষাকৃত হালকা রঙের ও কম আণবিক ওজনসম্পন্ন উপাদান, যা উদ্ভিদের পুষ্টি গ্রহণে বিশেষভাবে কার্যকর।

ফালভিক এসিডের বৈশিষ্ট্যসমূহ—

১. গঠন
ক্রিনিক এসিড (Crenic Acid) ও এপোক্রিনিক এসিড (Apocrenic Acid) যৌথভাবে ফালভিক এসিড নামে পরিচিত।

২. মৌলিক উপাদান
ফালভিক এসিডে আনুমানিক—

  • কার্বন: ৪০–৪৭%
  • অক্সিজেন: ৪২–৫০%

৩. আণবিক ওজন
এটি উচ্চ আণবিক ওজন সম্পন্ন হলেও হিউমিক এসিডের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম।

৪. দ্রবণীয়তা
ফালভিক এসিড—

  • পানি
  • অ্যালকোহল
  • ক্ষার
    সব ক্ষেত্রেই দ্রবণীয়।

৫. রঙ

  • অল্প ঘনত্বে: হালকা হলুদ
  • অধিক ঘনত্বে: কমলা-হলুদ

ক্রিনিক এসিড হলুদ এবং এপোক্রিনিক এসিড বাদামী রঙের হয়ে থাকে।

৬. ক্যাটায়ন বিনিময় ক্ষমতা
ফালভিক এসিডের CEC প্রায় ৩০০–৪০০ মিলি-সমতুল্য / ১০০ গ্রাম মাটি

৭. কার্যকরী গ্রুপ
এতে—

  • কার্বোক্সিল
  • মিথোক্সিল
  • হাইড্রোক্সিল
    গ্রুপ বিদ্যমান থাকায় পার্শ্ব বিক্রিয়ার প্রভাব বেশি।

৩. হিউমিন ও এলমিনের বৈশিষ্ট্য

হিউমিন ও এলমিন হিউমাসের অপেক্ষাকৃত স্থায়ী ও কম সক্রিয় অংশ।

হিউমিন ও এলমিনের বৈশিষ্ট্য—

১. প্রকৃতি
এরা যথাক্রমে হিউমিক ও এলমিক এসিডের অনুরূপ হলেও অণু তুলনামূলকভাবে ছোট।

২. দ্রবণীয়তা
মাটির খনিজ অংশের সাথে স্থায়ী বন্ধন গড়ে তোলায়—

  • ক্ষারে অদ্রবণীয়
  • পানিতেও অদ্রবণীয়

৩. পুষ্টি ধারণ
উল্লেখযোগ্য পরিমাণে—

  • নাইট্রোজেন
  • ফসফরাস
  • সালফার
    এবং অন্যান্য মৌল ধারণ করে।

৪. স্থায়িত্ব
এরা দীর্ঘকাল মৃত্তিকায় স্থায়ী থাকে এবং ধীরে ধীরে পুষ্টি সরবরাহ করে।

৪. হেমাটোমেলানিক এসিডের বৈশিষ্ট্য

হেমাটোমেলানিক এসিড হলো হিউমিক এসিডের একটি ডেরিভেটিভ বা উপজাত।

হেমাটোমেলানিক এসিডের বৈশিষ্ট্য—

১. আণবিক ওজন
এর আণবিক ওজন তুলনামূলকভাবে কম, প্রায় ৮০০

২. কার্বনের পরিমাণ
অন্যান্য হিউমাস এসিডের তুলনায় এতে কার্বনের পরিমাণ বেশি।

৩. দ্রবণীয়তা
পানি, অ্যালকোহল ও ক্ষারে দ্রবণীয়।

৪. রাসায়নিক প্রকৃতি
এটি হিউমিক এসিডের ডেরিভেটিভ।

৫. কার্যকরী গ্রুপ
এতে—

  • কার্বোক্সিল
  • ফেনোলিক
  • মিথোক্সিল
    গ্রুপ বিদ্যমান।

 

পাঠের সারসংক্ষেপ (Summary)

মৃত্তিকার জৈবিক উপাদান মৃত্তিকার উর্বরতা, গঠন ও উৎপাদনশীলতার অন্যতম প্রধান নিয়ামক। মৃত্তিকার জৈব উপাদান প্রধানত দুই ভাগে বিভক্ত—জীবিত জৈব উপাদান (বড় ও ক্ষুদ্র জীব) এবং প্রাণহীন জৈব উপাদান (জৈব পদার্থ ও হিউমাস)। উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত দেহাংশ বিয়োজনের মাধ্যমে জৈব পদার্থে রূপান্তরিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদি বিয়োজনের ফলে অপেক্ষাকৃত স্থায়ী ও জটিল যৌগ হিসেবে হিউমাস সৃষ্টি হয়।

হিউমাস মৃত্তিকার রং গাঢ় করে, পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, ক্যাটায়ন বিনিময় ক্ষমতা বাড়ায় এবং উদ্ভিদের জন্য পুষ্টি উপাদান সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মৃত্তিকার জৈব পদার্থের গুণাগুণ নির্ধারণে কার্বন–নাইট্রোজেন (C:N) অনুপাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপযুক্ত C:N অনুপাত (১০:১ থেকে ১২:১) মৃত্তিকায় অণুজীবের কার্যকলাপকে সুষম রাখে এবং উদ্ভিদের জন্য নাইট্রোজেন সহজলভ্য করে।

হিউমাসের প্রধান উপাদান—হিউমিক এসিড, ফালভিক এসিড, হিউমিন, এলমিন ও হেমাটোমেলানিক এসিড—প্রতিটি মৃত্তিকার রাসায়নিক ও ভৌত বৈশিষ্ট্য উন্নত করতে স্বতন্ত্র ভূমিকা রাখে। সামগ্রিকভাবে মৃত্তিকার জৈব উপাদান কৃষি উৎপাদনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

গুরুত্বপূর্ণ সংজ্ঞা (Very Important Definitions)

১. মৃত্তিকার জৈব পদার্থ
উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত দেহ বা দেহাংশের পচনশীল অবশেষকে মৃত্তিকার জৈব পদার্থ বলা হয়।

২. হিউমাস
জৈব পদার্থের প্রায় সম্পূর্ণ বিয়োজনের পর সৃষ্ট স্থায়ী, গাঢ় রঙের ও বিয়োজন প্রতিরোধী জৈব পদার্থকে হিউমাস বলা হয়।

৩. কার্বন–নাইট্রোজেন (C:N) অনুপাত
মৃত্তিকায় জৈব পদার্থে মোট কার্বন ও মোট নাইট্রোজেনের অনুপাতকে C:N অনুপাত বলে।

৪. ক্যাটায়ন বিনিময় ক্ষমতা (CEC)
মৃত্তিকার ঋণাত্মক আধানযুক্ত কণিকা দ্বারা ধনাত্মক আয়ন ধারণ ও বিনিময়ের ক্ষমতাকে ক্যাটায়ন বিনিময় ক্ষমতা বলে।

সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন–উত্তর (Short Questions & Answers)

প্রশ্ন ১: হিউমাস কেন স্থায়ী?
উত্তর: হিউমাসের রাসায়নিক গঠন জটিল এবং এটি লিগনিন ও প্রোটিন সমৃদ্ধ হওয়ায় সহজে বিয়োজিত হয় না।

প্রশ্ন ২: অধিক C:N অনুপাতযুক্ত জৈব পদার্থ কেন ধীরে বিয়োজিত হয়?
উত্তর: এতে নাইট্রোজেন কম থাকায় অণুজীবের বৃদ্ধি সীমিত হয় এবং বিয়োজন ধীরগতিতে ঘটে।

প্রশ্ন ৩: ফালভিক এসিড কেন উদ্ভিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
উত্তর: এটি পানিতে দ্রবণীয় ও কম আণবিক ওজনসম্পন্ন হওয়ায় উদ্ভিদ সহজে পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে।

প্রশ্ন ৪: হিউমিক এসিডের CEC বেশি হওয়ার কারণ কী?
উত্তর: এতে কার্বোক্সিল ও ফেনোলিক গ্রুপ বেশি থাকায় ধনাত্মক আয়ন ধারণের ক্ষমতা বেশি।

পরীক্ষায় লেখার কৌশল (Exam Writing Tips)

  • সংজ্ঞা প্রশ্নে: ২–৩ লাইনে নির্ভুল সংজ্ঞা লিখবেন
  • বৈশিষ্ট্য প্রশ্নে: পয়েন্ট আকারে লিখবেন (৫–৭টি পয়েন্ট)
  • ব্যাখ্যামূলক প্রশ্নে:

    • ভূমিকা
    • মূল আলোচনা
    • গুরুত্ব/উপসংহার
  • টেবিল থাকলে অবশ্যই ব্যবহার করবেন (পার্থক্য বোঝাতে সুবিধা হয়)

 

সূত্র

মৃত্তিকার জৈবিক উপাদান – পাঠ ৪.১, ইউনিট–৪, মৃত্তিকা বিজ্ঞান–১২০৪, বিএজিএড, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি)

Leave a Comment