মৃত্তিকা হলো পৃথিবীর বুকে জীবন ধারণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। উদ্ভিদ, প্রাণী ও মানুষের খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা—সব ক্ষেত্রেই মৃত্তিকার ভূমিকা অপরিসীম। এই মৃত্তিকার মধ্যেই জীবনের জন্ম, বিকাশ এবং শেষ পর্যন্ত বিলীন হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তাই মৃত্তিকা সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করা কৃষি, পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এই পাঠে মৃত্তিকার সংজ্ঞা, উৎপত্তি, গঠন ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনা করা হয়েছে, যাতে মৃত্তিকার প্রকৃতি ও গুরুত্ব সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত ধারণা অর্জন করা যায়। এই পাঠটি বাউবি বিএই ১২০৪ – মৃত্তিকা বিজ্ঞান – বিএজিএড এর পাঠ ১.১।

Table of Contents
মৃত্তিকা সম্পর্কে ধারণা
মৃত্তিকা কী?
মৃত্তিকা একটি প্রকৃতিজাত বস্তু (Natural body), যা প্রকৃতির দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল প্রক্রিয়ার ফল। আজ আমরা যে মৃত্তিকাকে দেখতে পাচ্ছি, তা কোনো স্বল্প সময়ে সৃষ্টি হয়নি। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীর উপরিভাগের কঠিন শিলা বিভিন্ন প্রাকৃতিক শক্তির প্রভাবে ভেঙে, চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষের সঙ্গে মিশে ধীরে ধীরে মৃত্তিকায় রূপান্তরিত হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ব্যাপী পরিবর্তন প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মৃত্তিকার সৃষ্টি ও বিকাশ ঘটেছে।
মৃত্তিকা কোনো মৌলিক বা যৌগিক পদার্থ নয়; বরং এটি একটি মিশ্র পদার্থ। কারণ মৃত্তিকার কোনো নির্দিষ্ট বা অপরিবর্তনীয় রাসায়নিক গঠন নেই। মৃত্তিকা সৃষ্টির পর থেকে আজ পর্যন্ত এটি ক্রমাগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও পরিবর্তিত হতে থাকবে। প্রকৃতপক্ষে মৃত্তিকা একটি গতিশীল প্রাকৃতিক ব্যবস্থা।
মানুষের নানাবিধ কার্যক্রম, যেমন— কৃষিকাজ, শিল্পায়ন ও ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন; পাশাপাশি তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহের মতো প্রাকৃতিক শক্তির ক্রিয়া এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহাবশেষের সংমিশ্রণ—সবকিছু মিলিয়ে মৃত্তিকার গুণাগুণ দিন দিন পরিবর্তিত হচ্ছে। মৃত্তিকা সৃষ্টিতে উৎস শিলার প্রকৃতি, জলবায়ু, ভূপ্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই উপাদানগুলোর তারতম্যের কারণেই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মৃত্তিকার রং, গঠন, উর্বরতা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়।
তবে বৈশিষ্ট্যগত ভিন্নতা থাকলেও পৃথিবীর সব অঞ্চলের মৃত্তিকাই মূলত চারটি মৌলিক উপাদানে গঠিত। এই উপাদানগুলো হলো— খনিজ পদার্থ, পানি, বায়ু এবং জৈব পদার্থ। খনিজ পদার্থ আসে মৃত্তিকা সৃষ্টিকারী কঠিন শিলা থেকে; জৈব পদার্থ আসে উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃতদেহ ও অবশিষ্টাংশ থেকে; পানি আসে প্রধানত বৃষ্টিপাত (Precipitation) থেকে এবং বায়ু আসে প্রাকৃতিক বায়ুমণ্ডল থেকে।
এই চারটি উপাদান মৃত্তিকায় কোনো নির্দিষ্ট অনুপাতে উপস্থিত থাকে না। স্থানভেদে এদের পরিমাণ ও অনুপাত ভিন্ন ভিন্ন হয়। এই কারণেই মৃত্তিকাকে একটি জটিল ও বহুমাত্রিক মিশ্র পদার্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও জীবনের ধারাবাহিকতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মৃত্তিকার সংজ্ঞা (Definition of Soil):
বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতো মৃত্তিকা বিজ্ঞানেও দ্রুত অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। গবেষণার মাধ্যমে মৃত্তিকার উৎপত্তি, গঠন, প্রকৃতি ও কার্যাবলি সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিমার্জিত ও বিস্তৃত হচ্ছে। নতুন নতুন তথ্য ও তত্ত্ব আবিষ্কৃত হওয়ার ফলে মৃত্তিকার সংজ্ঞাও বারবার সংশোধিত ও উন্নত হয়েছে। এজন্য মৃত্তিকাকে একক ও চূড়ান্ত সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা কঠিন। নিচে বিভিন্ন বিশিষ্ট মৃত্তিকা বিজ্ঞানী কর্তৃক প্রদত্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা উপস্থাপন করা হলো—
১। মৃত্তিকা হলো একটি রাসায়নিক গবেষণাগার, যেখানে নীরবে বিভিন্ন রাসায়নিক বিযোজন (Chemical Decomposition) ও সংশ্লেষণ বিক্রিয়া সংঘটিত হয়।
(Berzelius J.J., Sweden)
২। মাটি হলো খাদ্য উৎপাদনের একটি প্রাকৃতিক কারখানা।
(Davy, UK)
৩। মৃত্তিকা হলো পৃথিবীর উপরিভাগের সেই স্তর, যা শিলা ক্ষয়ের (Weathering) মাধ্যমে গঠিত এবং উদ্ভিদের অবলম্বন ও পুষ্টির উৎস হিসেবে কাজ করে।
(Schübler, Germany)
৪। মৃত্তিকা হলো বিচূর্ণ কঠিন কণা, বায়ু ও পানির মিশ্রণ, যা উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য সহজলভ্য পুষ্টি উপাদানের বাহক হিসেবে কাজ করে।
(Mitscherlich A., Germany)
৫। মৃত্তিকা খনিজ ও জৈব উপাদানে গঠিত একটি প্রাকৃতিক বস্তু, যা বিভিন্ন গভীরতাবিশিষ্ট স্তরে বিভক্ত এবং আঙ্গিক (Morphology), ভৌত গঠন, রাসায়নিক ধর্ম ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র।
(Joffe, USA)
এই সংজ্ঞাটি অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য।
ইংরেজি পরিভাষায়—
“The soil is a natural body of mineral and organic constituents differentiated into horizons of variable depths, which differs from the material below in morphology, physical make-up, chemical properties and biological characteristics.”
৬। কৃষিতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিজ্ঞানী হিলগার্ডের সংজ্ঞাটি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, মৃত্তিকা হলো এমন ঝুরঝুরে ও আলগা পদার্থ, যেখানে উদ্ভিদ শিকড় প্রবেশ করিয়ে অবলম্বন গ্রহণ করে এবং পুষ্টিসহ বৃদ্ধি ও বিকাশের প্রয়োজনীয় শর্তসমূহ লাভ করে।
(Hilgard)
ইংরেজি পরিভাষায়—
“Soil may be defined as the more or less loose and friable material in which, by means of their roots, plants may find a foothold and nourishment, as well as other conditions of growth.”
৭। আমেরিকান মৃত্তিকা বিজ্ঞান সমিতির মতে, মৃত্তিকা হলো প্রাকৃতিক বস্তুর সমষ্টি যা পৃথিবীর উপরিভাগে অবস্থান করে এবং উদ্ভিদের বিভিন্ন ধরনের সহায়তা প্রদান করে। জলবায়ু ও জীবজগতের সম্মিলিত প্রভাবে এবং সময়ের ব্যবধানে উৎস শিলার উপর নির্ভর করে মৃত্তিকা নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য অর্জন করে।
(American Society of Soil Science)
৮। খনিজ মৃত্তিকার সাধারণ সংজ্ঞা হিসেবে বিজ্ঞানী নাইল সি. ব্র্যাডির সংজ্ঞাটি বিশেষভাবে গ্রহণযোগ্য। তাঁর মতে, চূর্ণ-বিচূর্ণ ও ক্ষয়ীভূত খনিজ এবং পচনরত জৈব পদার্থের চলমান মিশ্রণে গঠিত প্রাকৃতিক বস্তুসমূহ, যা ভূ-পৃষ্ঠকে একটি পাতলা আবরণ দ্বারা আচ্ছাদিত করে এবং উদ্ভিদকে পানি, বায়ু ও পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে—তাই মৃত্তিকা।
(Nyle C. Brady)
উপরোক্ত সংজ্ঞাসমূহ থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে মৃত্তিকাকে নির্ভুল ও একক সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা কঠিন। আধুনিক যুগে মৃত্তিকার উৎপত্তি, গঠন ও প্রকৃতি বিষয়ে চলমান গবেষণার ফলে নতুন নতুন ধারণার উদ্ভব হচ্ছে, যার কারণে মৃত্তিকার সংজ্ঞাতেও সময়োপযোগী পরিবর্তনের প্রয়োজন দেখা দেয়। তবে আলোচিত সংজ্ঞাগুলো তুলনামূলকভাবে অধিক গ্রহণযোগ্য এবং মৃত্তিকার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

মৃত্তিকা সৃষ্টি হলো যেভাবে:
১। পৃথিবীর বুকে মৃত্তিকা সৃষ্টি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া, যা আজও বিজ্ঞানীদের কাছে এক অনন্য রহস্য হিসেবে বিবেচিত। বিজ্ঞানীদের মতে, সৃষ্টির আদিতে পৃথিবী ছিল উত্তপ্ত ও গলিত পদার্থে পরিপূর্ণ।
২। সময়ের প্রবাহে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায় এবং গলিত পদার্থ ঠান্ডা হয়ে কঠিন শিলা বা প্রস্তরখণ্ডে রূপান্তরিত হয়।
৩। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তাপমাত্রার পরিবর্তন, শৈত্য, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ এবং অন্যান্য ভৌত ও রাসায়নিক প্রক্রিয়ার প্রভাবে এই শিলাখণ্ডগুলো ধীরে ধীরে চূর্ণ-বিচূর্ণ হতে থাকে।
৪। এই চূর্ণ-বিচূর্ণ শিলাই মৃত্তিকা সৃষ্টির প্রথম ও প্রধান উপাদান। মৃত্তিকা সৃষ্টিকারী এই পদার্থগুলোকে উৎস বস্তু (Parent material) অথবা উৎস শিলা (Parent rock) বলা হয়।
৫। উৎস শিলা ক্রমান্বয়ে ভেঙে যাওয়ার ফলে বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন খনিজ পদার্থের সৃষ্টি হয়, যা মৃত্তিকার প্রাথমিক কাঠামো গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৬। শিলাচূর্ণ থেকে খনিজ পদার্থ সৃষ্টির এই প্রক্রিয়া চলমান থাকাকালীন এক পর্যায়ে সেখানে জীবনের আবির্ভাব ঘটে। এর মাধ্যমে মৃত্তিকা সৃষ্টির দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা হয়।
৭। এই পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ ও প্রাণীর বৃদ্ধি ও বিকাশ শুরু হয়। উদ্ভিদ ও প্রাণীর কার্যকলাপের ফলে শিলা ও খনিজ পদার্থের ক্ষয় আরও দ্রুততর হয়।
৮। অপরদিকে, উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃতদেহ ও জৈব দেহাবশেষ শিলাচূর্ণের সঙ্গে মিশে মৃত্তিকায় জৈব পদার্থের সংযোজন ঘটায়, ফলে অপেক্ষাকৃত উন্নত ও উর্বর মৃত্তিকা সৃষ্টি হয়।
৯। মৃত্তিকা সৃষ্টির পর থেকে শুরু করে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর গঠন, রং, উর্বরতা ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্যে ক্রমাগত পরিবর্তন ঘটে।
১০। এই দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার কারণেই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মৃত্তিকার বৈশিষ্ট্যে এত বৈচিত্র্য পরিলক্ষিত হয়।
১১। মৃত্তিকা সৃষ্টিতে প্রভাবকারী বিভিন্ন উপাদান এবং এসব উপাদানের ভূমিকা পরবর্তী পাঠে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
১২। মৃত্তিকা গঠনকারী উপাদানসমূহের প্রভাব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করলে মৃত্তিকা সৃষ্টির রহস্য আরও সহজ ও বোধগম্য হয়ে ওঠে।
সূত্র:
- মৃত্তিকা সম্পর্কে ধারণা , পাঠ ১.১, ইউনিট ১ , ১২০৪, মৃত্তিকা বিজ্ঞান, বিএজিএড, বাউবি
