আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়-পানি সেচ ও নিকাশ
Table of Contents
পানি সেচ ও নিকাশ
ফসলের প্রয়োজনে মাটির ভৌত ধর্ম ও মাটির মধ্যে পানির পরিমাণ পর্যবেক্ষণ করে সেচ দেয়ার সময় ও সেচের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হয়। আবার অতিরিক্ত সেচ বা প্রাকৃতিক কারণে জমিতে প্রয়োজনের বেশি পানি জমা হলে তা বের করে দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হয়।
সেচ ও সেচের উদ্দেশ্য
ফসলের সুষ্ঠু বৃদ্ধি ও উন্নয়নের লক্ষে প্রয়োজনে জমিতে কৃত্রিম উপায়ে পানি সরবরাহ করাকেই সেচ বলা হয়। যে কোনো জীবের বাঁচার জন্য যেমন পানি অপরিহার্য, ফসলের জন্যও তেমনি। ফসল সুন্দরভাবে বাঁচার ও ফলন দেবার জন্য মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি ও পানিতে দ্রবীভূত পুষ্টি উপাদান সংগ্রহ করে। ধরা, অনাবৃষ্টি বা অন্য কোন কারণে ফসলের জমিতে পানির আবশ্যকতা দেখা দেয়। সুতরাং সেচের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি করা।

সেচের উপকারিতা
১। উদ্ভিদ মূল রোমের সাহায্যে পানি পরিশোষণ করে। মাটিতে আর্দ্রতার অভাব হলে সেচ প্রদান অপরিহার্য।
২। উদ্ভিদ কর্তৃক প্রস্বেদন মাটি থেকে বাস্পীভবন এবং মাটির অভ্যন্তরে পানি অনুপ্রবেশ এ সমস্ত কারণে মাটি রসের অভাব হচ্ছে। ঐ অভাব সময়মত পূরণের উপযুক্ত মাধ্যম হচ্ছে সেচ।
৩। মাটি থেকে খনিজ খাদ্যে উপাদানসমূহকে উদ্ভিদ পানির উপস্থিতিতে আয়ন হিসেবে গ্রহণ করে।
৪। ভূ-গর্ভস্থ পানি স্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি করা যায়।
৫। জমিকে জো অবস্থায় আনতে সেচের প্রয়োজন।
৬। সেচের পানি মাটিতে অবস্থানরত উপকারী অণুজীবের কার্যাবলি ত্বরান্বিত করে।
৭। সেচের পানি দ্রুত জৈব পদার্থকে পচিয়ে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে।
৮। মাটির তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে সেচের মাধ্যমে তা কমিয়ে আনা সম্ভব।
৯। রোপা পদ্ধতিতে ধান চাষ করলে জমি কাদা করতে হয়। বস কম থাকলে প্রয়োজনমত সেচ প্রদান আবশ্যক হয়ে পড়ে।
সেচের অপকারিতা
১। ক্ষেতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে মশা ও রোগ-জীবাণুর বিস্তার বেড়ে যায়।
২। স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ার কারণে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
৩। অতি সেচের কারণে জমির ক্ষারত্ব বা লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেলে জমির উর্বরতা শক্তি কমে যায়।
৪। অতি সেচের কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে গাছের শিকড় অঞ্চলে অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয় এবং এতে গাছ মারা যা
৫। ভূ-পৃষ্ঠস্থ পদ্ধতিতে সেচের জন্য নালা তৈরিতে অনেক জমি নষ্ট হয়।
৬। ফসল উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
৭। বালাইনাশক ব্যবহারের ফলে নদী-নালার পানি এবং ভূ-গর্ভস্থ পানি দুষিত হতে পারে ইত্যাদি।
৮। হালকা বুনটের মাটিতে অতিরিক্ত সেচ প্রদান করলে মাটিতে বিদ্যমান খাদ্য পাদান ধুয়ে মাটি অনুর্বর হয়ে পড়ে। এ ছাড়াও প্রচুর Ca ধুয়ে গেলে মাটি অম্ল হয়ে পড়ে।
৯। ভূ-পৃষ্ঠস্থ সেচের মাধ্যমে আগাছার বীজ সহজে বিস্তার লাভকরে।
সেচের পানির উৎস
নোনা পানির উৎসগুলোকে সেচের পানির উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয় না। স্বাদু পানির উৎসকে সেচের পানির উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভূ-পৃষ্ঠ উৎস-নদীনালা, খাল-বিল, পুকুর-ডোবা, ঝরনা প্রভৃতির পানি। ভূ-গর্ভস্থ উৎস মাটির নিচের জমাকৃত পানিকে বোঝায়। এ পানি সাধারণ কৃপ গভীর বা অগভীর নলকূপের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়।

সেচের পানির কার্যকারিতা বৃদ্ধির উপায়
উৎস থেকে সেচের পানি জমিতে নেয়ার পথে এবং জমিতে প্রয়োগ করার পর বিভিন্নভাবে পানির অপচয় হয়। এই অপচয় যত কম হবে সেচের পানির কার্যকারিতা তত বেশি হবে। এছাড়া মাটির অবস্থা বুকে ফসলের প্রয়োজনের সময় সেচ দিতে পারলে সেচের পানির কার্যকারিতা আরও বৃদ্ধি পায়। বাষ্পীভবন, চুয়ানো, অনুস্রবণ, শোষণ, লিক প্রভৃতির মাধ্যমে পানির অপচনা হ্রাস করতে পারলে সেচের পানির কার্যকারিতা অনেক বৃদ্ধি পায়। পানিতে নিম্নে বর্ণিত উপাদান বিদ্যমান থাকলে সে পানি সেচের জন্য ব্যবহার করা ঠিক নয়।
উদ্ভিদ, মাটি ও মানুষের জন্য ক্ষতিকারক জৈব বিষ ।
ক্ষতিকারক রাসায়নিক পদার্থ।
ক্ষতিকারক জীবাণু ইত্যাদি।
পানি নিকাশ
ফসলের প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি অপসারণ করাকেই পানি নিকাশ বলা হয়। পানি নিকাশের উদ্দেশ্য:-
১। জমির সঠিক আর্দ্রতা ও লবণের ভারসাম্যতা রক্ষা করে অধিক ফসল ফলানো নিশ্চিত করা।
২। উদ্ভিদের জন্য জলাভূমি, জলাশয় ও জলাবদ্ধ জমি ইত্যাদি পুনরুদ্ধার করা।
৩। অতিরিক্ত সেচ বা বৃষ্টির পানি বের করে দেয়া।
৪। বন্যার পানি অপসারণ করা।
৫। বাহির থেকে চুয়ানো পানির আগমন রোধ করা ইত্যাদি।

পানি নিকাশের উপকারিতা
১। জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারবে না যেমন- তোষাপাট, মরিচ, তুলা, কাঠাল ইত্যাদির প্রাণ রক্ষায় নিষ্কাশন অত্যাবশ্যক।
২। উদ্ভিদের শিকড় অঞ্চলের গভীরতা বেড়ে যাওয়ার ফলে মাটির প্রয়োজনীয় অার্দ্রতা ও গাছের খাবারের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।
৩। মাটির সবাত অবস্থা সৃষ্টিতে সহায়তা করে।
৪। মুর্ত্তিকা ক্ষয় কমায়।
৫। অতিরিক্ত ক্ষতিকর পবন অপসারণ করে।
৬। মাটির প্রয়োজনীয় তাপ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
৭। বিভিন্ন ধরনের শস্য চাষের সুযোগ সৃষ্টি করে।
৮। কৃষি কাজের বায় কমে যায়।
৯। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই জমি চাষের ও বীজ বপনের সুযোগ পাওয়া যায় ইত্যাদি।
১০। নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হলে বায়ু চলাচলের পথ সুগম হওয়ায় মাটিতে অক্সিজেন বৃদ্ধি পায় এবং কার্বন ডাই অক্সাইড বের হয়ে আসতে পারে।
পানি নিকাশের অপকারিতা
১। ভূগর্ভস্থ পানির তল নিচে নেমে যেতে পারে।
২। মাটির আর্দ্রতা অতিরিক্ত কমে গেলে ফসলহানি ও জমির উর্বরতা হ্রাসের সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।
৩। বিল ও জল এলাকা কমে যাওয়ার ফলে মাছ, পানি ইত্যাদির প্রাপ্যতা কমে যায় এবং জীব বৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলে।
সারমর্ম:
ফসলের সুষ্ঠু বৃদ্ধি ও উন্নয়নের লক্ষে কৃত্রিম উপায়ে কোন জমিতে পানি সরবরাহ করাকেই পানি সেচ বলা হয়। আবার কোন জমি থেকে ফসলের প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি অপসারণ করে দেয়াকেই পানি নিকাশ বলে। পানি সেচ ও পানি নিকাশ উভয়েই উপকারী। ও অপকারী প্রভাব রয়েছে।
