নার্সারিতে চারা উৎপাদন পদ্ধতি

আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়-নার্সারিতে চারা উৎপাদন পদ্ধতি

নার্সারিতে চারা উৎপাদন পদ্ধতি

নার্সারিতে ফুল-ফল, শাকসবজি ও বনজ বৃক্ষের চারা উৎপাদন করা হয়। চারা উৎপাদন প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। যথা-

(ক) বীজ থেকে চারা উৎপাদন

(খ) গাছের বিভিন্ন অংশ তথা কলমের সাহায্যে চারা উৎপাদন

(ক) বীজ থেকে চারা উৎপাদন

সাধারণত সবজি ও বনজ বৃক্ষের চারা বাঁজ থেকে সরাসরি উৎপাদন করা হয়। সব সময় ভালো গাছ থেকে ভালো বীজ সংগ্রহ করা হয়। বীজ থেকে কম সময়ে ও তুলনামূলকভাবে কম পরিশ্রমে অধিক চারা উৎপাদন করা যায়।

বীজ থেকে উৎপাদিত চারার প্রধান শিকড় নষ্ট হয় না এবং বনজ বৃক্ষের ক্ষেত্রে গাছের কান্ড খুব লম্বা ও মজবুত হয়। তবে বাঁজ থেকে উৎপাদিত চারা হুহু মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্য নাও পেতে পারে। সেজন্য ফুল ও ফল জাতীয় উদ্ভিদের ক্ষেত্রে সাধারণত কলমের সাহায্যে চারা উৎপাদন করা হয়।

কলমের সাহায্যে উৎপাদিত চারায় মাতৃগাছের গুণাগুণ অক্ষুণ্ণ থাকে। বীজ থেকে চারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে বীজ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিশোধন সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকা আবশ্যক।

বীজ সংগ্রহ- নার্সারিতে অনেক উদ্ভিদের দ্বারা বীজ থেকে উৎপাদন করা হয়। নার্সারিতে রোপণের জন্য বা সরাসরি বপণের জন্য সাধারণত দুটি উৎস থেকে বীজ সংগ্রহ করা হয়। गा-

১. স্থানীয় উৎস

২. বিদেশী উৎস ভালো বীজ পেতে হলে সুস্থ, সবল মাতৃগাছ থেকে পরিপক্ক, রোগমুক্ত ও পরিপুষ্ট বীজ সংগ্রহ করতে হবে। আদর্শ মাতৃগাছের নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন-

১। মাতৃগাছ সুস্থ ও সবল হতে হবে।

২। বয়স মাঝারি ধরনের হবে।

৩। গাছটির সুন্দর মুকুট ও ডালপালা থাকবে। এখানে মুকুট হলো গাছের মাথার অংশ।

৪। পরিপুষ্ট ফল ও বীজ উৎপাদনে সক্ষম হতে হবে।

নির্বাচিত মাতৃগাছ হতে বীজ সংগ্রহের পর তা শুকিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়। মনে রাখতে হবে যে, কোন কোন উদ্ভিদের বীজ সংরক্ষণের অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই জীবনী শক্তি হারিয়ে ফেলে। এসব ক্ষেত্রে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এসব বীজতলায় বীজ রোপণ বা পবন করতে হবে।

যেমন- শাল, কড়ই, কাঁঠাল ইত্যাদি। বীজ সংগ্রহের পদ্ধতি বিভিন্ন উদ্ভিদে বিভিন্ন রকম। কোন কোন উদ্ভিদের পাকা রসাল ফল থেকে বীজ সংগ্রহ করা হয়। যেমন- আম, জাম, কাঁঠাল ইত্যাদি। আবার কোন কোন উদ্ভিদের ক্ষেত্রে তা শুভ ফল থেকে সংগ্রহ করা

হয়। বীজ সংগ্রহের সময় লক্ষ্য রাখতে হবে বীজ যেন আঘাতপ্রাপ্ত না হয়। বিভিন্ন উদ্ভিদের ফল পাকার মৌসুমি অনুযায়ী বীজ সংগ্রহ করতে হয়। স্বল্প জীবাণু শক্তিসম্পন্ন প্রজাতির বীজ আমদানি করা হয় না। বনজ মধ্যে সাধারণত ইউক্যালিপটাস, আকাশমনি ও ম্যানজিয়ান এর বীজ আমদানি করা হয়।

বীজ আমদানি বা রপ্তানির ক্ষেত্রে বীজে ক্ষতিকারক কোন জীবাণু (ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়া) নাই এ ধরনের একটি সার্টিফিকেট প্রয়োজন হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্ল্যান্ট কোয়ারেন্টাইন বিভাগ এ ধরনের সার্টিফিকেট প্রদান করে। তবে সার্টিফিকেট প্রদানের আগে বীজকে কীটনাশক রাসায়নিক দ্রব্যের সাহায্যে রোগমুক্ত করা হয়।

বীজ সংরক্ষণ

অনেক সময় সংগৃহীত বীজ সাথে সাথেই রোপণ বা বপন করা যায় না। সেক্ষেত্রে রোপণের পূর্ব পর্যন্ত বীজকে গুদামজাত করাকে বীজ সংরক্ষণ বলে। সঠিক সময়ে যথাযথ নিয়মে বীজ সংরক্ষণ না করলে তা পোকা ও রোগ জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

সাধারণত বীজ সংরক্ষণ করতে হলে বীজে প্রয়োজনীয় কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক মিশিয়ে নেওয়া হয়। শুষ্ক, ঠান্ডা ও কিছুটা অন্ধকারাচ্ছন্ন ও পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা সম্পন্ন স্থানে বীজ সংরক্ষণ করা হয়। বীজ সংরক্ষণের সময় বীজের নাম, সংগ্রহের উৎস, বীজের পরিমাণসহ অন্যান্য বিবরণ বীজ ট্যাগে লিখে প্রতিটি প্যাকেটে এঁটে দিতে হয়।

বিদেশ থেকে আমদানিকৃত বীজ সংরক্ষণের আগে তার সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বীজ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয় নির্দেশাবলি গ্রহণ করা প্রয়োজন।

বীজ পরিশোধন

বীজ বপন বা রোপণের পূর্বে বাহুকে শোধন করা উত্তম। এতে বীজের অঙ্কুরোদগম হার বেড়ে যায় এবং সুস্থ সবল চারা পাওয়া যায়। বীজ পরিশোধনের পদ্ধতি নিম্নরূপ : প্রথমে পানিতে ভাসিয়ে চিটা ও অপুষ্ট বীজকে আলাদা করা হয়।

– বীজের ধরন অনুযায়ী শক্ত আবরণের বীজ নির্দিষ্ট সময় পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। যেমন- কড়ই (৪৮ ঘন্টা), পাইন(২৪ ঘন্টা), খয়ের (১-২ দিন)।

ফুটন্ত পানি ব্যবহার করে সিম জাতীয় কিছু সংখ্যক শক্ত খোসার বীজকে পরিশোধন করা হয়। এক্ষেত্রে ফুটন্ত পানিতে (১০৪ সে. এর নিচে) বীজসমূহ ১-৩ মিনিট কাল রেখে পরে সাধারণ পানিতে ২৪-৪৮ ঘন্টার মতো রাখতে হয়। উদাহরন- ইপিল-ইপিল, বাবলা, কৃষ্ণচূড়া, আকাশমনি ইত্যাদি।

যদি বীজ ছত্রাক বা অন্যান্য জীবাণুবাহিত হয় তবে বীজকে ১ ভাগ ফরমালিন ৪০০ ভাগ পানির মিশ্রণে তৈরি দ্রবণে ১০ মিনিট ভিজিয়ে রাখতে হবে।

অথবা ০.১% সালফিউরিক এসিড দ্রবণে ১০ মিনিট ভিজিয়েও বীজশোধন করা সম্ভব। উভয় ক্ষেত্রে শোধনের পর বীজকে সাধারণ পানি দ্বারা ভালোভাবে ধুতে হয়।
এছাড়া ভিটাভেক্স ২০০ এর নির্দিষ্ট মাত্রার দ্রবণে বীজ কয়েক মিনিট ভিজিয়ে রেখে অতঃপর সাধারণ পানি দ্বারা ধৌত করে বীজ শোধন করা যায়।

বীজের পরিমাণ নির্ণয়করণ

কি পরিমাণ চারা নার্সারিতে উৎপাদন করতে কতটুকু পরিমাণ বীজের প্রয়োজন তা জানা প্রয়োজন। নার্সারিতে চাহিদানুযায়ী চারার জন্য প্রয়োজনীয় বীজের পরিমাণ দুটি সূত্র দ্বারা নির্ণয় করা যায়।
নিচের সূত্রের ব্যবহার করে নির্ণয় করা যায় : (১) মোট বীজের সংখ্যা = (২) মোট বীজের ওজন =

(A×N)+B(A+N)

GXT P মোট বীজের সংখ্যা

W

এখানে,

A বাগানের জমির পরিমাণ

N = প্রতি হেক্টর চারার সংখ্যা

B = শূন্যস্থান পূরণ (১০%)

G অঙ্কুরোদগমের হার (সাধারণত ৮০%)

T = গাছের হার ( চারা উঠানো ও মরে যাবার পর যা থাকে, সাধারণত ৭০-৮০%)

P রোপণযোগ্য চারা (সাধারণত ৮৫%) W= প্রতি কেজিতে বীজের পরিমাণ

(খ) কলমের সাহায্যে চারা উৎপাদন

সাধারণত বীজ দ্বারা সকল উদ্ভিদের উৎপাদিত চারা অনেক সময় গুণগতভাবে মাতৃগাছের অনুরূপ হয় না। এসব ক্ষেত্রে গাছের অঙ্গজ অংশ যেমন- মূল, কান্ড, পাতা, কুড়ি ইত্যাদি ব্যবহার করে চারা তৈরির পদ্ধতিকে কাজে লাগানো হয়। মূল, কান্ড, পাতা কুঁড়ি ইত্যাদির সাহায্যে চারা তৈরির পদ্ধতিকে কলম বা অঙ্গজ বংশবির বলে।

পাথরকুচির পাতা থেকে নতুন চারা গাছ জন্মানো কিংবা বিভিন্ন উদ্ভিদের কচি ডাল বা শাখা মাটিতে রোপণ করে নতুন গাছ উৎপাদনের পদ্ধতি সম্পর্কে আমরা সবাই কম-বেশি জানি। এসবই হলো কলমের সাহায্যে চারা উৎপাদন। প্রধানত পাঁচ ভাগে কলমের চারা উৎপাদন কর না। যথা-

১. কর্তন বা ছেদ কলম এক্ষেত্রে সরাসরি কচি ডাল কেটে মাটিতে লাগিয়ে চারা তৈরি করা হয়। যেমন- সজিনা, শিমুল, লেবু, ডালিয়া, গাদা ইত্যাদি।

২. দাবা কলম এক্ষেত্রে গাছের শাখার খানিক মাটিতে চাপা দিয়ে তাতে মূল গজিয়ে মাতৃগাছ থেকে আলাদা করা হয়। যেমন লেবু, পেয়ারা, লিচু, সফেদা ইত্যাদি।

 

নার্সারিতে চারা উৎপাদন পদ্ধতি

 

৩. গুটি কলম নির্বাচিত গাছের ডালের ৩-৪ সে.মি. পরিমাণ অংশের ছাল তুলে গোবর মিশ্রিত মাটি দিয়ে গুটি তৈরি করে চট দিয়ে আটকে দিতে হয়। বর্ষাকালে সাধারণত লিচু, ডালিম, লেবু, আম, পেয়ারা, জামরুল ইত্যাদিকে এ ধরনের কলম করে চারা তৈরি করা হয়।

 

নার্সারিতে চারা উৎপাদন পদ্ধতি

 

8. জোড় কলম এক্ষেত্রে একই জাতের দুটি গাছের কাণ্ডকে পরিমিত চেঁছে একত্রে বেঁধে দিলে ২-৩ মাসের মধ্যে জোড়া লেগে যায়। অতঃপর কাঙ্ক্ষিত গাছের অন্যটির নিচের অংশ কেটে আলনা করে কলমের চারা পাওয়া যায়। আমের ক্ষেত্রে জোড় কলম উত্তম। এছাড়া সফেদা, লেবু, লিচু, আঙ্গুর, পেয়ারা প্রভৃতি গাছে এ জাতীয় কলম তৈরি হয় করা যায়।

 

নার্সারিতে চারা উৎপাদন পদ্ধতি

 

৫. চোখ কলম পাতা বা ডালের সংযোগ স্থানের কুড়িকে বিশেষ পদ্ধতিতে অন্য উদ্ভিদে স্থানান্তরিত করাকে চোখ কলম বলে। গোলাপ, লেবু, কুল প্রভৃতি উদ্ভিদে এ কলম ব্যবহৃত হ্যাঁ। কূলের ক্ষেত্রে টক কুল গাছকে চোখ কলমের সাহায্যে মিষ্টি কুলে রূপান্তরিত করা যায়।

কলমের চারাতে মাতৃগাছের গুণাগুণ থাকে। এছাড়া টিসুকালচার পদ্ধতিতেও উদ্ভিদের চারা তৈরি করা যায়। উদ্ভিদের বর্ধিষ্ণু কোষ কলাকে বিশেষ কৌশল নির্ধারিত মাধ্যমে সুনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ লালন-পালন করলে তা থেকে নতুন চারা উৎপন্ন হয়। তবে সকল ধরনের কলমের চারা তৈরিতেই খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি হবে।

সারমর্ম

নার্সারিতে প্রধানত বীজ এবং কলমের সাহায্যে চারা উৎপাদন করা হয়। বনজ বৃক্ষের চারা প্রধাণত বীজ থেকে এবং ফুল ও ফলের চারা কলমের সাহায্যে উৎপাদন করা হয়। বীজের চারার প্রধান মূল অক্ষত থাকে কিন্তু কলমের চারায় মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ
থাকে।

Leave a Comment