ব্যবহারিক : বাঁশ ও কাঠ পরিশোধন ( ট্রিটমেন্ট)

বাঁশ ও কাঠ বাংলাদেশের গ্রামীণ ও আধুনিক নির্মাণ, আসবাব, বেড়া, সেতু, ঘর, এবং কৃষি কাজে অন্যতম প্রধান উপাদান। তবে এগুলো প্রাকৃতিক অবস্থায় আর্দ্রতা, কীটপতঙ্গ ও ছত্রাকের আক্রমণে দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।

সিজনিং (Seasoning) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাঠ ও বাঁশের জলীয় অংশ শুকিয়ে স্থায়িত্ব কিছুটা বাড়ানো যায়, কিন্তু শুধুমাত্র সিজনিং যথেষ্ট নয় — মাটি, পানি ও পোকামাকড়ের সংস্পর্শে এরা পুনরায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই কাঠ ও বাঁশকে আরও টেকসই করতে হয় রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা পরিশোধন (Treatment)

ব্যবহারিক:বাঁশ ও কাঠ পরিশোধন ( ট্রিটমেন্ট)

 

পাঠের উদ্দেশ্য

এই পাঠ শেষে আপনি সক্ষম হবেন—

  • সিজনিং করা বাঁশ ও কাঠের স্থায়িত্ব বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে,
  • বিভিন্ন রাসায়নিক ট্রিটমেন্ট (বিশেষ করে CCB ব্যবহার) পদ্ধতি বর্ণনা করতে,
  • ট্রিটমেন্ট প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় উপকরণ, দ্রবণ তৈরি ও ব্যবহারকাল নির্ধারণ করতে।

 

প্রয়োজনীয় উপকরণ

  • পুকুর, ডোবা বা চৌবাচ্চা (ডুবানোর জন্য)
  • রাসায়নিক পদার্থ: CCB (Copper–Chromium–Boron compound)
  • চাপ যন্ত্র (Pressure Treatment Unit) — প্রাণরস বিচ্যুত পদ্ধতির জন্য
  • পরিমাপক যন্ত্র, বালতি, মিশ্রণ পাত্র ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম (গ্লাভস, চশমা, এপ্রন)

 

CCB ট্রিটমেন্ট কী?

CCB (Copper–Chromium–Boron) হলো এক ধরনের সংরক্ষণকারী রাসায়নিক মিশ্রণ,
যা কাঠ ও বাঁশের কোষের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ছত্রাক, উই, ঘুণপোকা ও ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি রোধ করে।

CCB–এর প্রধান উপাদান:

  • Copper (তামা): ছত্রাকনাশক
  • Chromium (ক্রোমিয়াম): কাঠের মধ্যে রাসায়নিক বন্ধন তৈরি করে স্থায়িত্ব বাড়ায়
  • Boron (বোরন): কীটনাশক, বিশেষ করে বাঁশের ক্ষেত্রে কার্যকর

 

বাঁশ ও কাঠ পরিশোধনের প্রধান পদ্ধতি

দুটি জনপ্রিয় পদ্ধতিতে CCB কাঠ বা বাঁশের মধ্যে প্রবেশ করানো হয়:

  • প্রাণরস বিচ্যুত পদ্ধতি (Sap Displacement Method)
  • চুবানো পদ্ধতি (Dipping or Soaking Method)

 

প্রাণরস বিচ্যুত পদ্ধতি (Sap Displacement Method)

পদ্ধতির মূলনীতি:

বাঁশ বা কাঠের ভেতরের প্রাকৃতিক রস বা জলীয় অংশকে CCB দ্রবণ দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়।
ফলে কাঠ বা বাঁশের কোষভাগে সংরক্ষণকারী রাসায়নিক প্রবেশ করে এবং পচন-উই প্রতিরোধে স্থায়ী প্রভাব ফেলে।

দ্রবণ প্রস্তুতি:

  • ১০ লিটার পরিষ্কার পানিতে ২ কেজি CCB পাউডার মিশিয়ে দ্রবণ তৈরি করতে হবে।
  • ঘনমাত্রা হবে ২০% CCB Solution
  • মিশ্রণটি ভালোভাবে নাড়া দিতে হবে যাতে পুরোপুরি দ্রবীভূত হয়।

প্রক্রিয়া:

  • CCB দ্রবণ বিশেষ চাপ যন্ত্রে (Pressure Apparatus) ভরে
    বাঁশ বা কাঠের কোষের মধ্যে জোরপূর্বক প্রবেশ করানো হয়।
  • এ প্রক্রিয়ায় বাঁশের ভেতরের প্রাণরস বা জলীয় অংশ বাইরে চলে আসে
    এবং তার স্থলে CCB দ্রবণ প্রবেশ করে।
  • ফলে কাঠ বা বাঁশের স্থায়িত্ব ২–৩ গুণ বৃদ্ধি পায়।

সুবিধা:

  • গভীরভাবে রাসায়নিক প্রবেশ করে,
  • দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব (১০–১৫ বছর পর্যন্ত),
  • আর্দ্রতা ও পোকা প্রতিরোধে কার্যকর।

 

ব্যবহারিক:বাঁশ ও কাঠ পরিশোধন ( ট্রিটমেন্ট)

 

চুবানো পদ্ধতি (Soaking or Dipping Method)

পদ্ধতির মূলনীতি:

নির্দিষ্ট পরিমাণ CCB দ্রবণে বাঁশ বা কাঠকে নির্দিষ্ট সময় ডুবিয়ে রেখে
রাসায়নিক পদার্থকে ধীরে ধীরে কাঠের আঁশের ভেতর প্রবেশ করানো হয়।

দ্রবণ প্রস্তুতি:

  • ১০ লিটার পানিতে ১ কেজি CCB পাউডার মিশিয়ে ১০% ঘনমাত্রা দ্রবণ তৈরি করতে হবে।

প্রক্রিয়া:

  1. একটি চৌবাচ্চা বা বড় ট্যাঙ্কে CCB দ্রবণ তৈরি করুন।

  2. শুকনো ও পরিষ্কার বাঁশ, তক্তা, ছন বা কাঠের টুকরা সম্পূর্ণভাবে ডুবিয়ে রাখুন।

  3. নির্দিষ্ট সময় শেষে তুলে ছায়াযুক্ত স্থানে শুকিয়ে নিন।

 

 

CCB দ্রবণে ডুবিয়ে রাখার সময়সীমা

দ্রব্যের নামডুবিয়ে রাখার সময়দ্রবণের ঘনমাত্রা
কাঠ২–৪ দিন১০%
বাঁশের খণ্ড১৪–২১ দিন১০%
বাঁশের বেড়া১ দিন১০%
ছন১২ ঘণ্টা৩–৪%

অতিরিক্ত টিপস:

  • ছনের ক্ষেত্রে কম ঘনমাত্রার (৩–৪%) দ্রবণ যথেষ্ট।

  • বাঁশ পানিতে ভিজিয়ে রাখলেও কিছুটা সংরক্ষণ হয়,
    তবে CCB ট্রিটমেন্টের মতো কার্যকর নয়।

 

ব্যবহারিক:বাঁশ ও কাঠ পরিশোধন ( ট্রিটমেন্ট)

 

 

সিজনিং ও ট্রিটমেন্টের সমন্বিত সুবিধা

ধাপকাজউদ্দেশ্য
সিজনিং (Seasoning)কাঠ বা বাঁশের জলীয় অংশ অপসারণফাটল কমানো, শক্তি বৃদ্ধি
ট্রিটমেন্ট (Treatment)CCB দ্বারা রাসায়নিক সুরক্ষাউই, ছত্রাক, আর্দ্রতা প্রতিরোধ

 

দুই প্রক্রিয়া একত্রে প্রয়োগ করলে স্থায়িত্ব ৩–৪ গুণ বৃদ্ধি পায়। যথাযথভাবে সংরক্ষিত বাঁশ ও কাঠ ১০–১৫ বছর পর্যন্ত অক্ষত থাকে।

সতর্কতা ও নিরাপত্তা নির্দেশনা

  • কাজের সময় গ্লাভস, এপ্রন ও চোখের চশমা ব্যবহার করুন।
  • CCB দ্রবণ ত্বক বা চোখে লাগলে সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
  • খাদ্যদ্রব্য বা পানির কাছাকাছি দ্রবণ তৈরি করবেন না।
  • ব্যবহারের পর বর্জ্য দ্রবণ মাটি বা নদীতে ফেলবেন না; নির্দিষ্ট স্থানে নষ্ট করুন।

 

অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব

  • বাঁশ ও কাঠ বাংলাদেশের গৃহনির্মাণ, আসবাবপত্র ও কৃষিকাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
  • অপরিশোধিত বাঁশ ২–৩ বছরেই নষ্ট হয়ে যায়, কিন্তু ট্রিটমেন্ট করা বাঁশ ১০–১৫ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে।
  • এতে বাঁশের অপচয় কমে, বনসম্পদ সংরক্ষিত হয় এবং স্থানীয় অর্থনীতি লাভবান হয়।
  • এই প্রক্রিয়া গ্রামীণ কারিগর, কাঠশিল্পী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সহজ প্রযুক্তি।

 

সারমর্ম

  • বাঁশ ও কাঠ সিজনিং করার পরও পানি ও মাটির সংস্পর্শে নষ্ট হয়।
  • তাই স্থায়িত্ব বাড়াতে CCB ট্রিটমেন্ট অপরিহার্য।
  • ট্রিটমেন্টের দুটি প্রধান পদ্ধতি হলো:
    ১️⃣ প্রাণরস বিচ্যুত পদ্ধতি (Sap Displacement)
    ২️⃣ চুবানো পদ্ধতি (Soaking)
  • সিজনিং ও ট্রিটমেন্ট একসঙ্গে করলে বাঁশ ও কাঠের আয়ু ৩–৪ গুণ বৃদ্ধি পায়।
  • সঠিক ট্রিটমেন্ট অপচয় রোধ করে, সম্পদ রক্ষা করে এবং আর্থিকভাবে লাভজনক ফল দেয়।

 

“বাঁশ ও কাঠ প্রকৃতির অমূল্য দান — সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে এ সম্পদ আমাদের বহু বছর সেবা দিতে পারে।” সিজনিং ও রাসায়নিক ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে শুধু কাঠের স্থায়িত্ব নয়, আমরা সংরক্ষণ করি পরিবেশ, অর্থনীতি ও প্রজন্মের সম্পদ।

Leave a Comment