উপকূলীয় বনায়ন

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় উপকূলীয় বনায়ন – যা বনায়ন এর অন্তর্ভুক্ত। উপকূলীয় বনায়নের ধারণা:  বাংলাদেশ বিশ্বেও সর্বপ্রথম সফল উপকূলীয় বনায়নকারী দেশ। উপকূলীয় জনগণের আরও অধিক সুরক্ষা প্রদানে জন্য বাংলাদেশ বন বিভাগ উপকূলীয় অঞ্চলে জেগে ওঠা নতুন চরে ১৯৬৬ সাল থেকে ম্যানগ্রোভ বনায়ন শুরু করে।

বন বিভাগ কর্তৃক উপকূলীয় বনায়নের সফলতা প্রত্যক্ষ করে সরকার উপকূলীয় ১২ লক্ষ ৩৬ হাজার একর (প্রায় ৫ লক্ষ হেক্টর) এলাকা বনায়নের লক্ষ্যে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় এর নিকট হস্তান্তর ও বন আইনের ৪ ধারায় সংরক্ষিত ঘোষণা করেছেন।

বন বিভাগ ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় ২ লক্ষ হেক্টর (প্রায় ৫ লক্ষ একর) চরাঞ্চলে বনায়নের মাধ্যমে নয়নাভিরাম উপকূলীয় বা প্রতিষ্ঠা করেছে এবং এটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ উপকূলীয় বনায়ন কার্যক্রম ।

উপকূলীয় বনায়নের ফলে, হাজার হাজার হেক্টর জমি চাষাবাদ এবং বসবাসের জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে ১১২০৬৩ একর (প্রায় ৪৫,৩৭০ হেক্টর) জমি ফসল উৎপাদনের জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়কে হস্তান্তর করা হয়েছে। আরও প্রায় ৫০ হাজার এক (প্রায় ২০২৪৩০ হেক্টর) বনায়নকৃত ভূমি, ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করার অপেক্ষায় আছে।

তাছাড়াও ম্যানগ্রোভ বনায়নের পাশাপাশি উপকূলীয় জেলাসমূহে নন-ম্যানগ্রোভ ৮৮৬০ হেক্টর, গোলপাতা ৩১৯০ হেক্টর, নারিকেল ১০ হেক্টর, এরিকা ৪০ হেক্টর, বাঁশ ও বেত ২৮০ হেক্টর, রাস্তার ধারে ৪৮৫০ হেক্টর (রূপান্তরিত) বনায়ন করা হয়েছে।

সর্বোপরি, সবুজ বেষ্টনী হিসাবে, উপকূলীয় বা প্রত্যক্ষভাবে ঘূর্ণিঝড় এবং জলোচ্ছ্বাস সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে লক্ষ লক্ষ জীবন এবং সম্পদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে বাঁচায়। এছাড়াও, উপকূলীয় বনায়ন নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও ভোলা উপকূলীয় জেলায় একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে ।

অবস্থান: নোয়াখালী, লক্ষীপুর, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, পিরোজপুর, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এলাকা । উপকূলীয় এলাকায় জেগে উঠা চর ভূমিতে ১৯৬৫ সাল থেকে এ বন সৃষ্টি করা হচ্ছে। এ কনকে প্যার বনও বলা হয়। এ বন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা হতে উপকূলীয় এলাকার জান-মাল রক্ষা করে। বাংলাদেশের উপকূলীয় বনাঞ্চল আছে এমন জেলার সংখ্যা ১৯টি ।

উপকূলীয় বনায়ন

পরিমাণ :প্রায় ১,৯৬,০০০ হেক্টর যা দেশের আয়তনের ১.৩৬% এবং বন অধিদপ্তর নিয়ন্ত্রিত বনভূমির ১২.৫০% ।

উদ্ভিদ প্রজাতি: কেওড়া, ছৈলা, বাইন, গোলপাতা ইত্যাদি। প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বনের মত এ বা জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত হয়।

বন্যপ্রাণী: হরিণ, মেছোবাঘ, শিয়াল ইত্যাদি ।

বনের পাখি: কালালেজ জৌরাণী, দেশি গামা, কালামাথা কাস্তেচরা, খয়রাপাখ মাছরাঙা ইত্যাদি ।

মাছ: এ বন উপকূলীয় মৎস্য ভান্ডারেরও একটি বিরাট উৎস। ভেটকি, পারসে, গলদা, বাগদা ইত্যাদি।

 

উপকূলীয় বনায়ন
চিত্র: ১২.৮.১: উপকূলীয় বনায়ন

 

উপকূলীয় বনায়নের উপযোগিতা

উপকূলীয় বনায়নের মাধ্যমে সবুজ বেষ্টনী তৈরি ও তা সংরক্ষণ করা গেলে বহুবিধ উপকার সাধিত হবে। উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষা ভূমির উর্বরতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোন ও টর্নেডোর প্রকোপ থেকে উপকূলীয় অঞ্চল রক্ষা করা।

জ্বালানি ও খাদ্যের চাহিদা মোটানো, অর্থ উপার্জন, ভূমিক্ষয় রোধ ইত্যাদি প্রয়োজনের উপকূলীয় বনায়ন সৃষ্টি ও তা রক্ষণাবেক্ষণ করা একান্ত অপিহার্য। পৃথিবী বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ বন হিসাবে খ্যাত এ সুন্দরবনকে রক্ষা করতে উপকূলীয় সাভানা বেষ্টনী সৃষ্টির কোনো বিকল্প নেই উপকূলীয় বনাঞ্চলের উপযোগিতা সমূহ বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে নিম্নরূপ উপায়ে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে।

ক. পরিবেশগত উপযোগিতা

১। ভূমির লবণাক্ততা হ্রাস করে পরিবেশ জীবকূলের বাস উপযোগী করতে সাহায্য করে ।

২। এ বনাঞ্চলের বৃক্ষরাজি উপকূল অঞ্চলের ভূমিক্ষয় রোধ করে। ভূমির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। ভূ-নিম্নস্থ পানির স্তরবৃদ্ধি করে।

৩। উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী উপকূলীয় অঞ্চলে সৃষ্টি সামুদ্রিক ঝড়, জলোচ্ছাস ও সাইক্লোনের কবল থেকে মানুষ ও জীবজন্ত্রকে রক্ষ করে

৪। এ বনাঞ্চল মানুষ, পাখি, জীবজন্ত ও পোকা-মাকড়ের নিরাপদ আবাস তৈরি ও রক্ষা করে এবং খাদ্যের যোগান দেয় ।

৫। ফলে অত্র এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় থাকে। Q. ভূমিধস ও কড়রোধ করে এবং বৃষ্টিপাত হতে সহায়তা করে।

৬। উকূলীয় বনায়ন আমাদের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদক সুন্দরবন ও এর জীবজন্তুতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৭। পরিবেশের অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ভারসাম্য বজায় রাখে, উত্তাপ সৃষ্টি রোধ করে এবং বাতাস পরিশোধন করে।

 

উপকূলীয় বনায়ন

 

খ. নান্দনিক উপযোগিতা

উপকূলীয় বনায়নের ফলে যে নির্মল সবুজ বেষ্টনী তৈরি হ্যা তার নান্দনিক সৌন্দর্য অভূতপূর্ব। এ সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে দেশ-বিদেশের বহু ভ্রমণ বিলাসী মানুষের সমাগম ঘটে। হরেক রকম পশুপাখির আবাসস্থল তৈরি হয় যা পরিবেশের অসীম উপকার সাধন করে এবং নান্দনিকতায় নবতর সংযোজন ঘটায়।

১। উপকূলীয় বনাঞ্চলে বৃক্ষরাজির অর্থনৈতিক উপযোগিতা অপরিসীম। এ বনাঞ্চলে ভ্রমনকারী দেশে-বিদেশের পর্যটকদের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের পথ সম্প্রসারিত হয়। যার ফলে জাতীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসে।

২।  ফলজ উদ্ভিদ যেমন- নারকেল, খেজুর, তাল, কলা, আম প্রভৃতি থেকে উৎপাদিত ফসল উপকূলীয় মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করে এবং অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটায় ।

৩। বনাঞ্চলে উৎপাদিত মধু ও মোম থেকে অর্থ উপার্জিত হয়। ফল, ফল ও পল-বগুচ্ছ থেকে খাদ্যশস্য, শাকসবজি, পাখির খাদ্য, পশুখাদ্য পাওয়া যায় ।

 

 

সারসংক্ষেপ

বাংলাদেশের উপকূলীয় ১৯টি জেলার মধ্যে সাধারণত উকূলীয় বনাঞ্চল রয়েছে। এটি দেশের দক্ষিনাঞ্চাল, দক্ষিণপূর্বাদল ও দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত।

 

Leave a Comment