কুল (ইংরেজি নাম: Ber বা Indian Jujube, বৈজ্ঞানিক নাম: Ziziphus mauritiana) বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় ফলজাত উদ্ভিদ।
স্বাদে মিষ্টি, পুষ্টিগুণে ভরপুর এবং সহজ চাষযোগ্য হওয়ায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কুল চাষ ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
বাংলাদেশে কুলকে অনেক সময় “গরীবের আপেল” বলা হয়, কারণ এটি সুলভমূল্যের হলেও এতে প্রচুর ভিটামিন ও খনিজ উপাদান বিদ্যমান।
কুলে রয়েছে—
- ভিটামিন A (দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক)
- ভিটামিন C (রোগপ্রতিরোধে কার্যকর)
- ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, আয়রনসহ অন্যান্য খনিজ লবণ
কুলের ফুল পেটের গ্যাস নিরাময়ে ও রুচিবর্ধক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর পাতা ক্ষত নিরাময়ে উপকারী, এবং ফল কাঁচা বা পাকা দুইভাবেই খাওয়া যায়। এছাড়া কুল দিয়ে আচার, চাটনি ও শুকনো কুল (ড্রাই জুজুব) তৈরি করা হয়, যা বাণিজ্যিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক।
বাংলাদেশের বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, কুমিল্লা, সাতক্ষীরা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে উৎকৃষ্ট মানের কুল চাষ হয়ে থাকে।
এই পাঠটি “উদ্যান ফসল” বিষয়ের, ৮ নং ইউনিটের ৮.২ নং পাঠ।
Table of Contents
কুল চাষ
জাত পরিচিতি (Varieties of Jujube)
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARC) এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের উদ্ভাবিত কিছু উৎকৃষ্ট জাত নিচে দেওয়া হলো—
🔹 বারি কুল জাতসমূহ:
- বারি কুল-১ (BAU Kul-1): মাঝারি আকারের ফল, টক-মিষ্টি স্বাদ, বাজারে জনপ্রিয়।
- বারি কুল-২: গোলাকার ফল, রসালো ও মিষ্টি, টেবিল ফ্রুট হিসেবে উপযুক্ত।
- বারি কুল-৩: বড় আকারের ফল, সংরক্ষণযোগ্য।
- বারি কুল-৪: খরা সহনশীল জাত, শুষ্ক অঞ্চলে উপযোগী।
🔹 বাউ কুল জাতসমূহ (বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়):
বাউ কুল-১, বাউ কুল-২, বাউ কুল-৩ — উচ্চফলনশীল, রোগ প্রতিরোধী ও স্বাদে উৎকৃষ্ট।
🔹 অন্যান্য জনপ্রিয় জাত:
- আপেল কুল (Apple Kul): বড়, মসৃণ ও আপেলের মতো খোসা; রসালো ও মিষ্টি।
- নারিকেলী কুল: শক্ত খোসা ও দীর্ঘ সংরক্ষণযোগ্যতা।
জলবায়ু ও মাটি (Climate and Soil)
কুল গাছ উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়ায় ভালো জন্মে।
অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় ফলন কমে যায় এবং রোগবালাই বাড়ে।
- তাপমাত্রা: ২৫°–৩০°C সবচেয়ে উপযোগী।
- বৃষ্টিপাত: ৭৫০–১২০০ মিমি।
- মাটি: উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমির দো–আঁশ মাটি কুল চাষের জন্য আদর্শ।
- pH মান: ৫.৫–৭.৫ এর মধ্যে হলে সবচেয়ে ভালো।
তবে কুল এমন একটি ফল, যা প্রায় সব ধরনের মাটিতেই কিছুটা ফলন দিতে সক্ষম, যদি পানি নিষ্কাশন ভালো থাকে।
বংশবিস্তার পদ্ধতি (Propagation Methods)
কুল গাছের বংশবিস্তার দুইভাবে করা যায়—
- বীজের মাধ্যমে (Seed propagation)
- কলমের মাধ্যমে (Vegetative propagation)
বীজের মাধ্যমে:
- সহজ পদ্ধতি হলেও চারা থেকে ফল আসতে সময় বেশি লাগে (৩–৫ বছর)।
- মাতৃগাছের গুণাবলি নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
কলমের মাধ্যমে (Budding or Grafting):
- উন্নত জাতের বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে।
- ২–৩ বছরের মধ্যেই ফল আসে।
- সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি হলো রিং বাডিং বা টি-বাডিং (T-Budding)।
এই পদ্ধতিতে স্থানীয় জাতের গাছে উন্নত জাতের কুঁড়ি সংযোজন করে সেটিকে মিষ্টি বা উৎকৃষ্ট জাতে রূপান্তর করা হয়।
জমি ও গর্ত প্রস্তুতি (Land and Pit Preparation)
- জমি ৪–৫ বার চাষ ও মই দিয়ে ঝুরঝুরে করতে হবে।
- দূরত্ব: গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৬–৭ মিটার রাখতে হবে।
- গর্তের মাপ: দৈর্ঘ্য × প্রস্থ × গভীরতা = ১ মিটার × ১ মিটার × ১ মিটার।
সার প্রয়োগ (Per Pit Fertilizer Dose):
প্রতি গর্তে নিম্নলিখিত পরিমাণ সার মিশিয়ে ভরাট করতে হবে—
| সার উপাদান | পরিমাণ |
|---|---|
| পচা গোবর সার | ২৫–৩০ কেজি |
| টিএসপি (TSP) | ২৫০ গ্রাম |
| এমওপি (MOP) | ২৫০ গ্রাম |
| ইউরিয়া | ৩০০ গ্রাম |
গর্ত ভরাট করার পর ১০–১৫ দিন অপেক্ষা করে তাতে কলম বা চারা রোপণ করতে হবে।
ডাল ছাঁটাই (Pruning)
কুল গাছে ফুল ও ফল আসে নতুন ডালে, তাই প্রতি বছর ফল সংগ্রহের পর ডাল ছাঁটাই করা আবশ্যক।
ছাঁটাইয়ের উদ্দেশ্য:
- নতুন ডাল গজানো ও বেশি ফুল ধারণে সহায়তা করে।
- গাছের ঘনত্ব কমায়, আলো ও বায়ু চলাচল বৃদ্ধি পায়।
- রোগ-পোকার আক্রমণ হ্রাস পায়।
ফল আসার আগে দুর্বল, রোগাক্রান্ত ও অতিরিক্ত ঘন ডাল কেটে ফেলতে হবে।
পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন (Pest and Disease Management)
১️⃣ ফলছিদ্রকারী পোকা:
ফলের ভিতরে গর্ত করে শাঁস খায়, ফলে ফল নষ্ট হয়।
নিয়ন্ত্রণ: প্রতি ১৫ দিন অন্তর সুমিথিয়ন বা ম্যালাথিয়ন ২ মি.লি./লিটার হারে স্প্রে করতে হবে।
২️⃣ ফলের মাছি (Fruit Fly):
কীড়া ফলের ভিতরে প্রবেশ করে শাঁস খেয়ে ফেলে।
নিয়ন্ত্রণ: প্রতি ১০ লিটার পানিতে ১০–১৫ মি.লি. ডায়াজিনন মিশিয়ে ফল পাকার আগেই স্প্রে করতে হবে।
৩️⃣ বিছা পোকা ও মাকড়:
পাতা মোচড়ানো ও ফলের ক্ষতি করে।
নিয়ন্ত্রণ: সালফারযুক্ত কীটনাশক প্রয়োগ।
৪️⃣ পাউডারি মিলডিউ রোগ:
পাতা, ফুল ও কচি ফলের ওপর সাদা পাউডারের মতো স্তর পড়ে; ফল ঝরে যায়।
নিয়ন্ত্রণ: বর্দো মিশ্রণ (Bordeaux Mixture) বা সালফার স্প্রে করলে কার্যকর।
৫️⃣ ফলের পচন রোগ:
ফলে বাদামি দাগ পড়ে ও পচে যায়।
নিয়ন্ত্রণ: ডাইথেন এম–৪৫ (Dithane M-45) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে স্প্রে করতে হবে।
ফল সংগ্রহ (Harvesting)
- কলমের গাছে রোপণের ২–৩ বছরের মধ্যেই ফলন শুরু হয়।
- সেপ্টেম্বর–অক্টোবর মাসে ফুল আসে এবং ৩–৪ মাসের মধ্যেই ফল পরিপক্ব হয়।
- ফল হালকা হলুদ বা হালকা বাদামী হলে তা সংগ্রহযোগ্য।
- ডাল ঝাঁকিয়ে নিচে বিছানো জালে ফল সংগ্রহ করা হয়।
ফলন:
একটি পূর্ণবয়স্ক গাছ থেকে বছরে ১৫০–২০০ কেজি ফল পাওয়া যায়, যা একটি লাভজনক ফসল হিসেবে কুল চাষকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
অর্থনৈতিক গুরুত্ব (Economic Importance)
- প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ২৫–৩০টি গাছ লাগানো যায়।
- বছরে প্রায় ৩–৪ টন ফল উৎপাদন সম্ভব।
- বাজারমূল্য ও চাহিদা অনুযায়ী কুল একটি উচ্চলাভজনক বাণিজ্যিক ফল।
- কুল আচার ও প্রক্রিয়াজাত শিল্পের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।
সারমর্ম (Summary)
- কুল একটি উচ্চফলনশীল ও পুষ্টিকর ফল।
- দো–আঁশ মাটি ও উষ্ণ শুষ্ক আবহাওয়া কুল চাষের জন্য সর্বোত্তম।
- কলম পদ্ধতি (বিশেষত টি-বাডিং) সর্বাধিক কার্যকর বংশবিস্তার পদ্ধতি।
- নিয়মিত ডাল ছাঁটাই, কীটনাশক স্প্রে ও সঠিক সার প্রয়োগে ফলন বৃদ্ধি পায়।
- কলমের গাছে ২–৩ বছরেই ফল আসে এবং প্রতি গাছে ১৫০ কেজি পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়।
