গাছপালা ও জীবজন্তুর উপর জলবায়ুর প্রভাব

গাছপালা ও জীবজন্তুর উপর জলবায়ুর প্রভাব – কৃষি পরিচিতি ও পরিবেশ বিষয়ের একটি পাঠ। এই পাঠটি ১ নং ইউনিটের ১.৩ নং পাঠ। জলবায়ুর উপর নির্ভর করে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ধরণের উদ্ভিদ জন্মে এবং বিভিন্ন জীবজন্তু বাস করে। কোন জীব এককভাবে প্রকৃতিতে থাকতে পারেনা। সাধারণত বিভিন্ন গোত্রের জীবসমূহ সমষ্টিগতভাবে একস্থানে বাস করে। বেশির ভাগ জীব সম্প্রদায় উদ্ভিদ ও প্রাণীর সমষ্টি দ্বারা গঠিত। একেক অঞ্চলে একেক ধরণের গাছপালা ও জীবজন্তু পরিলক্ষিত হয় যা ঐ অঞ্চলের পরিবেশতন্ত্র বা ইকোসিষ্টেমের উপর নির্ভরশীল।

 

গাছপালা ও জীবজন্তুর উপর জলবায়ুর প্রভাব

 

গাছপালা ও জীবজন্তুর উপর জলবায়ুর প্রভাব

 

বাংলাদেশের জলবায়ুর বৈচিত্র ও উদ্ভিদ ধরণের উপর নির্ভর করে একে নিম্নলিখিতভাবে ভাগ করা যেতে পারে।

১। গঙ্গা নদীর বিস্তীর্ণ সমভূমি অঞ্চল

২। চিরহরিৎ পত্রঝরা অরণাঞ্চল

৩। পত্রঝরা অরণ্যাঞ্চল

৪। ম্যানগ্রোভ অরণ্যাঞ্চল

গাছপালা ও জীবজন্তুর উপর জলবায়ুর প্রভাব , কৃষি পরিচিতি ও পরিবেশ

 

গঙ্গানদীর বিস্তীর্ণ সমভূমি অঞ্চল

দেশের প বার্ঞ্চলের কিছু অনুচ্চ পাহাড় ও টিলা ব্যতিত প্রায় সমগ্র বাংলাদেশই একটি বিস্তীর্ণ সমভূমি। দেশের পূবার্ঞ্চলের কিছু অনুচ্চ পাহাড় ও টিলা ব্যতিত প্রায় সমগ্র বাংলাদেশই একটি বিস্তীর্ণ সমভূমি। বিভিন্ন নদ—নদী ও এদের শাখা প্রশাখা জালের মত সমগ্র দেশে ছড়িয়ে আছে। দেশের সমভূমি অঞ্চল এসব নদী ও শাখা নদী বিধৌত পলি দ্বারা গঠিত। এ অঞ্চলের উদ্ভিদসম হকে তিনভাগে করা যায়। যেমন— জলজ উদ্ভিদ, অনাবাদী জমির গাছপালা এবং আবাদী জমির ফসল।

বর্ষাকালে যখন প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় তখন বিল, হাওর ও পুকুরে বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ জন্মে। এরা হলো পাতাশেওলা, পাতাঝাঁঝি, কচুরিপানা, শাপলা, পদ¥, ক্ষুদে পানা, টোপা পানা, গুঁড়িপানা, সিঙ্গারা, ইত্যাদি। হাওর, বিল ও পুকুরের কিনারায় সঁ্যাতসেঁতে মাটিতে নলখাগড়া, কলমী, হেলেঞ্চা, পানি মরিচ, বাত শোলা, ইত্যাদি উদ্ভিদ দেখা যায়। এদের জন্ম ও বংশ বৃদ্ধি এ মৌসুমেই বেশি।

বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, ব্যাঙ, সাপ এসব জলাশয়ে বাস করে। বৃষ্টির পানিতে যখন চারিদিক ভরে যায় তখন এসব প্রাণীরাও বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পরে। এসময়ই এদের প্রজনন সময়। বর্ষাকালে যখন নীচু জমি পানিতে ভরে যায় তখন বিভিন্ন প্রাণী বাড়ীর আশে পাশে উঁচু জায়গায় চলে আসে। শীতকালে এসব হাওরে বিভিন্ন দেশ হ’তে অতিথি পাখিরা এসে ভীড় করে এবং বর্ষা আসার সাথে সাথে এরা চলে যায়।

আবাদযোগ্য জমি ছাড়া বাড়ীর আশে পাশে, রেল লাইন ও রাস্তার পার্শ্বে, নদীর ধার ও অন্যান্য সাধারণ জায়গায় বিভিন্ন ঔষধী, গুল্ম ও অন্যান্য উদ্ভিদ দেখা যায়। এদের জন্ম ও বৃদ্ধি আবহাওয়া দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এসব স্থানে যে সকল উদ্ভিদ জন্মে এগুলো হলো — শ্বেতদ্রোন, ক্রোটন, শাকনটে, কাটানটে, হাতীশুড়, ধুতুরা, পানি মরিচ, শিয়াল মতি, কচু, ঘাঘরা ইত্যাদি। এদের কোনটা খরিপ মৌসুমে আবার কোনটা রবি মৌসুমে জন্মে। এছাড়া কিছু কিছু ফসল উভয় মৌসুমেও চাষ করা হয় এবং নারিকেল, তাল, সুপারি, খেজুর, ইত্যাদি বাড়ীর আশেপাশে বা রাস্তার ধারে দেখা যায়। ছায়া প্রদানকারী বৃক্ষ হিসেবে তেতুল, বট, ইত্যাদি গ্রাম বাংলার হাট বাজারে নজরে পড়ে।

দেশের উত্তর—পশ্চিমাঞ্চলে ক্ষেতের আইলে বা রাস্তার ধারে প্রচুর বাবলা গাছ চোখে পড়ে। উর্বর মাটি ও আবহাওয়া ফসল উৎপাদনের জন্য অনুকূল হওয়ায় সমতলভূমি অঞ্চলে সারা বছরই বিভিন্ন ফসল জন্মে। জলবায়ু ও আবহাওয়ার উপর ভিত্তি করে এখানে বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন ফসল জন্মে থাকে।

কোন কোন ফসল খরিপ মৌসুমে ভাল জন্মে আবার কোনটা শুধু রবি মৌসুমেই হয় আবার কিছু কিছু ফসল উভয় মৌসুমেই জন্মে। বাঁশ, আম, জাম, নারিকেল, আতা, লেবু, কলা, লিচু, বেল, কাঁঠাল, পেয়ারা, জাম্বুরা, ইত্যাদি ফলের গাছ প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই দেখা যায়।

বাড়ীর আশে পাশের ঝোপ বা ঝাড়ে শিয়াল, বেজি, খরগোশ, সাপ, গুইসাপ, কাঠবিড়ালি, বনবিড়াল, খাটাস এবং নানা রকম পাখি দেখা যায়। শীতকালে এরা দূরবতীর্ স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। কিন্তু বর্ষাকালে এরা বাড়ীর আশে—পাশে উঁচু স্থানে চলে আসে। কিছু কিছু প্রাণী যেমন— সাপ, ব্যাঙ প্রভৃতি শীতকালে গর্তে থাকে। তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাত বাড়ার সাথে সাথে তারা গর্ত থেকে বের হয়ে আসে।

 

চিরহরিৎ ও পাতাঝরা বনাঞ্চল

চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট জেলার পাহাড়ী অঞ্চলে অবস্থিত বনাঞ্চল এ অঞ্চলের অন্তর্গত। এ অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। উদ্ভিদের ধরনের উপর ভিত্তিকরে এ এলাকার উদ্ভিদসম হকে চারভাগে ভাগ করা হয়েছে— চিরহরিৎ, পাতাঝরা, বাঁশ ঝাড় ও তৃণ ভূমি। চিরহরিৎ উদ্ভিদের মধ্যে গর্জন, বৈলাম, মেহগিনি, শিরিষ, জারুল,অর্জুন, বট, অশোক, ইত্যাদির বিভিন্ন প্রজাতি বর্তমান। এ ছাড়া বিভিন্ন আরোহী উদ্ভিদের মধ্যে রয়েছে ফার্ণ, মস, অর্কিড, ইত্যাদি।

পাতাঝরা বৃক্ষের মধ্যে রয়েছে সেগুন, চালতা ও গামারি। বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশও এখানে প্রচুর জন্মে। ফাঁকা জায়গায় যেখানে বৃক্ষের সংখ্যা কম সেখানে প্রচুর ঘাস জন্মে। পাহাড়ের ঢালে চা, আনারস ও কলার চাষ করা হয়। পাহাড়ের ফাঁকে ফাঁকে জঙ্গল পরিষ্কার করে উপজাতীয় লোকেরা এখানে ঝুম পদ্ধতিতে জমি চাষ করে। চট্টগ্রামের দক্ষিনাঞ্চলে রাবারের চাষ হয়। বিভিন্ন প্রজাতির বন্য জীবজন্তু এ বনাঞ্চলে বাস করে। এদের মধ্যে বন্যহাতী, শুকর, চিতাবাঘ, গয়াল, বনগরু, বনরুই, সজারু, বানর, হনুমান, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ বিশেষ করে অজগর সাপ প্রধান। ফসল পাকার সময় হাতী, শুকর, বানর, টিয়াপাখি পাহাড়ী জঙ্গল থেকে নেমে এসে ফসলের ক্ষতি করে থাকে।

 

পাতাঝরা বনাঞ্চল

পাতাঝরা বনাঞ্চলের বৃক্ষরাজির মধ্যে শতকরা ৯৮ ভাগই শালগাছ। সমুদ্রের উপকলবর্তী লবণাক্ত মাটি জোয়ার ভাটার কারণে সব সময়ই ভিজা থাকে এবং এখানে যে বিশেষ ধরনের বনাঞ্চল গড়ে উঠেছে তাই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল নামে পরিচিত।

গাছপালা ও জীবজন্তুর উপর জলবায়ুর প্রভাব , কৃষি পরিচিতি ও পরিবেশ
এ বনাঞ্চল দেশের মধ্যবতীর্ ও উত্তরাঞ্চলে অপেক্ষাকৃত কম বৃষ্টিপাত এলাকায় বিক্ষিপ্তভাবে ছড়ানো অবস্থায় আছে। ভাওয়ালের গড়, মধুপুরের গড়, গাড়ো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত বনাঞ্চল, শেরপুরের রাংটিয়া বনাঞ্চল, বরেন্দ্র বনাঞ্চল এবং কুমিল্লার শাল বিহার এ অঞ্চলের অন্তর্গত। এসব বনাঞ্চলের বৃক্ষরাজির মধ্যে শতকরা ৯৮ ভাগই শালগাছ। এসব বনাঞ্চলে বৃষ্টিপাত অপেক্ষাকৃত বেশি।

বিভিন্ন প্রকার জীবজন্তু ও পশুপাখির সমন্বয়ে এসব শালবন গঠিত। শীতকালে এসব বনাঞ্চলে গাছের পাতা ঝরে যায় এবং বসš কালে নতুন পাতা গজাতে শুরু করে। বন্য প্রাণীর মধ্যে বানর, খরগোশ, শিয়াল, বনবিড়াল, খাটাস, বেজি, কাঁঠবিড়ালী, শুকর, বাদুর, গুইসাপ, আঞ্জিনা, দাড়াশ সাপ, গোখরা সাপ, ইত্যাদি দেখা যায়। জঙ্গলের মাঝখানে বাইদে বর্ষাকালে কই, শিং, মাগুর, পঁুটি, লাটা, ডানকানা, টেংরা, বাইম, রাঙা, গুতুম ইত্যাদি মাছ পাওয়া যায়।

 

ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল

সমুদ্রের উপকলবর্তী লবণাক্ত মাটি জোয়ার ভাটার কারণে সব সময়ই ভিজা থাকে এবং এখানে যে বিশেষ ধরনের বনাঞ্চল গড়ে উঠেছে তাই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল নামে পরিচিত। বাংলাদেশের দক্ষিণপশ্চিম অঞ্চলের ২০০০ বর্গমাইল এলাকা নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। এর মধ্যে ৩৫ বর্গমাইল পটুয়াখালী জেলার দক্ষিন—পশ্চিমাঞ্চল ও বাকি অংশ খুলনা জেলার দক্ষিন অঞ্চল নিয়ে গঠিত এবং পূর্বে বালেশ্বর, পশ্চিমে রায় মঙ্গল নদী ও দক্ষিনে বঙ্গোপসাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত। এখানকার জলবায়ু আর্দ্র এবং সর্বদা পানি পায় বলে এ অঞ্চলের গাছপালা চিরহরিৎ।

এ অঞ্চলের বনাঞ্চল সুন্দরবন নামে পরিচিত। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে কম লবনাক্ত এলাকায় সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, গোল—পাতা, হারগোজা, ইত্যাদি বৃক্ষ জন্মে। বেশি লবণাক্ত এলাকায় গেওয়া, গোরান ও ভেনা গাছ ভাল জন্মে।
পৃথিবীর বিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার সুন্দর বনে বাস করে। শীতকালে বাঘ পানি খাবার জন্য নদীর তীর ধরে নিচে নেমে আসে। মধু ও গোলপাতা সংগ্রহের সময় যারা এসময় সুন্দর বনে যায় প্রায়ই তারা বাঘ দ্বারা আক্রান্ত হয়। বানর, হনুমান, চিতাবাঘ, বনগরু, গয়াল, হরিন, শুকর এবং নদীতে কুমির, কচ্ছপ, ইত্যাদি বসবাসের জন্য এখানকার জলবায়ু অত্যন্ত চমৎকার। তাছাড়া সমুদ্র অঞ্চলে তিমি ও সুন্দরবনের অরন্যে ময়ূর বাস করে।

গাছপালা ও জীবজন্তুর উপর জলবায়ুর প্রভাব , কৃষি পরিচিতি ও পরিবেশ

আমাদের দেশে দু’ধরনের পাখি দেখা যায়। কিছু কিছু পাখি এদেশের আবহাওয়া ও জলবায়ুর সাথে মিশে স্থায়ীভাবে বাস করে আবার কিছু পাখি কিছুদিনের জন্য অতিথি হয়ে এদেশে আসে। সাধারণতঃ শীতের প্রারম্ভে এদেশের বড় বড় জলাশয়ে এদের আগমন ন্তু হয় এবং শীত শেষে বষার্র প্রারম্ভে এরা ফিরে যায়। আমাদের দেশের পাখিরা হলো কবুতর, হারকলা, ঘুঘু, টিয়া, ময়না, কোকিল, বউ কথা কও, চাতক, বিভিন্ন প্রজাতির বক, হারগিলা, মাছরাঙ্গা, জল কবুতর, বিভিন্ন প্রজাতির হাঁস, কোরা, ডাহুক, চিল, শকুন, গাংচিল, বনেশ, মাছমরাল, পেঁচা, কাঠ ঠুকরা, বুলবুলি, চড়ূই, কাক, সাতভাই, বাবুই, টুনটুনি, শ্যামা, দোয়েল, ফিঙ্গে ইত্যাদি।

এদের কোনটা বাড়ীতে, কোনটা বাড়ীর আশে—পাশের বাগানে, কোনটা বড় গাছের ডালে কোনটা জঙ্গলে বাস করে। মৌসুম ও আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে সাথে এদের চলাফেরা এবং আচার আচরণেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

জলবায়ু ও আবহাওয়ার উপর নির্ভর করে এদেশের বিভিন্ন স্থানে যেমন বিভিন্ন গাছ পালা জন্মে তেমনি বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন জীবজন্তু ও পশু—পাখির বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। জীব জন্তু যে অঞ্চলে নিরাপদ আশ্রয় ও বসবাসের পরিবেশ ভাল পায় সেখানেই তারা দলবদ্ধভাবে বাস করে। শীতকালে বিভিন্ন জীবজন্তু ও পাখিরা বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে কিন্তু বর্ষাকালে যখন চারিদিকে পানি উঠে তখন তারা বাড়ির আশে—পাশ উঁচু জায়গায় চলে আসে। অনেক প্রজাতির জীবজন্তু বর্ষাকালে স্বচ্ছন্দে চলাফেরা করে অথচ শীতকালে তাদের তেমন দেখা যায় না।

 

 

Leave a Comment