বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ, যেখানে মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতির একটি বড় অংশ সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষির সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করে জমির সঠিক ব্যবহার, মাটির গুণাগুণ এবং উপযুক্ত চাষাবাদ পদ্ধতির ওপর। কৃষি জমির প্রকৃতি, উর্বরতা ও পানিধারণ ক্ষমতা যেমন ভিন্ন ভিন্ন, তেমনি ফসল উৎপাদনের জন্য জমি প্রস্তুতের কৌশলও ভিন্ন হয়ে থাকে। এই জমি প্রস্তুতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ভূমি কর্ষণ। ভূমি কর্ষণের মাধ্যমে মাটিকে ফসল চাষের উপযোগী করে তোলা হয়, যা বীজের অঙ্কুরোদগম, গাছের শিকড় বিস্তার এবং ফলনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
আজকের আলোচনায় আমরা কৃষি জমি ও ভূমি কর্ষণের ধারণা ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানব। বিভিন্ন ধরনের কৃষি জমির বৈশিষ্ট্য, মাটির গঠন ও বুনটভেদে কর্ষণের প্রয়োজনীয়তা, ভূমি কর্ষণের উপকারিতা ও সীমাবদ্ধতা এবং আধুনিক ও টেকসই ভূমি কর্ষণ ধারণা—এসব বিষয় এই আলোচনার অন্তর্ভুক্ত। কৃষি জমির সঠিক ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ভূমি কর্ষণের গুরুত্ব অনুধাবন করাই এই আলোচনার মূল লক্ষ্য।
Table of Contents
কৃষি জমি ও ভূমিকর্ষণের ধারণা ও উদ্দেশ্য

কৃষি জমি ও ভূমি কর্ষণের ধারণা ও উদ্দেশ্য
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এ দেশের মোট জমির পরিমাণ প্রায় ১,৪৭,০৩,০০০ হেক্টর। এর মধ্যে আবাদযোগ্য কৃষি জমির পরিমাণ প্রায় ১,১৪,৯৭,০০০ হেক্টর এবং বর্তমানে আবাদী জমির পরিমাণ প্রায় ১,০৮,৩৩,০০০ হেক্টর। বাংলাদেশের কৃষি জমিকে ভূমির উচ্চতা ও জলাবদ্ধতার ভিত্তিতে উচ্চভূমি, মাঝারি উচ্চভূমি, মধ্যম জমি, মাঝারি নিচু জমি ও নিচু জমি—এই কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। উচ্চভূমি সাধারণত কখনোই প্লাবিত হয় না, অন্যদিকে নিচু জমি বছরের কয়েক মাস পানির নিচে থাকে।
ভূমির এই উচ্চতা ও জলাবদ্ধতার পার্থক্যের কারণে কৃষি জমিতে চাষাবাদের ধরন ভিন্ন হয়ে থাকে। বিভিন্ন কৃষি জমিতে বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদন করা হয় এবং এসব ফসলের পানির চাহিদাও একরকম নয়। ভূমি কর্ষণের মাধ্যমে মাটিতে পানির সংরক্ষণ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। একইভাবে বিভিন্ন ফসলের বীজের আকারও ভিন্ন ভিন্ন—কিছু বীজ খুব ছোট, আবার কিছু বীজ আকারে বড়। বীজের আকার ও প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে জমি কর্ষণের ধরন নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশে বছরে গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ২০৩ সেন্টিমিটার হলেও এই বৃষ্টিপাত সারা বছর বা দেশের সব অঞ্চলে সমানভাবে হয় না। ফলে বছরের বিভিন্ন সময় ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জমির আর্দ্রতার পরিমাণে পার্থক্য দেখা যায়। এ কারণেই বিভিন্ন জমিতে এবং বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার ভূমি কর্ষণের প্রয়োজন হয়।
দেশের সব অঞ্চলের মাটির প্রকৃতি এক রকম নয়। কোথাও বেলে মাটি, কোথাও এঁটেল মাটি, আবার কোথাও দো-আঁশ মাটি দেখা যায়। মাটির অম্লত্ব ও ক্ষারত্বের মাত্রাও অঞ্চলভেদে ভিন্ন। এসব পার্থক্যের কারণে ভূমি কর্ষণ পদ্ধতিও জমিভেদে ভিন্ন হওয়া যুক্তিযুক্ত। তাই বাংলাদেশের কৃষি জমির বৈশিষ্ট্য ও উপযোগী ভূমি কর্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
মাটির বুনট ও গঠনভেদে ভূমি কর্ষণ ফসলের ফলনের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভূমি কর্ষণের ফলে মাটির ভৌত গুণাবলি নষ্ট হয়ে যায়। এ কারণে মাটির গঠন অক্ষুণ্ন রেখে সঠিকভাবে ভূমি কর্ষণ করা উচিত। এই ধারণা থেকেই টেকসই ভূমি কর্ষণ (Sustainable tillage) পদ্ধতির উদ্ভব হয়েছে, যা প্রচলিত কর্ষণ পদ্ধতির তুলনায় অধিক গুরুত্ব পাচ্ছে।
সঠিকভাবে ভূমি কর্ষণ করলে কৃষি জমির বিভিন্ন ভৌত গুণাবলি উন্নত হয়। কিছু কিছু জমিতে সময়বিশেষে বিষাক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারে, যা মাটিতে সৃষ্ট ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থের কারণে হয়। গভীরভাবে জমি চাষ করলে মাটি উলট-পালট হয়ে এসব বিষাক্ত পদার্থ মাটির উপরিভাগে উঠে আসে এবং সূর্যালোক, তাপ ও বায়ুর প্রভাবে বিষক্রিয়া অনেকাংশে দূরীভূত হয়।
চাষের ফলে মাটিতে থাকা অনেক পোকা-মাকড়, তাদের ডিম ও কীড়া উপরিভাগে উঠে এসে ধ্বংস হয়। সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে প্লাবনের ফলে জমিতে লবণাক্ততা দেখা দিলে গভীর চাষ এবং পর্যাপ্ত পানি সরবরাহের মাধ্যমে লবণাক্ত পানি মাটির নিম্নস্তরে চুয়ে যায়, ফলে লবণাক্ততা কমে এবং জমির উন্নয়ন সম্ভব হয়।
মাটির গুণাগুণ অনেকাংশে মাটিতে থাকা জৈব পদার্থের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে। সবুজ সার প্রস্তুতের জন্য জমি গভীরভাবে চাষ করলে সবুজ সার শস্য (Green manuring crop) মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যায় এবং জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। আবার দীর্ঘদিন একইভাবে চাষের ফলে অনেক জমিতে শক্ত লাঙল স্তর (Plough pan) সৃষ্টি হয়, যার কারণে জমিতে পানি জমে থাকে। ভূমি কর্ষণের মাধ্যমে এই লাঙল স্তর ভেঙে জমির উন্নয়ন করা যায়।
ভূমি কর্ষণ বলতে শস্যের বীজ বপন, অঙ্কুরোদগম, চারা রোপণ এবং উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে কৃষিযন্ত্রের সাহায্যে মাটিতে ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক পরিবর্তনের মাধ্যমে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করাকে বোঝায়।
অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে (১৭৩৯ খ্রিস্টাব্দে) ব্রিটিশ কৃষিবিদ জেথ্রো টাল পশুশক্তি ব্যবহার করে লাঙল চালিয়ে উন্নতভাবে জমি চাষের পদ্ধতি উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, ভালোভাবে কর্ষিত জমিতে গাছ শিকড়ের মাধ্যমে মাটির সূক্ষ্ম কণাকে সরাসরি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে এবং তিনি কর্ষণকেই সার হিসেবে উল্লেখ করেন।
পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা লাভ করেন। তারা প্রমাণ করেন যে গাছ মাটির কণাকে সরাসরি খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে না; বরং মাটিতে বিদ্যমান বিভিন্ন মৌলিক উপাদান পানি দ্বারা দ্রবীভূত হয়ে অভিস্রবণ (Osmosis) প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের শিকড়ে পৌঁছে। ভূমি কর্ষণের ফলে শিকড় সহজে মাটির গভীরে প্রবেশ করতে পারে, যার ফলে মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং আগাছা দমন সহজ হয়।
বর্তমানে ন্যূনতম ভূমি কর্ষণ ও সংরক্ষণশীল কর্ষণ পদ্ধতি (Conservation tillage) জনপ্রিয়তা লাভ করছে। ভূমি কর্ষণের পর মাটি যে ভৌত অবস্থায় থাকে তাকে কর্ষাবস্থা (Tilth) বলা হয়, যা মাটির একটি গতিশীল অবস্থা।
যখন মাটিকে বীজের অঙ্কুরোদগম ও ফসল বৃদ্ধির জন্য উপযোগী করে চাষ করা হয়, তখন তাকে বীজতলা (Seed bed) বলা হয় এবং সেই অবস্থাকে ভালো কর্ষাবস্থা বলা হয়। বিভিন্ন ফসলের বীজের জন্য বিভিন্ন ধরনের কর্ষাবস্থা প্রয়োজন হয়। সাধারণভাবে বীজের আকার যত ছোট হয়, কর্ষাবস্থাও তত সূক্ষ্ম হওয়া বাঞ্ছনীয়। যেমন—তামাক ও পেঁয়াজের বীজের জন্য খুব সূক্ষ্ম কর্ষাবস্থা প্রয়োজন, অপরদিকে ভুট্টা ও ছোলার মতো বড় বীজের জন্য মাঝারি কর্ষাবস্থা উপযোগী। তাই কৃষকদের কাছে কর্ষাবস্থাকে ভালো, মাঝারি বা নিম্নমানের কর্ষাবস্থা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

ভাল কর্ষাবস্থার গুণাবলী ( Qualities of good tilth)
(Qualities of Good Tilth)
ভাল কর্ষাবস্থা বলতে এমন একটি মাটির অবস্থা বোঝায়, যেখানে বীজের অঙ্কুরোদগম এবং ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় সব অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান থাকে। একটি জমিতে ভাল কর্ষাবস্থা অর্জনের জন্য নিম্নলিখিত গুণাবলী থাকা বাঞ্ছনীয়—
পর্যাপ্ত আর্দ্রতা
মাটিতে এমন পরিমাণ আর্দ্রতা থাকতে হবে, যা বীজের অঙ্কুরোদগম ও শিকড় বিস্তারের জন্য উপযোগী।পর্যাপ্ত বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা
মাটির কণার মাঝে যথেষ্ট ফাঁকা স্থান থাকতে হবে, যাতে বাতাস সহজে চলাচল করতে পারে এবং শিকড় শ্বাস নিতে পারে।বৃষ্টির পানির দ্রুত অনুপ্রবেশ ক্ষমতা
ভাল কর্ষাবস্থার মাটি বৃষ্টির পানি দ্রুত শোষণ করতে সক্ষম হয়, ফলে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় না।উপযুক্ত মাটির বন্ধুরতা (Structure)
মাটির কণাগুলো এমনভাবে বিন্যস্ত থাকতে হবে, যাতে মাটি অতিরিক্ত শক্ত বা অতিরিক্ত ঢিলা না হয়।
তবে মাটি যদি অতিরিক্ত সূক্ষ্মভাবে কর্ষিত হয় (Fine tilth), তাহলে বৃষ্টির পর শুকিয়ে গিয়ে মাটি পিঠার মতো শক্ত ও বাঁকা হয়ে যায়। এর ফলে পরবর্তীতে ঐ মাটিতে পানি দিলে তা আর সহজে পানি শোষণ করতে পারে না এবং ধীরে ধীরে ফসল চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তাই ফসল উৎপাদনের জন্য অতিরিক্ত সূক্ষ্ম কর্ষণের পরিবর্তে সুষম ও উপযুক্ত কর্ষাবস্থা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভূমি কর্ষণের উদ্দেশ্য
ভূমি কর্ষণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো একটি উত্তম বীজতলা তৈরি করা, আগাছা নিয়ন্ত্রণ করা এবং উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য মাটির ভৌত গুণাবলীর উন্নয়ন সাধন করা। ভূমি কর্ষণের গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যগুলো নিম্নে ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হলো—
১. জমাটবদ্ধ মাটি আলগা করা
প্রাথমিকভাবে শক্ত ও জমাটবদ্ধ চাপা মাটিকে আলগা করে ফসল চাষের উপযোগী করা।
২. মাটিকে ঝুরঝুরা করা
শুকনো জমিতে মাটির ঢেলা ভেঙে ঝুরঝুরা করা, যাতে বীজ মাটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে যেতে পারে। বীজের চারপাশে পর্যাপ্ত বায়ুপূর্ণ ফাঁকা স্থান থাকলে বীজের অঙ্কুরোদগম ভালো হয়।
৩. মাটিকে উপযুক্ত দৃঢ়তা প্রদান
আলগা করা মাটিকে এমন একটি নির্দিষ্ট দৃঢ়তা প্রদান করা, যাতে মাটি, বায়ু ও আর্দ্রতা একটি সুষম অনুপাতে বিদ্যমান থাকে।
৪. আগাছা নিয়ন্ত্রণ
জমিতে বিদ্যমান আগাছা ধ্বংস করা এবং পচনযোগ্য আগাছা মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া।
৫. সার ও জৈব পদার্থ মিশ্রণ
রাসায়নিক সার ও জৈব পদার্থ মাটির সঙ্গে সমভাবে মিশিয়ে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি করা।
৬. ক্ষতিকর উপাদান ও পোকা দমন
জমিতে সৃষ্ট বিভিন্ন ক্ষতিকর বা বিষাক্ত পদার্থ দূর করা এবং পোকা-মাকড় ও তাদের ডিম ধ্বংস করা।
৭. পানির বাষ্পায়ন কমানো
শুকনো জমিতে মাটির কৈশিক নালি (Capillary pore) ভেঙে দিয়ে পানির বাষ্পায়ন হ্রাস করা।
৮. উপকারী জীবাণুর বংশবিস্তার সহজতর করা
মাটিতে বসবাসকারী উপকারী জীবাণুগুলোর বংশবিস্তার ও কার্যক্রমের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা।
৯. ভূমি সমতলকরণ ও ভূমি সংরক্ষণ
ভূমি ক্ষয়রোধের জন্য জমির উপরিভাগ সমান ও সুশৃঙ্খলভাবে প্রস্তুত করা।
