ফসল উৎপাদনের সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করে জমি কতটা সঠিকভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে তার ওপর। এই জমি প্রস্তুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ভূমি কর্ষণ। ভূমি কর্ষণের মাধ্যমে মাটিকে এমন একটি অবস্থায় আনা হয়, যাতে বীজ বপন, চারা রোপণ ও গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়। মাটির ভৌত গঠন, আর্দ্রতার পরিমাণ, কর্ষণের সময়, শ্রমিক ও যন্ত্রপাতির প্রাপ্যতা এবং ভূমির প্রকৃতি বিবেচনা করেই ভূমি কর্ষণের ধরন নির্ধারণ করা হয়।
ভূমি কর্ষণের মূল উদ্দেশ্য হলো মাটিকে আলগা করা, আগাছা দমন করা, মাটির ভেতরে বাতাস ও পানির চলাচল সহজ করা এবং গাছের শিকড় বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা। তবে সব জমি বা সব ফসলের জন্য একই ধরনের কর্ষণ পদ্ধতি উপযোগী নয়। এ কারণেই কৃষিবিজ্ঞানে ভূমি কর্ষণকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে।
Table of Contents
ভূমি কর্ষণের প্রকারভেদ
সাধারণভাবে ভূমি কর্ষণকে দুটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়—
১. প্রাথমিক কর্ষণ (Primary tillage)
২. আন্তঃকর্ষণ বা মাধ্যমিক কর্ষণ (Inter tillage)
প্রাথমিক কর্ষণ (Primary Tillage)
ফসল মাঠ থেকে সংগ্রহ করার পর এবং পরবর্তী ফসলের বীজ বপন বা চারা রোপণের পূর্ব পর্যন্ত যে সমস্ত কর্ষণ কাজ করা হয়, তাকে প্রাথমিক কর্ষণ বলা হয়। একে সাধারণ কর্ষণ বা পূর্ব কর্ষণও বলা হয়ে থাকে। এই কর্ষণের মূল বৈশিষ্ট্য হলো—মাটি তুলনামূলকভাবে গভীরভাবে আলোড়িত করা হয়।
প্রাথমিক কর্ষণের মাধ্যমে জমির শক্ত ও জমাটবদ্ধ মাটি ভেঙে আলগা করা হয়, আগাছা ও পূর্ববর্তী ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটির সঙ্গে মিশে যায় এবং মাটির নিচের স্তর বাতাসের সংস্পর্শে আসে। ফলে মাটির ভৌত গুণাবলি উন্নত হয় এবং পরবর্তী চাষের জন্য জমি উপযোগী হয়ে ওঠে।
এই কর্ষণ কাজে সাধারণত ভারী ও বড় আকারের লাঙল, ডিস্ক প্লাউ বা গভীর কর্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। তবে জমির আকার ছোট হলে বা যেখানে লাঙল ঘোরাতে অসুবিধা হয়, সেখানে বড় আকারের কোদাল ব্যবহার করেও প্রাথমিক কর্ষণ সম্পন্ন করা যায়।
আন্তঃকর্ষণ বা মাধ্যমিক কর্ষণ (Inter Tillage)
বীজ বপন বা চারা রোপণের পর থেকে ফসল সংগ্রহ করা পর্যন্ত যে সমস্ত কর্ষণমূলক কাজ করা হয়, তাকে আন্তঃকর্ষণ বা মাধ্যমিক কর্ষণ বলা হয়। এই কর্ষণের মূল উদ্দেশ্য হলো—গাছের বৃদ্ধি সহায়তা করা এবং জমিকে আগাছামুক্ত রাখা।
আন্তঃকর্ষণের অন্তর্ভুক্ত কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে জমির ঢেলা ভাঙা, মাটি ঝুরঝুরা করা, আগাছা পরিষ্কার করা, আঁচড়া দেওয়া এবং গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দেওয়া (Earthing up)। এসব কাজের ফলে গাছের শিকড় মজবুত হয়, মাটিতে বাতাস চলাচল বৃদ্ধি পায় এবং মাটির আর্দ্রতা সংরক্ষণ সহজ হয়।
এই কর্ষণ সাধারণত হালকা যন্ত্রপাতি বা হাতিয়ার দিয়ে করা হয় এবং এটি বারবার প্রয়োজন অনুযায়ী করা যেতে পারে।
প্রচলিত ও সংরক্ষণশীল ভূমি কর্ষণ পদ্ধতি
ভূমি কর্ষণের পুরোনো ও আধুনিক ধারণার ভিত্তিতে বর্তমানে কৃষিবিজ্ঞানে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমি কর্ষণ পদ্ধতির প্রচলন দেখা যায়। এগুলো হলো—
১. প্রচলিত ভূমি কর্ষণ পদ্ধতি
২. সংরক্ষণশীল ভূমি কর্ষণ পদ্ধতি
প্রচলিত ভূমি কর্ষণ পদ্ধতি (Conventional Tillage)
প্রচলিত ভূমি কর্ষণ পদ্ধতিতে জমিকে বিভিন্ন ধরনের কর্ষণ যন্ত্রপাতির মাধ্যমে বারবার চাষ করা হয়। আমাদের দেশের কৃষি ব্যবস্থায় এই পদ্ধতিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ পদ্ধতিতে সাধারণত লাঙল, মই, কোদাল, ডিস্ক হ্যারো ইত্যাদি যন্ত্র ব্যবহার করে জমিকে ভালোভাবে উল্টে-পাল্টে প্রস্তুত করা হয়।
প্রচলিত ভূমি কর্ষণের প্রধান উদ্দেশ্য হলো জমির মাটি ঝুরঝুরা করা, আগাছা ধ্বংস করা, ফসলের অবশিষ্টাংশ মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া এবং একটি উত্তম বীজতলা তৈরি করা। এই পদ্ধতিতে মাটি তুলনামূলকভাবে বেশি আলোড়িত হওয়ায় বীজ বপন ও চারা রোপণ সহজ হয়।
তবে এই পদ্ধতিতে বারবার চাষ দেওয়ার ফলে মাটির উপরের স্তর অতিরিক্তভাবে আলগা হয়ে যায়, যা অনেক ক্ষেত্রে মাটির গঠন নষ্ট করতে পারে। এছাড়া অতিরিক্ত চাষের কারণে জ্বালানি, শ্রমিক ও যন্ত্রপাতির খরচও বেড়ে যায়। তবুও সহজলভ্যতা ও পরিচিতির কারণে আমাদের দেশে প্রচলিত ভূমি কর্ষণ পদ্ধতি এখনও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সংরক্ষণশীল ভূমি কর্ষণ পদ্ধতি (Conservation Tillage)
সংরক্ষণশীল ভূমি কর্ষণ পদ্ধতি একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি পদ্ধতি, যেখানে মাটিকে যতটা সম্ভব কম আলোড়িত করে ফসল উৎপাদন করা হয়। এই পদ্ধতিতে ন্যূনতম লাঙল চাষ ও সীমিত মই দেওয়ার মাধ্যমে জমি প্রস্তুত করা হয়। মূল লক্ষ্য হলো মাটির প্রাকৃতিক গঠন ও জৈব গুণাগুণ অক্ষুণ্ন রাখা।
এই পদ্ধতিতে আগাছা ও বালাই দমনের জন্য যান্ত্রিক কর্ষণের পরিবর্তে রাসায়নিক পদ্ধতির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিদেশের অনেক দেশে উন্নত যন্ত্রপাতির সাহায্যে সরাসরি বীজ বপন (Direct drilling) বা বাটালি চাষের মাধ্যমে সংরক্ষণশীল ভূমি কর্ষণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
আমাদের দেশে এই পদ্ধতির ব্যবহার এখনও খুবই সীমিত। তবে মাটির ক্ষয় রোধ, জ্বালানি সাশ্রয় এবং দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা রক্ষার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সংরক্ষণশীল ভূমি কর্ষণের সুবিধা ও অসুবিধা
সংরক্ষণশীল ভূমি কর্ষণ পদ্ধতি আধুনিক কৃষি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। মাটিকে অপ্রয়োজনীয়ভাবে না ওলট-পালট করে ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করাই এ পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য। তবে এই পদ্ধতির যেমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা রয়েছে, তেমনি কিছু সীমাবদ্ধতাও বিদ্যমান।
সংরক্ষণশীল ভূমি কর্ষণের সুবিধাসমূহ (Advantages of Conservation Tillage)
১. মাটির গঠন ও জৈব পদার্থ সংরক্ষণ
এই পদ্ধতিতে মাটি কম আলোড়িত হওয়ায় মাটির প্রাকৃতিক গঠন (Structure) অক্ষুণ্ন থাকে। ফলে মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায় এবং মাটির উর্বরতা দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকে।
২. শ্রম, জ্বালানি ও ব্যয় সাশ্রয়
কম সংখ্যক চাষের প্রয়োজন হওয়ায় জ্বালানি, শ্রমিক ও যন্ত্রপাতির ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এতে কৃষকের উৎপাদন খরচ হ্রাস পায়।
৩. মাটিক্ষয় রোধ ও পানি সংরক্ষণ
মাটির উপরিভাগে ফসলের অবশিষ্টাংশ থাকায় বৃষ্টির পানি সরাসরি মাটি ধুয়ে নিয়ে যেতে পারে না। ফলে মাটিক্ষয় কম হয় এবং প্রবহমান পানির গুণগত মান উন্নত হয়।
৪. মাটির পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি
মাটির দানার মধ্যকার ফাঁকগুলো সঠিকভাবে বজায় থাকায় পানি ও বায়ুর ভারসাম্য রক্ষা হয়। এতে গাছ সহজে পানি গ্রহণ করতে পারে এবং খরার সময়ও মাটিতে আর্দ্রতা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
৫. ফলন স্থিতিশীলতা
অনেক ক্ষেত্রে সংরক্ষণশীল ভূমি কর্ষণে ফসলের ফলন প্রচলিত ভূমি কর্ষণের সমপরিমাণ বা কাছাকাছি হয়ে থাকে।
৬. মাটির জৈবিক কার্যকলাপ বৃদ্ধি
এই পদ্ধতিতে অনুজীব, কেঁচো ও অন্যান্য উপকারী জীবের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, যা মাটির জৈবিক অবস্থা উন্নত করে।
সংরক্ষণশীল ভূমি কর্ষণের অসুবিধাসমূহ (Disadvantages of Conservation Tillage)
১. বিশেষ যন্ত্রপাতির প্রয়োজন
এই পদ্ধতিতে অনেক সময় বিশেষ ধরনের কর্ষণ ও বপন যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয়, যা সব কৃষকের জন্য সহজলভ্য নয়।
২. রাসায়নিক আগাছা দমনের উপর নির্ভরতা
যান্ত্রিক কর্ষণ কম হওয়ায় আগাছা দমনে রাসায়নিক আগাছানাশকের ব্যবহার বৃদ্ধি পায়। আগাছানাশক সঠিকভাবে কাজ না করলে আগাছার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যেতে পারে।
৩. সার ও চুন মিশ্রণে সীমাবদ্ধতা
প্রচলিত কর্ষণের তুলনায় এ পদ্ধতিতে চুন, সার ও আগাছানাশক মাটির সঙ্গে ভালোভাবে মিশে যেতে পারে না।
৪. পুষ্টি উপাদানের সহজলভ্যতা হ্রাস
নাইট্রোজেন ও সালফারের মতো কিছু পুষ্টি উপাদানের সহজলভ্যতা কমে যেতে পারে, ফলে অতিরিক্ত সার প্রয়োগের প্রয়োজন হয়।
৫. মাটির pH হ্রাস
দীর্ঘমেয়াদে মাটির অম্লতা বাড়তে পারে, যার জন্য চুন ও জৈব সার প্রয়োগ জরুরি হয়ে পড়ে।
৬. চাষ ও রোপণের সময় বিলম্ব
অনেক ক্ষেত্রে জমি প্রস্তুতের প্রক্রিয়া ধীরগতির হওয়ায় বপন ও রোপণের সময় পিছিয়ে যেতে পারে।
মাটির আর্দ্রতা ও ভূমি কর্ষণের উপযুক্ত সময়
ভূমি কর্ষণের সাফল্য কেবল কর্ষণ পদ্ধতির ওপরই নির্ভর করে না, বরং মাটিতে বিদ্যমান আর্দ্রতার পরিমাণের ওপরও বহুলাংশে নির্ভরশীল। জমিতে সঠিক আর্দ্রতা না থাকলে ভূমি কর্ষণ কার্যকর হয় না এবং ভালো কর্ষাবস্থা সৃষ্টি করা সম্ভব হয় না। তাই মাটির আর্দ্রতা ও ভূমি কর্ষণের সময় সম্পর্কে কৃষকের সুস্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
জমি যদি দীর্ঘদিন চাষবিহীন অবস্থায় থাকে, তবে তার উপরিভাগ শক্ত হয়ে যায়। এর ফলে বৃষ্টির পানি সহজে মাটির ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না এবং অধিকাংশ পানি উপরিভাগ দিয়ে গড়িয়ে যায়। ভূমি কর্ষণের মাধ্যমে মাটির উপরিভাগ আলগা করা হলে বৃষ্টির পানি সহজেই মাটির ভেতরে প্রবেশ করে এবং ধীরে ধীরে মাটি সেই পানি শোষণ করে নিতে পারে। সঠিকভাবে ভূমি কর্ষণ করলে মাটির দানাগুলো সুসংগঠিত হয়ে মাটির গঠন উন্নত হয় এবং মাটির পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
এই সুগঠিত মাটি যেমন পানি ধারণ করতে পারে, তেমনি দানার ফাঁকে ফাঁকে পর্যাপ্ত বায়ুও ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ফসলের শিকড় বৃদ্ধির জন্য মাটির এই আর্দ্রতা ও বায়ুর সুষম উপস্থিতি অত্যাবশ্যক। অতএব, জমির আর্দ্রতা অনুসারে ভূমি কর্ষণের সময় নির্ধারণ করা উচিত।
মাঠ মতা ও ‘জো’ অবস্থা (Field Capacity and Optimum Moisture Condition)
জমি চাষ করার জন্য মাটিতে যে পরিমাণ আর্দ্রতা প্রয়োজন, তাকে কৃষিবিজ্ঞানের ভাষায় ‘জো’ অবস্থা বলা হয়। একে ‘মাঠ মতা’ (Field capacity) নামেও অভিহিত করা হয়। এটি এমন একটি অবস্থা, যখন মাটির সূক্ষ্ম ফাঁকগুলো (Micropores) পানি দ্বারা পূর্ণ থাকে এবং তুলনামূলক বড় ফাঁকগুলো (Macropores) বায়ু দ্বারা পূর্ণ থাকে। এই অবস্থায় মাটি না অতিরিক্ত ভিজে থাকে, না অতিরিক্ত শুকনো হয়।
সঠিক মাঠ মতা নির্ণয়ের জন্য একটি খণ্ড জমিতে পর্যাপ্ত সেচ দিয়ে তা ত্রিপল বা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়, যাতে বাষ্পীভবন বন্ধ থাকে। কিছু সময় পর অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের মাধ্যমে বেরিয়ে গেলে মাটিতে পানি ও বায়ুর মধ্যে একটি ভারসাম্য সৃষ্টি হয়। এই অবস্থাকেই মাঠ মতা বলা হয়।
মাঠ পর্যায়ে ‘জো’ অবস্থা নির্ণয়ের কৌশল
মাঠ পর্যায়ে কৃষকরা সাধারণত হাতের অনুভূতির মাধ্যমে মাটির ‘জো’ অবস্থা নির্ণয় করে থাকেন। এ পদ্ধতিতে এক মুঠি মাটি হাতে নিয়ে চেপে ধরার পর ছেড়ে দেওয়া হয়। যদি দেখা যায়, মাটি চাপ খাওয়া আকৃতিতে থাকে কিন্তু আঙুলের চাপে অতিরিক্তভাবে লেগে থাকে না, তবে বুঝতে হবে মাটিতে এখনও ‘জো’ আসেনি।
এরপর ঐ মাটি দিয়ে একটি বল তৈরি করে প্রায় ১ মিটার উচ্চতা থেকে শক্ত মাটির ওপর আস্তে ছেড়ে দেওয়া হয়। যদি বলটি মাটিতে পড়ে ভেঙে ছড়িয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে জমিতে কর্ষণ উপযোগী ‘জো’ এসেছে। কিন্তু যদি বলটি ভাঙা ছাড়াই চ্যাপ্টা হয়ে থাকে, তবে তখন ভূমি কর্ষণ করা উচিত নয়। এ অবস্থায় চাষ করলে লাঙলে মাটি আটকে যায়, মাটি ভালোভাবে উল্টায় না এবং মাটির গঠন নষ্ট হয়।
ভিজা জমিতে কাদা চাষ (Puddling in Wet Land)
সব ফসলের জন্য মাটিতে ‘জো’ অবস্থায় ভূমি কর্ষণ প্রয়োজন হলেও কিছু কিছু ফসলের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা যায়। বিশেষ করে ধানজাতীয় ফসলের জন্য ভিজা জমিতে কাদা চাষ বা পাডলিং (Puddling) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কর্ষণ পদ্ধতি। কাদা চাষে জমিকে অতিরিক্ত ভিজিয়ে বারবার লাঙল বা মই চালিয়ে কাদাযুক্ত অবস্থায় পরিণত করা হয়।
ভিজা জমিতে কাদা চাষের ফলে মাটির দানাগুলো ভেঙে সূক্ষ্ম হয়ে যায় এবং মাটির নিচে একটি শক্ত স্তর সৃষ্টি হয়, যা পানি নিচে নামতে বাধা দেয়। এর ফলে জমিতে দীর্ঘ সময় পানি ধরে রাখা সম্ভব হয়, যা ধান ফসলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এছাড়াও কাদা চাষের মাধ্যমে আগাছা দমন সহজ হয় এবং চারা রোপণের সময় জমি নরম থাকায় চারা সহজে মাটিতে স্থাপন করা যায়।
আউশ ধান ও পাট কর্তনের পর ভূমি কর্ষণের গুরুত্ব
আউশ ধান ও পাট ফসল সাধারণত ভিজা জমিতে কর্তন করা হয়। এসব ফসল কাটার পর যদি জমি প্রথমবার ভিজা অবস্থায় কর্ষণ করা হয়, তবে ফসলের অবশিষ্টাংশ সহজেই মাটির সঙ্গে মিশে যায়। এতে অবশিষ্ট খড়, গাছের মূল ও অন্যান্য জৈব পদার্থ ধীরে ধীরে পচে জৈব সারে পরিণত হয়।
এই জৈব সার মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে, মাটির গঠন উন্নত করে এবং পরবর্তী ফসলের জন্য পুষ্টি সরবরাহে সহায়তা করে। তাই আউশ ধান ও পাট কর্তনের পর ভিজা জমিতে প্রথম কর্ষণ করা কৃষিবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অত্যন্ত উপকারী।
ভূমি কর্ষণের সময় নির্বাচন
ভূমি কর্ষণের সময় নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। সঠিক সময়ে কর্ষণ না করলে মাটির গঠন নষ্ট হতে পারে এবং কর্ষণের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায় না। অতিরিক্ত ভেজা অবস্থায় চাষ করলে মাটি লাঙলে আটকে যায় এবং শক্ত দলা তৈরি হয়। আবার অতিরিক্ত শুকনো মাটিতে চাষ করলে ঢেলা ভাঙতে বেশি শ্রম ও শক্তি লাগে এবং মাটির গঠন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অতএব, জমির ধরন, ফসলের প্রকার এবং মাটির আর্দ্রতা বিবেচনা করে ভূমি কর্ষণের উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা আবশ্যক।

ভূমি কর্ষণ পদ্ধতি, মাটির আর্দ্রতা ও ভূমি কর্ষণের সময়—এই তিনটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। সঠিক কর্ষণ পদ্ধতি নির্বাচন, মাটির উপযুক্ত আর্দ্রতা নিশ্চিতকরণ এবং সময়োপযোগী কর্ষণ কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে জমির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাবলি উন্নত করা সম্ভব।
প্রচলিত ও সংরক্ষণশীল ভূমি কর্ষণ পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগ, মাঠ মতা বা ‘জো’ অবস্থা নির্ণয়ের সঠিক কৌশল এবং ভিজা জমিতে কাদা চাষের বৈজ্ঞানিক ব্যবহার ফসল উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত ফলন নিশ্চিত করে। সুতরাং টেকসই কৃষি ব্যবস্থার জন্য ভূমি কর্ষণকে একটি পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানভিত্তিক প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করা অপরিহার্য।
