বিভিন্ন ফসলের জন্য জমি তৈরির নীতিমালা

ফসল উৎপাদনের সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করে জমি কতটা সঠিকভাবে ও উপযোগীভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে তার ওপর। প্রতিটি ফসলের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, মৌসুম, বপন বা রোপণ পদ্ধতি, বীজের আকার, মূলের গভীরতা এবং পানি ও পুষ্টি চাহিদা ভিন্ন হওয়ায় সব ফসলের জন্য একই ধরনের জমি প্রস্তুতকরণ পদ্ধতি অনুসরণ করা যায় না। এমনকি একই ফসল ভিন্ন মৌসুমে বা ভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করে চাষ করলে জমি তৈরির নীতিমালাতেও পার্থক্য দেখা দেয়।

আজকের আলোচনায় বিভিন্ন ফসলের জন্য জমি তৈরির নীতিমালা সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে। ফসলের মৌসুম, উৎপাদন পদ্ধতি, বপন ও রোপণের ধরন, প্রযুক্তিগত সুবিধা, ভূমি কর্ষণ পদ্ধতি, বীজের আকার ও আয়তন, আগাছা ব্যবস্থাপনা এবং ফসলের মূলের গভীরতা—এই সব বিষয়ের আলোকে জমি প্রস্তুতকরণের মৌলিক নীতিগুলো তুলে ধরা হবে। এসব নীতিমালা সঠিকভাবে অনুসরণ করলে জমির উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, ফসলের অঙ্কুরোদগম ও বৃদ্ধি সহজ হয় এবং সর্বোপরি কাঙ্ক্ষিত ফলন অর্জন সম্ভব হয়।

বিভিন্ন ফসলের জন্য জমি তৈরির নীতিমালা

 

বিভিন্ন ফসলের জন্য জমি তৈরির নীতিমালা

 

আগেই বলা হয়েছে যে, বিভিন্ন ফসলের জন্য বিভিন্নভাবে জমি তৈরি করা হয়। আবার একই শস্যের বিভিন্ন ফসলের জন্য জমি তৈরির পদ্ধতি আলাদা হতে পারে। যাহোক জমি তৈরির সাধারন নীতিমালা নিচে বর্ণনা করা হলো:

ফসলের মৌসুম

ফসলের মৌসুম অনুযায়ী জমি তৈরির নীতিমালা নির্ধারিত হয়। যেমন ধানের তিনটি ফসল- আউশ, আমন ও বোরো- একই বছরে চাষ করা যেতে পারে। কাজেই আউশ মৌসুমে ধান চাষ করার জন্য যেভাবে জমি তৈরি করা হয়, বোরো মৌসুমে সেভাবে তৈরি করা হয় না।

আবার কোন কোন শস্য রবি ও খরিপ- দু’মৌসুমেই চাষ করা হয়। যেমন- চীনা বাদাম, ভুট্টা, মুগ কলাই ইত্যাদি। এসব ফসল চাষের জন্য বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন রকম জমি তৈরির পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়।

শস্য উৎপাদন পদ্ধতি

একই শস্য একাধিক পদ্ধতিতে চাষ করা যেতে পারে। যেমন: গোল আলু মালচ্ পদ্ধতিতে, অথবা সারিতে উঁচু করে মাটি তুলে দিয়ে চাষ করা হয। মালচ্ পদ্ধতিতে গোল আলু রোপণ করে কচুরি পানা, খড় ইত্যাদি দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। এই জৈব আস্তরণের মাঝে আলু উৎপাদিত হয়। কিন্তু অন্য পদ্ধতিতে আলু সারিতে লাগিয়ে উঁচু করে মাটি তুলে দিয়ে (Earthing up) চাষ করা হয় । কাজেই এ দুটি পদ্ধতিতে জমি তৈরির ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

বপন ও রোপণ পদ্ধতি

বপন ও রোপণ পদ্ধতির জন্য ভিন্ন ভিন্ন ভাবে জমি তৈরি করা হয়। আখ চাষে পরিখা পদ্ধতি, এস.টি.পি (Spaced transplanting) বা অন্যান্য পদ্ধতির জন্য ভিন্ন ভিন্ন ভাবে জমি তৈরি করা হয়। পরিখা পদ্ধতিতে সার পরিখায় সরবরাহ করা হয় অথচ অন্যান্য পদ্ধতিতে তা করা হয় না। এেেত্র জমি তৈরির ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরিত হয়।

প্রযুক্তিগত সুবিধা

আমরা আগেই জেনেছি যে, আউশ ধান শুকনো জমিতে অথবা ভিজা জমিতে ভূমি কর্ষণ করে চাষ করা যায়। প্রযুক্তিগত সুবিধা-অসুবিধার জন্য এ চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। যদি সেচের পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা থাকে তাহলে জমি কাদা করে (Puddling) আউশ ধান চাষ করা হয়, আর সে সুবিধা না থাকলে শুকনো জমিতে ভূমি কর্ষণ করে এ ধান চাষ করা হয়।

ভূমি কর্ষণ পদ্ধতি

প্রচলিত ভূমি কর্ষণ ও সংর ণ ভূমি কর্ষণে জমি তৈরির পৃথক পদ্ধতি রয়েছে। প্রচলিত ভূমি কর্ষণ প্রথায় জমিকে উত্তমরূপে চাষ করে বীজতলা তৈরি করা হয়। কিন্তু সংর ণ ভূমি কর্ষণ পদ্ধতিতে মাটির ভৌত গুণাবলীকে উন্নত করার জন্য ন্যূনতম সংখ্যক চাষ দিয়ে তৈরি করা হয়। সংর ণ পদ্ধতিতে বাটালি চাষ ও সরাসরি ড্রিলিং করে জমিতে বীজ বপণ করা হয়। অনেক সময় ভূমি কর্ষণের বিকল্প হিসাবে আগাছানাশক ব্যবহার করা হয় ।

বীজের আকার ও আয়তন

বীজের আকার ও আয়তন অনুযায়ী জমি তৈরি করতে হয়। যে ফসলের বীজ যত ছোট সে ফসলের জন্য তত বেশি পরিপাটি করে বীজতলা তৈরি করা হয়। বীজতলায় বীজ বপনের পর বীজের সঙ্গে মাটির সংস্পর্শ যত নিবিড় হয়, বীজের অঙ্কুরোদগমের হারও সে অনুসারে তত বেশি হয়। বীজের আকার বড় হলে কম সংখ্যক চাষের প্রয়োজন হয়।

যেমন ছোলা ও ভুট্টা চাষের জন্য যেভাবে জমিতে চাষ দিতে হয় তামাক অথবা পিয়াজের জন্য তার চেয়ে অনেক বেশি চাষ দিয়ে সুন্দর ও পরিপাটি করে বীজতলা তৈরি করতে হয়। কাজেই বীজের আকার ও আয়তন অনুযায়ী জমি তৈরির পদ্ধতি পরিবর্তিত হয়ে থাকে।

আগাছা ব্যবস্থাপনা

আগাছা ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন ফসলের জন্য জমি তৈরির ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। ফসলের ে তে আগাছা পরিচার্ষিক পদ্ধতি, রাসায়নিক পদ্ধতি এবং জৈবিক পদ্ধতিতে দমন করা যায়। যে ফসলের আগাছা দমনের জন্য রাসায়নিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে তার চেয়ে যেখানে পরিচার্ষিক ব্যবস্থা নেয়া হবে- এ ত্রে ভিন্ন ভিন্ন েত্রে ভিন্ন ভিন্নভাবে জমি তৈরি করা হয়।

গজানোর আগেই আগাছা নাশক প্রয়োগ (Pre-emergence application of weedicide) করে আগাছা দমন করা যায়। বাংলাদেশে যেহেতু আগাছা নাশক ব্যবহারের সরকারি অনুমোদন নেই, তাই পরিচার্ষিক পদ্ধতিতে আগাছা দমন করতে জমিতে বীজ বপনের পূর্বেই ভালোভাবে আগাছা পরিষ্কার করে জমি তৈরি করতে হয়।

আবার অনেক আগাছানাশক যেমন প্যারাকোয়াট ভূমি কর্ষণের বিকল্প হিসাবে ব্যবহার করে সমন্বিত আগাছা দমনের েত্রে আগাছা মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়ে জমি তৈরি করা হয়। কাজেই আগাছা দমনের জন্যও কৃষি জমি তৈরির পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।

মূলের গভীরতা

বিভিন্ন ফসলের মূল বিভিন্ন গভীরতা পর্যন্ত পৌঁছে। অর্থাৎ কোন ফসলের মূল মাটির গভীরে প্রবেশ করে আবার কোনটি মাটির উপরের স্তরেই থাকে। নিচে কয়েকটি ফসলের মূলের গভীরতা দেয়া হলো।

ছক ১: কয়েকটি প্রধান ফসলের মূলের গভীরতা

 

বিভিন্ন ফসলের জন্য জমি তৈরির নীতিমালা

 

কাজেই কত গভীরতায় জমি চাষ করলে ফসলের ফলন ভালো হবে তা নির্ভর করে ফসলের মূলের বৈশিষ্ট্যের ওপর। ধান একটি অগভীরমূলী ফসল। এর জন্য গভীরভাবে চাষের প্রয়োজন হয় না। অন্যদিকে আখ ফসলের জন্য জমি গভীরভাবে চাষের প্রয়োজন রয়েছে।

আবার চর এলাকায় মাটির উপরের স্তরে অল্প গভীরতাসম্পন্ন পলি বা বেলে দো-আঁশ বুনটের নিচে মোটা বালি থাকলে গভীরভাবে চাষ না করাই ভাল। প্রয়োজনের অতিরিক্ত গভীরতায় চাষ করলে কেবল শ্রম, সময় ও অর্থেরই অপচয় হয় না, অনেক েত্রে জমির উৎপাদন মতাও কমে যেতে পারে।

Leave a Comment