চারার ঘনত্ব নির্ধারণ ও সম্ভাব্য ফলন

ফসল উৎপাদনে কাঙ্ক্ষিত ও টেকসই ফলন অর্জনের জন্য জমিতে গাছের সংখ্যা ও তাদের সুষম বিন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ জমিতে কতটি গাছ থাকবে এবং সেই গাছগুলো কীভাবে পরস্পরের সাথে অবস্থান করবে—এই বিষয়টিই মূলত চারার ঘনত্ব নির্ধারণের সঙ্গে সম্পর্কিত। চারার ঘনত্ব সঠিক না হলে গাছের মধ্যে খাদ্য উপাদান, পানি, সূর্যালোক ও বায়ুর জন্য অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়, যা গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে এবং ফলনের পরিমাণ ও গুণগত মান উভয়ই কমিয়ে দেয়। তাই প্রতিটি ফসলের জন্য উপযুক্ত চারার ঘনত্ব নির্ধারণ করা সর্বোচ্চ সম্ভাব্য ফলন অর্জনের অন্যতম পূর্বশর্ত।

চারার ঘনত্ব নির্ধারণ ও সম্ভাব্য ফলনের মধ্যে একটি নিবিড় ও পারস্পরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। সাধারণভাবে বলা যায়, একটি নির্দিষ্ট একক জমিতে যতটুকু গাছ থাকলে পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে গাছগুলো সর্বোচ্চ উৎপাদন দিতে পারে, সেই অবস্থাকেই আদর্শ চারার ঘনত্ব বলা হয়। এই আদর্শ ঘনত্ব বজায় রাখতে হলে বীজের হার, বপন বা রোপণের পদ্ধতি, জমির উর্বরতা, ফসলের প্রকৃতি ও ব্যবহার—এসব বিষয় সঠিকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

চারার ঘনত্ব নির্ধারণ ও সম্ভাব্য ফলন

 

চারার ঘনত্ব নির্ধারণ ও সম্ভাব্য ফলন

 

বীজহার ও চারার ঘনত্বের ধারণা

একটি নির্দিষ্ট একক পরিমাণ জমিতে সফলভাবে একটি ফসল উৎপাদনের জন্য যে পরিমাণ বীজ বপন করতে হয়, তাকেই ঐ ফসলের বীজহার বলা হয়। অন্যদিকে, একটি নির্দিষ্ট আয়তনের জমিতে যে পরিমাণ চারা গাছ থাকলে একটি ফসল থেকে সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া যায়, সেই পরিমাণ চারার উপস্থিতিকেই বলা হয় চারার ঘনত্ব। এই চারার ঘনত্বের ওপর ফসলের ফলন অনেকাংশে নির্ভরশীল।

কাঙ্ক্ষিত চারার ঘনত্ব নিশ্চিত করার জন্য জমিতে নির্দিষ্ট পরিমাণ বীজ বপন করা হয়। একটি নির্দিষ্ট একক জমিতে যদি নির্দিষ্ট সংখ্যক গাছ সুষম দূরত্বে অবস্থান করে এবং স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে, তবেই ফসলের সর্বোচ্চ ফলন পাওয়া সম্ভব। বীজের হার কম বা বেশি হলে জমিতে গাছের সংখ্যা অনুপাতে কমে বা বেড়ে যায়, যার ফলে গাছের বৃদ্ধি ও বিকাশে তারতম্য দেখা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত ফলন প্রভাবিত হয়।

বীজের গুণাগুণ ও বীজহারের সম্পর্ক

বীজহার মূলত বীজের বিভিন্ন গুণাগুণের ওপর নির্ভর করে। এসব গুণাবলীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
বীজের বিশুদ্ধতা, অঙ্কুরোদগম ক্ষমতা, বীজের ওজন, আকার ও আকৃতি, সমাবয়বতা এবং পরিপক্কতা। সাধারণভাবে বলা যায়, বীজ যত বেশি বিশুদ্ধ হবে, প্রয়োজনীয় বীজহার তত কম হবে। বিপরীতভাবে, বীজে ভেজাল বা অশুদ্ধতার পরিমাণ যত বেশি হবে, কাঙ্ক্ষিত চারার সংখ্যা পেতে বীজহার তত বেশি প্রয়োজন হবে।

একইভাবে, বীজের অঙ্কুরোদগমের হার যত বেশি হবে, বীজহার সেই অনুপাতে কমানো যায়। বীজের আকার ও আকৃতির তারতম্যের কারণেও বীজহারে পার্থক্য দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, গোল আলুর ক্ষেত্রে বীজের ওজন ও আকারের ভিন্নতার কারণে হেক্টরপ্রতি বীজহার প্রায় ২০ মণ থেকে শুরু করে ৭৫ মণ পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়াও বীজের সমাবয়বতা ও পরিপক্কতার ওপর নির্ভর করে বীজহার কম বা বেশি নির্ধারিত হয়।

কাঙ্ক্ষিত উদ্ভিদ সংখ্যা (Desired Plant Population) 

একটি নির্দিষ্ট একক পরিমাণ জমিতে নির্দিষ্ট সংখ্যক গাছ সফলভাবে বেড়ে উঠলে ফসলের ফলন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এই নির্দিষ্ট সংখ্যক গাছই ঐ জমির জন্য কাঙ্ক্ষিত উদ্ভিদ সংখ্যা হিসেবে পরিচিত। কাঙ্ক্ষিত উদ্ভিদ সংখ্যা এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থা সৃষ্টি করে, যেখানে গাছের মধ্যে খাদ্য উপাদান, পানি, বায়ু ও সূর্যালোকের জন্য প্রতিযোগিতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে এবং প্রতিটি গাছ তার পূর্ণ উৎপাদনক্ষমতা প্রকাশ করতে পারে।

যদি জমিতে কাঙ্ক্ষিত উদ্ভিদ সংখ্যার চেয়ে বেশি গাছ থাকে, তবে গাছগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়। ফলে পর্যাপ্ত খাদ্য উপাদান, আর্দ্রতা ও আলো না পাওয়ার কারণে গাছ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ফলন ক্রমশ কমতে থাকে। আবার কাঙ্ক্ষিত সংখ্যার তুলনায় গাছের সংখ্যা কম হলে জমির সম্পূর্ণ উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার হয় না, যার ফলে সম্ভাব্য ফলনের একটি বড় অংশ অপচয় হয়।

অতএব, একক জমিতে যত সংখ্যক গাছ থাকলে ফসলের ফলন সর্বাধিক হয়, সেই সংখ্যাকেই ঐ জমির কাঙ্ক্ষিত উদ্ভিদ সংখ্যা বলা হয়। এই সংখ্যা বিভিন্ন ফসলের জন্য ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এমনকি একই ফসলের ক্ষেত্রেও জাত, মৌসুম, জমির উর্বরতা ও চাষ পদ্ধতির কারণে কাঙ্ক্ষিত উদ্ভিদ সংখ্যার তারতম্য দেখা যায়।

প্রবর্তন মাত্রা (Establishment Allowance / Percent Safety Allowance)

বাস্তব ক্ষেত্রপর্যায়ে বীজ বপন বা চারা রোপণের পর সব বীজ বা চারা সমানভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না। অনেক ক্ষেত্রে গবেষণাগারে (Laboratory) বীজের অঙ্কুরোদগম ভালো হলেও মাঠের প্রতিকূল পরিবেশে সেই বীজ অঙ্কুরিত হতে ব্যর্থ হয়। এর প্রধান কারণ হলো—মাঠের সর্বত্র সমান আর্দ্রতা না থাকা, বীজের অতিরিক্ত গভীরে বা অতিরিক্ত উপরের স্তরে অবস্থান করা এবং মাটির তাপমাত্রা ও গঠনগত সমস্যা।

এছাড়াও কিছু বীজ শক্ত বীজ (Hard seed) হওয়ায় গবেষণাগারে অঙ্কুরিত না হলেও মাঠের প্রতিকূল পরিবেশে কখনো কখনো অঙ্কুরিত হতে পারে। অন্যদিকে, অনেক সময় কীটপতঙ্গ, পাখি বা অন্যান্য জীব বীজ খেয়ে ফেলে কিংবা সদ্য গজানো চারাগুলো নষ্ট করে দেয়। এসব কারণে মাঠ পর্যায়ে চারার সংখ্যা কমে যেতে পারে। এই চারার ক্ষতিকে প্রবর্তন ক্ষতি (Establishment loss) বলা হয়।

এই ধরনের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার জন্য বীজ বপন বা চারা রোপণের সময় নির্ধারিত বীজহারের সাথে অতিরিক্ত কিছু বীজ যোগ করা হয়, যাকে প্রবর্তন মাত্রা বা নিরাপত্তা মাত্রা বলা হয়। সাধারণত মাঠ ফসলে চারা রোপণের ক্ষেত্রে ৫–১৫ শতাংশ এবং বীজ বপনের ক্ষেত্রে ১০–১৫ শতাংশ পর্যন্ত প্রবর্তন মাত্রা যোগ করা হয়। এর ফলে প্রতিকূল অবস্থার পরও কাঙ্ক্ষিত চারার ঘনত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয়।

জমির উর্বরতা ও উৎপাদনক্ষমতা (Soil Fertility and Productivity)

চারার ঘনত্ব নির্ধারণে জমির উর্বরতা ও উৎপাদনক্ষমতা একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। জমির উর্বরতা বলতে মাটিতে উদ্ভিদের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের উপস্থিতি ও সরবরাহ ক্ষমতাকে বোঝায়, আর উৎপাদনক্ষমতা বলতে ঐ জমি থেকে ফসল উৎপাদনের সামগ্রিক সামর্থ্যকে বোঝানো হয়। গাছের বৃদ্ধি ও বিকাশ সরাসরি এই দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল।

কম উর্বরতা সম্পন্ন জমিতে গাছের বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে ধীর ও সীমিত হয়। এ ধরনের জমিতে প্রতিটি গাছ কম জায়গা ও কম পুষ্টি ব্যবহার করে, ফলে সেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি সংখ্যক গাছের সংকুলান সম্ভব হয়। বিপরীতভাবে, অধিক উর্বর ও উচ্চ উৎপাদনক্ষম জমিতে গাছের বৃদ্ধি দ্রুত ও ব্যাপক হয়। এ ধরনের জমিতে প্রতিটি গাছ বেশি জায়গা ও বেশি পুষ্টি গ্রহণ করে বলে কম সংখ্যক চারা রেখে চাষ করাই অধিক উপযোগী।

অতএব, জমির উর্বরতা ও উৎপাদনক্ষমতা বিবেচনা না করে যদি একই হারে চারার ঘনত্ব নির্ধারণ করা হয়, তবে কোথাও ফলন কমে যেতে পারে আবার কোথাও গাছের অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হতে পারে। সঠিক ফলন পেতে হলে জমির প্রকৃতি অনুযায়ী চারার ঘনত্ব সামঞ্জস্য করা অপরিহার্য।

ফসলের ব্যবহার (Use of Crop)

ফসল কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে, তার ওপরও চারার ঘনত্ব নির্ধারণ অনেকাংশে নির্ভর করে। একই ফসল বিভিন্ন উদ্দেশ্যে চাষ করা হলে চারার ঘনত্বেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ভুট্টা ফসলকে দানা ফসল হিসেবে অথবা গো-খাদ্য (ফডার) হিসেবে চাষ করা যায়।

দানা ফসল হিসেবে ভুট্টা চাষ করলে গাছের মধ্যে পর্যাপ্ত দূরত্ব রেখে অপেক্ষাকৃত কম চারার ঘনত্ব বজায় রাখা হয়, যাতে প্রতিটি গাছ সুস্থভাবে দানা গঠন করতে পারে। অপরদিকে গো-খাদ্য হিসেবে ভুট্টা চাষের ক্ষেত্রে অধিক সংখ্যক গাছ লাগানো হয়, কারণ এখানে প্রধান লক্ষ্য হলো বেশি পরিমাণ সবুজ জৈব ভর উৎপাদন।

এভাবে ধইঞ্চা, শণপাট ইত্যাদি ফসল সবুজ সার হিসেবে চাষ করলে তুলনামূলকভাবে বেশি চারার ঘনত্ব প্রয়োজন হয়। আবার একই ফসল যদি বীজ উৎপাদন বা আঁশ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে চাষ করা হয়, তবে চারার ঘনত্ব ভিন্নভাবে নির্ধারণ করা হয়। সুতরাং ফসলের চূড়ান্ত ব্যবহার চারার ঘনত্ব নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।

ফসল জন্মানোর ঋতু (Growing Season)

ফসল যে মৌসুমে চাষ করা হয়, সেই মৌসুমও চারার ঘনত্ব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। অনেক ফসল রবি ও খরিপ উভয় মৌসুমেই চাষ করা হয়, কিন্তু এই দুই মৌসুমে পরিবেশগত অবস্থার পার্থক্যের কারণে গাছের বৃদ্ধি ও বিস্তারে ভিন্নতা দেখা যায়।

উদাহরণস্বরূপ, তুলা ফসল রবি মৌসুমে চাষ করলে গাছের দৈহিক বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে কম হয়। ফলে এই মৌসুমে চারার ঘনত্ব কিছুটা বাড়িয়ে দিতে হয়। অন্যদিকে, খরিপ মৌসুমে একই জাতের তুলা ফসলে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বেশি থাকায় গাছের দৈহিক বৃদ্ধি বেশি হয়। তাই এই মৌসুমে চারার ঘনত্ব কমিয়ে দেওয়া যুক্তিযুক্ত।

এভাবে মৌসুমভেদে আবহাওয়া, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও দিন দৈর্ঘ্যের পার্থক্য গাছের বৃদ্ধি প্রভাবিত করে এবং সেই অনুযায়ী চারার ঘনত্ব নির্ধারণ করা প্রয়োজন হয়।

ফসল লাগানোর পদ্ধতি (Planting Method)

ফসল লাগানোর পদ্ধতি চারার ঘনত্ব নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একই ফসল ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতিতে লাগানো হলে প্রয়োজনীয় চারার সংখ্যা ও বীজহারেও উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। কারণ প্রতিটি পদ্ধতিতে গাছের অবস্থান, দূরত্ব এবং পুষ্টি গ্রহণের ধরন ভিন্ন হয়ে থাকে।

উদাহরণস্বরূপ, আখ ফসল চাষের ক্ষেত্রে যদি আখের কাণ্ড সরল সারিতে (Continuous row planting) রোপণ করা হয়, তবে হেক্টরপ্রতি প্রায় ১০০ মণ আখ বীজ খণ্ডের প্রয়োজন হয়। কিন্তু যদি আঁকাবাঁকা বা বিকল্প পদ্ধতিতে (Zigzag planting) আখ রোপণ করা হয়, তবে একই জমিতে প্রায় দ্বিগুণ পরিমাণ বীজ খণ্ডের প্রয়োজন হতে পারে। অর্থাৎ, রোপণ পদ্ধতির ভিন্নতার কারণে চারার ঘনত্ব ও বীজহারে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে।

একইভাবে, পাট চাষের ক্ষেত্রে যদি বীজ ছিটিয়ে বপন করা হয়, তবে হেক্টরপ্রতি সাধারণত ১০–১২ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়। কিন্তু লাইনে বপন করলে বীজের অপচয় কম হয় এবং মাত্র ৫–৮ কেজি বীজেই কাঙ্ক্ষিত চারার ঘনত্ব বজায় রাখা সম্ভব হয়। তাই ফসল লাগানোর পদ্ধতি নির্ধারণের সময় চারার ঘনত্বের বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

চারা লাগানোর সময়

(Planting Time)

বীজ বপন বা চারা রোপণের সময়ও চারার ঘনত্ব নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। ফসল যদি মৌসুমের শুরুতে লাগানো হয়, তবে চারাগুলো বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়। ফলে এ সময় তুলনামূলকভাবে কম চারার ঘনত্ব বজায় রাখলেও গাছগুলো ভালোভাবে বেড়ে ওঠে এবং কাঙ্ক্ষিত ফলন দেয়।

অপরদিকে, যদি ফসল মৌসুমের শেষের দিকে লাগানো হয়, তবে গাছের দৈহিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য সময় কম থাকে। এ অবস্থায় গাছের সংখ্যা কিছুটা বাড়িয়ে দিয়ে চারার ঘনত্ব বৃদ্ধি করা হয়, যাতে স্বল্প সময়ের মধ্যেই জমির সর্বোচ্চ উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার করা যায়।

উদাহরণস্বরূপ, রোপা আমন ধানের ক্ষেত্রে মৌসুমের প্রথম দিকে প্রতি গোছায় সাধারণত ২–৩টি চারা রোপণ করা হয়। কিন্তু মৌসুমের শেষের দিকে রোপণের সময় প্রতি গোছায় ৩–৪টি চারা রোপণ করা হয়, যাতে কাঙ্ক্ষিত চারার ঘনত্ব বজায় থাকে এবং ফলন কমে না যায়।

কুশি উৎপাদনের প্রকৃতি (Tillering Habit)

গ্রামিনী (Gramineae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত শস্য ফসলগুলোর কুশি উৎপাদনের ক্ষমতা চারার ঘনত্ব নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে জাতের কুশি উৎপাদনের ক্ষমতা বেশি, সেই জাতের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে কম চারার ঘনত্ব বজায় রাখা হয়। কারণ একটি চারা থেকেই একাধিক কুশি উৎপন্ন হয়ে কাঙ্ক্ষিত গাছের সংখ্যা পূরণ করতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ, গমের ইউনিকলম (Uniculm) জাত সাধারণত মাত্র একটি কুশি উৎপন্ন করে। তাই এ ধরনের জাতের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি চারার ঘনত্ব প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে, যেসব গম বা ধানের জাত অধিক কুশি উৎপাদনে সক্ষম, সেসব জাতের ক্ষেত্রে কম চারার ঘনত্বেও ভালো ফলন পাওয়া যায়।

ধান, আখ, গম, যব, চীনা, কাওন ইত্যাদি তণ্ডুলজাতীয় (Cereals) ফসলের ক্ষেত্রে বিভিন্ন জাতের কুশি উৎপাদনের ক্ষমতা বিবেচনা করে চারার ঘনত্ব নির্ধারণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টি উপেক্ষা করলে কখনো অতিরিক্ত গাছের ভিড় তৈরি হয়, আবার কখনো জমির পূর্ণ উৎপাদনক্ষমতা কাজে লাগানো সম্ভব হয় না।

চাষের প্রকার (Type of Cultivation)

চারার ঘনত্ব নির্ধারণে চাষের প্রকারভেদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণভাবে ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যে জমির সুষ্ঠু ব্যবহারের জন্য দুই ধরনের চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়—ব্যাপক চাষ (Extensive cultivation) এবং নিবিড় চাষ (Intensive cultivation)। এই দুটি পদ্ধতিকে যথাক্রমে আনুভূমিক বিস্তার (Horizontal expansion) এবং উলম্ব বিস্তার (Vertical expansion) নামেও অভিহিত করা হয়।

ব্যাপক চাষ পদ্ধতিতে একটি দেশের বা খামারের সর্বাধিক পরিমাণ জমিকে চাষের আওতায় আনা হয়। এ ক্ষেত্রে চাষোপযোগী প্রতি ইঞ্চি জমি ব্যবহার করে মোট উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। সাধারণত যেখানে জমির পরিমাণ বেশি কিন্তু প্রযুক্তি, সার ও সেচের ব্যবহার সীমিত, সেখানে ব্যাপক চাষ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। এ ধরনের চাষে তুলনামূলকভাবে চারার ঘনত্ব কম রাখা হয়, কারণ অধিক সংখ্যক জমি ব্যবহার করেই মোট উৎপাদন বৃদ্ধি করা হয়।

অপরদিকে নিবিড় চাষ পদ্ধতিতে একই জমিতে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত জাতের বীজ, পর্যাপ্ত সার, সেচ ও পরিচর্যা ব্যবহার করে ফসলের সম্ভাবনাময় সর্বোচ্চ ফলন (Potential yield) অর্জনের চেষ্টা করা হয়। নিবিড় চাষে প্রতিটি গাছের যত্ন বেশি নেওয়া হয় এবং জমির উৎপাদনক্ষমতাকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগানো হয়। ফলে এই পদ্ধতিতে সাধারণত চারার ঘনত্ব ব্যাপক চাষের তুলনায় বেশি নির্ধারণ করা হয়।

চারার ঘনত্ব ও সম্ভাব্য ফলনের সম্পর্ক

চারার ঘনত্ব ও সম্ভাব্য ফলনের মধ্যে একটি সরাসরি ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান। উপযুক্ত চারার ঘনত্ব বজায় রাখা হলে প্রতিটি গাছ পর্যাপ্ত আলো, বায়ু, পানি ও পুষ্টি উপাদান পায়। এর ফলে গাছের শিকড় ও কাণ্ড শক্তিশালী হয়, কুশি বা শাখা উৎপাদন সঠিকভাবে ঘটে এবং শেষ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি পায়।

কিন্তু চারার ঘনত্ব যদি অতিরিক্ত বেশি হয়, তবে গাছের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়। এতে গাছ লম্বা হলেও দুর্বল হয়, রোগবালাইয়ের প্রকোপ বাড়ে এবং ফলন কমে যায়। আবার চারার ঘনত্ব যদি প্রয়োজনের তুলনায় কম হয়, তবে জমির পূর্ণ উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। ফলে সম্ভাব্য ফলনের একটি বড় অংশ অনাবশ্যকভাবে নষ্ট হয়ে যায়।

অতএব, সর্বোচ্চ সম্ভাব্য ফলন অর্জনের জন্য চারার ঘনত্ব এমনভাবে নির্ধারণ করা উচিত, যাতে প্রতিটি গাছ তার পূর্ণ জৈবিক সক্ষমতা প্রকাশ করতে পারে এবং একই সঙ্গে জমির সামগ্রিক উৎপাদনক্ষমতাও পুরোপুরি কাজে লাগে।

GOLN-Agro-Logo transparent_

চারার ঘনত্ব নির্ধারণ ফসল উৎপাদনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। বীজহার, কাঙ্ক্ষিত উদ্ভিদ সংখ্যা, প্রবর্তন মাত্রা, জমির উর্বরতা ও উৎপাদনক্ষমতা, ফসলের ব্যবহার, মৌসুম, রোপণ পদ্ধতি, চারা লাগানোর সময়, কুশি উৎপাদনের প্রকৃতি এবং চাষের প্রকারভেদ—এই সব বিষয় সম্মিলিতভাবে চারার ঘনত্ব নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে।

এই বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনা করে চারার ঘনত্ব নির্ধারণ করা হলে ফসলের বৃদ্ধি সুষম হয়, রোগবালাই কম হয় এবং সর্বোপরি কাঙ্ক্ষিত ও সম্ভাব্য ফলন অর্জন করা সম্ভব হয়। তাই আধুনিক কৃষি ব্যবস্থায় চারার ঘনত্ব নির্ধারণকে একটি বৈজ্ঞানিক ও পরিকল্পিত প্রক্রিয়া হিসেবে গ্রহণ করা অপরিহার্য।

Leave a Comment