আজকের আলোচনার বিষয় জৈব সার উৎপাদনকারী উদ্ভিদসমূহ। টেকসই কৃষি ব্যবস্থায় মাটির উর্বরতা রক্ষা ও ফসলের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধিতে জৈব সারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জৈব সার মূলত উদ্ভিদ ও প্রাণিজ উৎস থেকে প্রাপ্ত প্রাকৃতিক সার, যা মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক গুণাবলি উন্নত করে। এই জৈব সার উৎপাদনে যেসব উদ্ভিদ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ব্যবহৃত হয়, সেগুলোকে জৈব সার উৎপাদনকারী উদ্ভিদ বলা হয়। ধৈঞ্চা, শনপাট, বরবটি, অ্যাযোলা, নীল-সবুজ শেওলা প্রভৃতি উদ্ভিদ মাটিতে জৈব পদার্থ ও নাইট্রোজেন যোগ করে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এসব উদ্ভিদের বৈশিষ্ট্য, ব্যবহার ও গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা লাভ করাই এই আলোচনার মূল উদ্দেশ্য।
Table of Contents
জৈব সার উৎপাদনকারী উদ্ভিদসমূহ

এমন বহু উদ্ভিদ রয়েছে, যেগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জৈব সার উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। উদ্ভিদ, প্রাণিজ বর্জ্য ও অন্যান্য প্রাকৃতিক উৎস থেকে সরাসরি প্রাপ্ত বা প্রক্রিয়াজাত করে প্রস্তুতকৃত সারকে জৈব সার বলা হয়। আর যেসব উদ্ভিদ জৈব সার তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় কিংবা মাটিতে পচে জৈব পদার্থ ও পুষ্টি উপাদান যোগ করে, সেগুলোকেই জৈব সার উৎপাদনকারী উদ্ভিদ বলা হয়।
গরু ও বাছুরের গোবর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল ব্যবহৃত জৈব সার। গোবরে অসংখ্য জানা–অজানা উদ্ভিদাংশ, আগাছার বীজ ও জৈব উপাদান বিদ্যমান থাকে, যা মাটিতে পচে জৈব পদার্থে রূপান্তরিত হয়। একইভাবে কম্পোস্ট বা আবর্জনা পচা সার তৈরিতেও বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদাংশ, ঝরাপাতা, খড়, আগাছা ও রান্নাঘরের বর্জ্য ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এসব উপাদান একত্রে পচনের মাধ্যমে উৎকৃষ্ট মানের জৈব সারে পরিণত হয়।
এছাড়াও সবুজ সার উৎপাদনের জন্য যেসব উদ্ভিদ ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়, তাদের মধ্যে ধৈঞ্চা, আফ্রিকান ধৈঞ্চা, শনপাট, গোমটর বা বরবটি অন্যতম। কখনো কখনো মাসকলাই ও খেসারীকলাইকেও সবুজ সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এসব উদ্ভিদ সাধারণত দ্রুত বর্ধনশীল এবং অল্প সময়ের মধ্যেই প্রচুর সবুজ জৈব পদার্থ উৎপাদনে সক্ষম।
এদের বাইরে আরও কিছু অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের উদ্ভিদ রয়েছে, যেগুলো সরাসরি সবুজ সার ফসল হিসেবে চাষ না করা হলেও জৈব সার উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এদের মধ্যে নীল-সবুজ শেওলা ও অ্যাযোলা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অনেক ক্ষেত্রে এসব উদ্ভিদকে প্রাণিজ বা জীবাণু সার উৎপাদনের সহায়ক উপাদান হিসেবেও গণ্য করা হয়। জীবাণু সার বা ইনোকুলাম বলতে মূলত পিট মাটির সঙ্গে মিশ্রিত বিভিন্ন প্রজাতির রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়াকে বোঝায়, যা ডালজাতীয় ফসলের শিকড়ে গুটি সৃষ্টি করে বাতাসের মুক্ত নাইট্রোজেন মাটিতে আবদ্ধ করে।
ডাল জাতীয় ফসলের বীজ বপনের পূর্বে জীবাণু সারের সঙ্গে বীজ মিশিয়ে বপন করলে ফসলের ফলন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এতে ফলন ৩০ থেকে ১৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে এবং একই সঙ্গে ফসলের গুণগত মানও উন্নত হয়। ফলে রাসায়নিক নাইট্রোজেন সারের ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব হয়।
জৈব সার উৎপাদনকারী উদ্ভিদের মধ্যে ধৈঞ্চা (Sesbania aculeata) একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সবুজ সার ফসল। এটি শিম (Legume) জাতীয়, গাঢ় সবুজ পত্রবহুল ও দ্রুত বর্ধনশীল বর্ষজীবী উদ্ভিদ। ধৈঞ্চার কান্ড নরম, প্রচুর ডালপালাযুক্ত এবং সাধারণত ৩–৪ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এ উদ্ভিদের শিকড়ে রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়ার গুটি থাকে, যা বাতাসের মুক্ত নাইট্রোজেন মাটিতে আবদ্ধ করে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করে। ধৈঞ্চা দ্রুত পচনশীল হওয়ায় অল্প সময়ের মধ্যেই এটি মাটিতে জৈব পদার্থ সরবরাহ করে।
বর্তমানে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে সংগৃহীত আফ্রিকান ধৈঞ্চা (Sesbania rostrata) উৎকৃষ্ট মানের সবুজ সার উৎপাদনকারী উদ্ভিদ হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে। এ গাছের উচ্চতা সাধারণত ৩–৫ মিটার পর্যন্ত হয় এবং এর কান্ড অত্যন্ত নরম ও পত্রবহুল। কান্ড ও পাতার রং গাঢ় সবুজ হওয়ায় এতে প্রচুর জৈব পদার্থ সঞ্চিত থাকে। আফ্রিকান ধৈঞ্চার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—শুধু শিকড়েই নয়, বরং পুরো কান্ড জুড়ে ৫–৬ সারিতে নাইট্রোজেন আবদ্ধকারী গুটি সৃষ্টি হয়। এর ফলে এ উদ্ভিদ মাটিতে অত্যন্ত বেশি পরিমাণ নাইট্রোজেন ও জৈব পদার্থ যোগ করতে সক্ষম।
এ গাছ বীজ ও কান্ড—উভয় উপায়েই বংশ বিস্তার করতে পারে। বিশেষ করে ভেজা মাটি বা অল্প পানিযুক্ত জমিতে কান্ডের খণ্ড (cutting) ব্যবহার করে সহজেই আফ্রিকান ধৈঞ্চার চাষ করা যায়। প্রায় ৮ সপ্তাহ বয়সের দেশি ধৈঞ্চা ও আফ্রিকান ধৈঞ্চা এক হেক্টর জমিতে যথাক্রমে ২০–২৫ টন এবং ৩০–৩৫ টন জৈব পদার্থ সরবরাহ করতে পারে। একই সঙ্গে এরা প্রায় ১০০ কেজি এবং ২৫০ কেজি নাইট্রোজেন মাটিতে যোগ করতে সক্ষম, যা পরবর্তী ফসলের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

শনপাট
শনপাট একটি গুরুত্বপূর্ণ জৈব সার উৎপাদনকারী উদ্ভিদ। এটি শিম (Legume) জাতীয়, বর্ষজীবী এবং নরম কান্ডবিশিষ্ট পত্রবহুল উদ্ভিদ। সাধারণত এর উচ্চতা ২–৩ মিটার পর্যন্ত হয়। শনপাটের কান্ডে খুব বেশি ডালপালা থাকে না, ফলে গাছটি সহজেই জমিতে মিশে যায় এবং দ্রুত পচনশীল হয়।
শনপাট তুলনামূলকভাবে উঁচু জমিতে ভালো জন্মে এবং খুব অল্প পানিতেও সহজে পচে জৈব সারে পরিণত হতে পারে। এ উদ্ভিদের শিকড়ে নাইট্রোজেন আবদ্ধকারী রাইজোবিয়াম ব্যাকটেরিয়ার গুটি সৃষ্টি হয়, যার মাধ্যমে বাতাসের মুক্ত নাইট্রোজেন মাটিতে যুক্ত হয়। এর ফলে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায় এবং পরবর্তী ফসলের জন্য নাইট্রোজেন সারের চাহিদা কমে যায়।
প্রায় ৭–৮ সপ্তাহ বয়সে শনপাট জমিতে মিশিয়ে দিলে এক হেক্টর জমিতে প্রায় ১৫–১৬ টন জৈব পদার্থ এবং ৬০–৬৫ কেজি নাইট্রোজেন সরবরাহ করতে সক্ষম হয়। স্বল্প সময়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জৈব পদার্থ ও নাইট্রোজেন যোগ করার কারণে শনপাট একটি কার্যকর সবুজ সার ফসল হিসেবে বিবেচিত।
অন্যান্য জৈব সার উৎপাদনকারী শিমজাতীয় ফসল
জৈব সার উৎপাদনকারী অন্যান্য পরিচিত ফসলের মধ্যে গোমটর বা বরবটি, খেসারী এবং মাসকলাই আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে পরিচিত। এসব ফসলও শিম জাতীয় হওয়ায় এদের শিকড়ে প্রচুর পরিমাণ নাইট্রোজেন আবদ্ধকারী গুটি সৃষ্টি হয় এবং মাটিতে নাইট্রোজেন যোগ করতে পারে।
এই ফসলগুলো সাধারণত লতা জাতীয় এবং গাছের উচ্চতা তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় ধৈঞ্চা বা শনপাটের মতো বিপুল পরিমাণ জৈব পদার্থ সরবরাহ করতে পারে না। তবে এদের একটি বড় সুবিধা হলো—মাটিতে অল্প পানি থাকলেও এগুলো সহজেই পচে যায় এবং দ্রুত মাটির সঙ্গে মিশে যায়।
গোমটর, বরবটি, খেসারী ও মাসকলাই প্রতি হেক্টর জমিতে আনুমানিক ৩–৮ টন জৈব পদার্থ এবং ১২–২৫ কেজি নাইট্রোজেন যোগ করতে সক্ষম। প্রধান ফসলের মধ্যবর্তী সময়ে বা মিশ্র ফসল হিসেবে এসব ফসল চাষ করলে জমিতে জৈব পদার্থ ও নাইট্রোজেনের ঘাটতি অনেকাংশে পূরণ করা সম্ভব।
অ্যাযোলা (Azolla)
অ্যাযোলা এক প্রকার জলজ ফার্ণ (ঢেঁকিশাক) জাতীয় ভাসমান উদ্ভিদ, যা জৈব সার উৎপাদনে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি অ্যাযোলা দে পানা, কুটিপানা, তেতুলিয়া পানা, সুতিপানা ইত্যাদি নামে পরিচিত। অ্যাযোলা সাধারণত গুচ্ছাকারে জন্মায়। প্রতিটি ত্রিকোণাকার গুচ্ছের দৈর্ঘ্য প্রায় ১০–১৫ মিলিমিটার এবং প্রস্থ ১০–১২ মিলিমিটার হয়ে থাকে।
অ্যাযোলা যৌন (Sexual) ও অঙ্গজ (Vegetative) উভয় উপায়ে বংশ বিস্তার করতে পারে এবং অল্প পানিতেই (৫–১০ সেমি) দ্রুত বৃদ্ধি পায়। কাদা মাটিতেও অ্যাযোলা ভালোভাবে বেঁচে থাকতে সক্ষম। সাধারণত ২৫–৩০° সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এটি অতি দ্রুত অঙ্গজ বংশবিস্তার করে। হেক্টর প্রতি ৮–১০ কেজি টিএসপি প্রয়োগ করলে অ্যাযোলার বংশবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হয়।
প্রতিকূল পরিবেশে অ্যাযোলা পাতার নিম্নাংশে স্পোর তৈরি করে এবং অনুকূল পরিবেশে সেই স্পোরের মাধ্যমে যৌন প্রক্রিয়ায় বংশ বিস্তার করে। প্রাথমিকভাবে প্রতি বর্গমিটারে ১০০–২০০ গ্রাম অ্যাযোলা অল্প পানিযুক্ত জমিতে ছড়িয়ে দিলে ১০–১২ দিনের মধ্যে জমির উপরিভাগে একটি ঘন স্তর তৈরি হয়। এরপর জমি থেকে পানি সরিয়ে নিয়ে ওই স্তরটি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হয়।
একটি ধান ফসলে সাধারণত ২–৩ বার অ্যাযোলা প্রয়োগ করা যায়। এক স্তর অ্যাযোলা হেক্টর প্রতি প্রায় ১০–১৫ টন সবুজ সার উৎপাদন করতে সক্ষম। অ্যাযোলা যে জমিতে জন্মানো হয়, সে জমিতেই অথবা অন্য জমিতেও মাটির সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করা যায়। ধান ক্ষেতে ২–৩ সেন্টিমিটার পানি জমা থাকলে ধান বপন বা রোপণের পর সরাসরি সেখানে অ্যাযোলা জন্মানো সম্ভব। অ্যাযোলা প্রতি হেক্টরে প্রায় ৩০–৪০ কেজি নাইট্রোজেন মাটিতে যোগ করতে পারে।
নীল-সবুজ শেওলা (Blue Green Algae)
নীল-সবুজ শেওলা চুলের মতো সরু, লম্বা ও পিচ্ছিল প্রকৃতির হয় এবং দেখতে নীলাভ সবুজ বর্ণের। এ শেওলা সাধারণত বদ্ধ পানিতে, নালা, ডোবা, ধান বা পাট ক্ষেতে জন্মাতে দেখা যায়। এছাড়াও পুরনো ইটের দেয়াল বা স্যাঁতসেঁতে মেঝেতেও এ শেওলার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
নীল-সবুজ শেওলা উৎপাদনের জন্য ১ × ২ × ০.২ ঘনমিটার আকারের একটি লোহার পাত্রে প্রায় ১০ কেজি মাটি ভর্তি করে ১০ সেন্টিমিটার উচ্চতায় পানি দিতে হয়। এরপর এতে প্রায় ৭০ গ্রাম টিএসপি মিশিয়ে ২০০ গ্রাম শুকনো শেওলা ছিটিয়ে দিলে এক সপ্তাহের মধ্যে একটি পুরু স্তর তৈরি হয়। পরে পাত্রের পানি শুকিয়ে গেলে শেওলাটি সংগ্রহ করে শুকিয়ে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
ধান রোপণের প্রায় ৭ দিন পর জমিতে ৫–১০ সেন্টিমিটার পানি থাকা অবস্থায় হেক্টর প্রতি প্রায় ১৫ কেজি শেওলা ছিটিয়ে প্রয়োগ করা হয়। এর মাধ্যমে প্রতি হেক্টরে আনুমানিক ২০–২৫ কেজি নাইট্রোজেন মাটিতে যোগ হয়, যা ধান ফসলের বৃদ্ধি ও ফলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

