আজকের আলোচনার বিষয় — উদ্যোক্তার সংজ্ঞা ও ধরন। বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পেছনে উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্যোক্তা কেবল ব্যবসা শুরু করেন না, বরং সমাজে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে, নতুন চিন্তা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে জাতির উন্নয়নে অবদান রাখেন।
Table of Contents
উদ্যোক্তার সংজ্ঞা ও ধরন

উদ্যোক্তা (Entrepreneur)
“উদ্যোক্তা” শব্দটি এসেছে “উদ্যোগ” শব্দ থেকে, যার অর্থ হলো — কোনো কাজ শুরু করার মনোভাব বা প্রেরণা।
ইংরেজিতে Entrepreneur শব্দটির অর্থ — এমন এক ব্যক্তি যিনি নিজের উদ্ভাবনী চিন্তা, পরিশ্রম, ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতা ও নেতৃত্বের ক্ষমতা দিয়ে একটি নতুন ব্যবসা বা প্রকল্প গড়ে তোলেন।
অর্থনীতিতে উদ্যোক্তা সেই ব্যক্তি, যিনি উৎপাদনের চারটি উপাদান — ভূমি, শ্রম, পুঁজি ও সংগঠন — এর সমন্বয় ঘটিয়ে লাভজনক উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টিতে উদ্যোক্তার সংজ্ঞা
জোসেফ এ. শুম্পিটার (Joseph A. Schumpeter) বলেন,
“উদ্যোক্তা হলো অর্থনীতির চালিকাশক্তি, যার প্রধান কাজ হলো নতুন কিছু উদ্ভাবন (Innovation) করা এবং পরিবর্তনের মাধ্যমে উন্নয়ন সাধন করা।”লিবেনস্টেইন (Leibenstein) বলেন,
“উদ্যোক্তা এমন এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তি, যিনি সব বাধা ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও সাফল্যের পথ তৈরি করেন।”ড্রাকার (Peter Drucker) এর মতে,
“উদ্যোক্তা সুযোগকে কাজে লাগাতে জানেন এবং সৃজনশীল চিন্তাকে বাস্তবে রূপ দেন।”
অতএব, একজন উদ্যোক্তা কেবল ব্যবসায়ী নয়, বরং একজন নেতা, উদ্ভাবক, ঝুঁকি গ্রহণকারী ও সমাজ পরিবর্তনের অনুঘটক।
উদ্যোক্তার বৈশিষ্ট্য (Characteristics of an Entrepreneur)
উদ্যোক্তার সাফল্য তার ব্যক্তিত্ব, দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মদক্ষতার ওপর নির্ভরশীল। সফল উদ্যোক্তার কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিচে তুলে ধরা হলো:
১. উদ্ভাবনী মনোভাব (Innovativeness):
নতুন পণ্য, নতুন সেবা বা নতুন ধারণা তৈরি করার ক্ষমতা একজন উদ্যোক্তার সবচেয়ে বড় গুণ।
২. ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতা (Risk-taking ability):
অনিশ্চয়তার মাঝেও সিদ্ধান্ত নিতে পারা এবং ঝুঁকি নিতে সাহস থাকা।
৩. দূরদর্শিতা ও লক্ষ্যনিষ্ঠা (Vision & Goal-orientation):
উদ্যোক্তা সর্বদা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করে এগিয়ে যান এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকেন।
৪. পরিশ্রম ও অধ্যবসায় (Hard Work & Perseverance):
তিনি জানেন যে সাফল্যের পেছনে ধৈর্য ও অবিরাম পরিশ্রমই আসল চাবিকাঠি।
৫. নেতৃত্ব ও সংগঠন দক্ষতা (Leadership & Management Skills):
তিনি অন্যদের উদ্বুদ্ধ করতে পারেন, দল পরিচালনা করতে পারেন এবং কাজের সুষ্ঠু সমন্বয় ঘটাতে পারেন।
৬. নৈতিকতা ও দায়বদ্ধতা (Integrity & Responsibility):
সমাজ, পরিবেশ ও কর্মীদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকা একজন প্রকৃত উদ্যোক্তার চিহ্ন।
উদ্যোক্তার প্রকারভেদ (Types of Entrepreneurs)
উদ্যোক্তাদের কাজের ধরন, চিন্তাধারা ও উদ্ভাবনী শক্তি অনুযায়ী বিভিন্নভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা যায়। নিচে প্রধান কিছু ধরন তুলে ধরা হলো—
১. উদ্ভাবনী উদ্যোক্তা (Innovative Entrepreneur):
যিনি নতুন পণ্য, প্রযুক্তি বা বাজার সৃষ্টি করেন। যেমন: স্টিভ জবস, ইলন মাস্ক।
২. অনুকারক উদ্যোক্তা (Imitative Entrepreneur):
যারা অন্যের সফল উদ্যোগ দেখে তা নিজ দেশে বা অঞ্চলে বাস্তবায়ন করেন।
৩. সামাজিক উদ্যোক্তা (Social Entrepreneur):
যারা সমাজের উন্নয়নমূলক কাজে উদ্যোগ নেন, যেমন দরিদ্র বিমোচন, শিক্ষা বা পরিবেশ রক্ষা।
৪. কর্পোরেট উদ্যোক্তা (Corporate Entrepreneur):
বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের ভেতরে উদ্ভাবন ঘটিয়ে প্রতিষ্ঠানকে আরও উন্নত করেন।
৫. গ্রামীণ উদ্যোক্তা (Rural Entrepreneur):
যারা কৃষি, পশুপালন, হস্তশিল্প বা স্থানীয় সম্পদ ব্যবহার করে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখেন।
৬. প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোক্তা (Tech-based Entrepreneur):
তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার, রোবটিক্স বা অনলাইন ব্যবসার ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী কাজ করেন।
উদ্যোগীকরণ (Entrepreneurship)
উদ্যোগীকরণ হলো সেই প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে একজন ব্যক্তি উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা, জ্ঞান, দক্ষতা ও প্রেরণা অর্জন করেন।
এটি কেবল ব্যবসা শুরু করা নয়, বরং একধরনের চিন্তার ধারা ও মনোভাব, যা মানুষকে আত্মনির্ভরশীল হতে শেখায়।
উদ্যোগীকরণ প্রক্রিয়ায় তিনটি ধাপ রয়েছে—
১. প্রেরণা সৃষ্টি (Motivation): নিজের ভেতরে আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করা।
২. পরিকল্পনা (Planning): উদ্যোগের লক্ষ্য, সম্ভাবনা ও সম্পদ নির্ধারণ করা।
৩. বাস্তবায়ন (Implementation): নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
বর্তমান বিশ্বের প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে উদ্যোক্তার গুরুত্ব অপরিসীম। একজন দক্ষ উদ্যোক্তা কেবল নিজের জীবনে সফলতা আনে না, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটায়। তাই শিক্ষার্থীদের উচিত উদ্যোক্তা হওয়ার মানসিকতা তৈরি করা, ছোট উদ্যোগ থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে বড় স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
