আজকে আমাদের আলোচনার বিষয় কৃষিতে উদ্যোক্তা উন্নয়ন, সমস্যা ও সম্ভাবনা
Table of Contents
কৃষিতে উদ্যোক্তা উন্নয়ন, সমস্যা ও সম্ভাবনা

কৃষিতে উদ্যোক্ত উন্নয়ন (Agricultural entepreneurship development)
কৃষি উন্নয়নের মূল কথা হলো বিজ্ঞানভিত্তিক লাগসই কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার। উদ্যোক্তা উন্নয়ন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কৃষি ত্রে বাণিজ্যিক সম্ভাবনাময় প্রতিশ্রুতিশীল প্রযুক্তির পূর্ণ প্রয়োগ ও বহুল ব্যবহার নিশ্চিত করতে উদ্যমী কৃষক বা অন্যকে প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনায় দ করে খামার সৃষ্টিতে উপযোগী করে গড়ে তোলা যায় ।
খামার ব্যবস্থা ও পরিবেশ গবেষণা বিভিন্ন কৃষি পরিবেশে লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে ভরণ-পোষণ খামারে উৎপাদন বাড়াচ্ছে। গবেষণার এটা প্রাথমিক উদ্দেশ্য। আর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হচ্ছে ভরণ-পোষণ খামারকে উন্নীত করে লাভজনক বাণিজ্যিক খামারে পরিণত করা বা খামার বাণিজ্যিকীকরণ। উদ্যোক্তা উন্নয়ন হচ্ছে প্রাথমিক ও চূড়ান্ত উদ্দেশ্যের মধ্যবর্তী পর্যায় বা সংযোগ। সং েপে ব্যাখ্যা করলে এটা হবে নিম্নরূপ-
ভরণ-পোষণ খামার → উদ্যোক্তা উন্নয়ন → বাণিজ্যিক খামার।
উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রক্রিয়া (Process of enterepreneurship development )
উদ্যোক্তা একটি কৃষি পরিবেশে প্রথমে ছোট আকারে কৃষি খামার করে সেখানে কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার, ব্যবস্থাপনা ও বাজার সুবিধা যচাই প্রভৃতিতে বাস্তব জ্ঞান লাভ, অভিজ্ঞতা ও দতা অর্জন করতে থাকেন। এটাকে খামার বাণিজ্যিকীকরণ প্রশিণ বলা যেতে পারে। এভাবে প্রযুক্তিগত দুর্বলতা বা অসুবিধা নিরী ণ করে পরিবর্তন/পরিবর্ধন দ্বারা প্রযুক্তিকে বাণিজ্যিকভাবে উপযোগী করা যায় ।
পরবর্তীতে উদ্যোক্তাগণ দ তা ও আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে নিশ্চিন্তে নিজেরাই কৃষি খামার সৃজনে এগিয়ে যেতে পারেন। উৎপাদন বাড়ার ফলে পণ্য বা দ্রব্যের গ্রাহক পরিধিও ক্রমে বেড়ে যায় । এই উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রক্রিয়াটি চিত্র ৯-এ দেখানো হলো।

চিত্র : ভরণ-পোষণ খামার হতে বাণিজ্যিক খামার সৃষ্টির মধ্যবর্তী উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রক্রিয়া
উদ্যোক্তা উন্নয়নে সমস্যা
দেশের কৃষি পরিবেশ, আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং সুযোগ-সুবিধার বিভিন্নতার জন্য উদ্যোক্ত উন্নয়নে নানাবিধ সমস্যা বিদ্যমান। এগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন- (১) কারিগরি সমস্যা (Technical problems ), (২) পরিবেশগত সমস্যা (Environmental problems) এবং (৩) অর্থনৈতিক সমস্যা (Economic problems)। প্রতিটি সমস্যাকে সংপ্তি আকারে ব্যাখ্যা করা হলো।
কারিগরি সমস্যা
বিদ্যমান কারিগরি সমস্যা নিম্নরূপ-
১. প্রতিটি উদ্যোগই সফল হয় লাগসই কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারে- এ কথাটি সম্পর্কে উদ্যোক্তাদের অসচেতনতা ।
২. কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহারে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দ তা প্রয়োজন— এটা গ্রহণ করতে উদ্যোক্তাদের অনীহা।
৩. লাগসই প্রযুক্তির উৎস এবং উদ্যোক্তাদের মধ্যে কার্যকর সংযোগের অভাব
৪. প্রযুক্তির শর্ত মোতাবেক কাজ করার দ শ্রমিকের অভাব।
৫. খামার পরিকল্পনায় বিশেষত প্রযুক্তি পরিকল্পনায় বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ না করা।
৬. সমন্বিত কৃষি প্রযুক্তির সুবিধা সম্পর্কে অসচেতনতা ।
পরিবেশগত সমস্যা
গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সমস্যা নিম্নরূপ-
১. কৃষি উৎপাদন জৈবিক প্রক্রিয়ায় (Biological process) সম্পন্ন হয়, তাই পরিবেশ নির্ভর এ কথার গুরুত্ব না দেয়া ।
২. কোন পরিবেশে কোন খামার লাভজনক, পরিবেশগত ঝুঁকি আছে কিনা- উদ্যোক্তাদের এ বিষয়ে চিন্তা না করা।
৩. উৎপাদনের শুরু হতে শেষ পর্যন্ত অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ না থাকলে তার সমাধানে বিকল্প চিন্তা না করা।
৪. উৎপাদনের উপকরণ প্রাকৃতিকভাবে কতটুকু আর সংগ্রহ, উৎপাদন বা ক্রয় করে কতটুকু খামার পরিবেশ পাওয়া যাবে- তার সমন্বয় না করা।
৫. সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, উত্তম যোগাযোগের পরিবেশগত সমস্যা।
৬. পণ্য বিপণনে বাজার পরিবেশের প্রভাব চিন্তা না করা।
৭. অনাকর্ষণীয় ও অসংগঠিত কৃষি বাজার পরিবেশ।
অর্থনৈতিক সমস্যা
বিরাজমান অর্থনৈতিক সমস্যা নিম্নরূপ-
১. উদ্যোক্তাদের আর্থিক সঙ্গতি সীমিত ।
২. প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ ব্যবস্থা অপ্রতুল এবং দ্র উদ্যোক্তাদের অনুকূল নয় ।
৩. প্রকল্প বাজেট পরিকল্পনা ও প্রযুক্তির েত্রে বাস্তবতা সম্পন্ন না হয়ে আনুমানিক হওয়া।
৪. অর্থলগ্নী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক কারিগরি ও পরিদর্শন সহযোগিতা প্রদান না করা।
৫. শিল্প উদ্যোগের ন্যায় কৃষি উদ্যোগে অতি দ্রুত মুনাফা অর্জনের মানসিকতা ।
৬. কৃষি শিল্প ঋণ অন্যান্য খাতে খাটানো।
উদ্যোক্তা উন্নয়ন সম্ভাবনা (Potentials of entrepreneurship development )
উদ্যোক্ত উন্নয়নের বিভিন্ন সমস্যা এবং দেশের প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা (বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, শিলাবৃষ্টি মেনে নিলেও কৃষি উদ্যোক্তা উন্নয়নে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপ্তি বা সংঘবদ্ধভাবে বহু সফল কৃষি খামার উদ্যোগ বিদ্যমান। একটি সংপ্তি তালিকা নিম্নে দেয়া হলো –
১। ফসলজাত খামার : চা, রাবার, আম, লিচু, কাঁঠাল, আনারস, পেঁপে, পেয়ারা, লেবু, নার্সারী বা চারা, শস্য ও শাকসবজীর বীজ, নারিকেল, কলা, জেম, জেলী, শরবত।
২। পশুপাখিজাত খামার : দুগ্ধ, গরু মোটাতাজাকরণ, হাঁস, মুরগী, ব্রয়লার, হাঁস-মুরগীর বাচ্চা।
৩। মাৎস্যজাত খামার : চিংড়ি খামার, জলমহাল, মৎস্য হ্যাচারী, মাছ চাষের পুকুর-দীঘি, চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ, মাছ হিমায়িতকরণ।
এ ছাড়াও ভবিষ্যতে সম্ভাবনাময় কৃষি উদ্যোগের ত্রেগুলো হচ্ছে-
১। ফসল : তৈলবীজ, ডাল, ই, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, মরিচ, আনারস প্রক্রিয়াজাতকরণ, পেঁপেঁ, পেয়ারা, লেবু, বিভিন্ন কাঠের বন।
২। পশুপাখি : ছাগল, মহিষ, ভেড়া, সংকরজাত গরু, উন্নত জাতের হাঁস-মুরগী, ঘি, মাখন, পনির
৩। মাৎস্য : সকল পুকুরে মিশ্র মাছ, ধান তে মাছ, ধান তে চিংড়ি চাষ, বড় আকারের পোনার চাষ, পচা ডোবায় মাগুর চাষ।
৪। সমন্বিত খামার : ফসল, পশুপাখি ও মাৎস্য এই তিনটির যে কোন সমন্বিত উদ্যোগ সর্বাপে লাভজনক হয়।
উদ্যোক্তা উন্নয়ন দেশে কৃষিজাত পণ্য আমদানি কমিয়ে রপ্তানী বাড়াতে সম। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়তা করবে।
