গৃহপালিত পশু পাখির সম্পূরক খাদ্য

আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় গৃহপালিত পশু পাখির সম্পূরক খাদ্য – যা কৃষি প্রযুক্তি : বীজ, মাছ ও পশু-পাখির খাদ্য সংরক্ষণ এর অন্তর্ভুক্ত ।

গৃহপালিত পশু পাখির সম্পূরক খাদ্য

 

গৃহপালিত পশু পাখির সম্পূরক খাদ্য

 

খাদ্য (Food)

সাধারণভাবে খাওয়ার যোগ্য যে কোন দ্রব্যকেই খাদ্য বলে । কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায় খাদ্য হলো সেসব দ্রব্য যা প্রাণী। আহার হিসেবে গ্রহণ করে এবং পরিপাক, শোষণ ও বিপাকের পর তা দেহে ব্যবহৃত হয় । যেমন:- ঘাস, খৈল, ভুসি ইত্যাদি ।

পুষ্টি উপাদান (Nutrients)

এটি এমন একটি দ্রব্য যা গবাদিপশু ও পাখির দৈহিক বৃদ্ধি, পুষ্টি সাধন, দেহরক্ষা, প্রজনন ও দেহের অন্যান্য কার্যক্রমে সাহায্য করে । পুষ্টি উপাদানকে ছয় ভাগে ভাগ করা যায় । যেমন:- আমিষ, শর্করা, স্নেহপদার্থ, ভিটামিন, খণিজপদার্থ ও পানি ।

সুষম খাদ্য (Balanced Diet)

যেসব খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে দেহের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানসমূহ সঠিক অনুপাতে বিদ্যমান থাকে তাদের সুষম খাদ্য বলে । দেহের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও উৎপাদনের জন্য সুষম খাদ্য অপরিহার্য ।

সম্পূরক খাদ্য (Supplementary Diet)

উপাদানসমূহ সঠিক অনুপাতে বিদ্যমান থাকে না। সে কারণে গবাদিপশু ও পাখি থেকে অধিক দুধ, মাংস ও ডিম গবাদিপশু প্রাকৃতিকভাবে বিচরণ করে যেসব খাদ্য খায় সেসব খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে সব সময় দেহের প্রয়োজনীয় পুষ্টি উৎপাদনের জন্য এসব খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে আমিষ, স্নেহপদার্থ, ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি উপাদানসমৃদ্ধ অতিরিক্ত খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ করতে হয় । এই অতিরিক্ত খাদ্যদ্রব্যকেই সম্পূরক খাদ্য বলে থাকে ।

খাদ্যের কাজ

খাদ্যের প্রথম ও অত্যাবশ্যকীয় কাজ হলো গবাদিপশু ও পাখি তথা প্রাণীর জীবন রক্ষা করা। এছাড়াও খাদ্য নিম্নলিখিত কাজের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত । যেমন:-

  • প্রাণিদেহের ক্ষয় রোধ করা ।
  • দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা ।
  • দৈহিক বৃদ্ধি সাধন ও ভারসাম্য রক্ষা করা ।
  • উৎপাদন ক্ষমতা রক্ষা ও বৃদ্ধি করা (গবাদিপশুর ক্ষেত্রে মাংস ও দুধ এবং গৃহপালিত পাখির ক্ষেত্রে ডিম ও মাংস উৎপাদন) ।
  • দেহ থেকে বিষাক্ত পদার্থ বেরিয়ে যেতে সাহায্য করা ।

রসদ বা খাদ্য তালিকা

রেশন (Ration) বলে। রসদ দুই প্রকার। যথা:- দেহরক্ষাকারী রসদ ও উৎপাদন রসদ। গবাদিপশু ও পাখি যখন বিশ্রামরত অবস্থায় থাকে তখন তাদেরক যে রসদ দেয়া হয় তা হলো দেহরক্ষাকারী রেশন।

অন্যদিকে, গবাদিপশু ও কোন গবাদিপশু ও পাখিকে সারাদিনে অর্থ্যাৎ ২৪ ঘন্টার মধ্যে যে খাদ্য সরবরাহ করা হয় তাকে রসদ, খাদ্যতালিকা বা পাখিকে যখন দেহরক্ষাকারী রসদের সঙ্গে তার উৎপাদন, যেমন:- দৈহিক বৃদ্ধি ও দুধ উৎপাদন, গর্ভাবস্থা, হালচাষ, ডিম ও মাংস উৎপাদন প্রভৃতির জন্য অতিরিক্ত রসদ সরবরাহ করা হয় তখন সে রসদকে উৎপাদন রসদ বলে ।

এটি গবাদিপশু ও পাখির দৈহিক ওজন ও উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে । উৎপাদন মাত্রা বেশি হলে একই দৈহিক ওজনবিশিষ্ট গবাদিপশু ও পাখির উৎপাদন রসদের চাহিদা বৃদ্ধি পায় ।

 

গৃহপালিত পশু পাখির সম্পূরক খাদ্য

 

আদর্শ রসদের বৈশিষ্ট্য

  • একটি আদর্শ রসদ বা খাদ্যতালিকায় প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানগুলো সঠিক অনুপাতে থাকবে ।
  • রসদে ব্যবহৃত উপকরণ অবশ্যই সুস্বাদু হবে ।
  • রসদে যথাসম্ভব বেশি উপকরণ যোগ করা উচিত ।
  • রসদের খাদ্য উপকরণগুলোতে কোন বিষাক্ত পদার্থ থাকবে না ।
  • রসদ অবশ্যই রেচক (Laxative) হবে ।
  • রসদ আয়তনে বেশি হবে (Bulky) ।
  • রসদে কাঁচা ঘাসজাতীয় খাদ্যদ্রব্য বেশি পরিমাণে ব্যবহার করা উচিত ।
  • হঠাৎ করে রসদে পরিবর্তন আনা যাবে না।
  • প্রতিদিন একই সময়ে রসদ সরবরাহ করতে হবে ।
  • রসদ তৈরির সময় অর্থনৈতিক দিক লক্ষ্য রাখতে হবে ।
  • একই জাতের ও একই বয়সের গবাদিপশু ও পাখিদের একই খাদ্যতালিকা সরবরাহ করতে হবে ।
  • রসদে প্রয়োজনীয় খণিজ উপাদান বিদ্যমান থাকবে ।

 

গৃহপালিত পশু পাখির সম্পূরক খাদ্য

 

রসদ তৈরিতে বিবেচ্য বিষয়সমূহ

যে কোন গবাদিপশু বা পাখির জন্য রসদ বা রেশন তৈরি করতে কিছু বিষয় বিবেচনা করতে হয় । এখানে এগুলো উল্লেখ করা হলো:-

  • রসদ তৈরির উদ্দেশ্য কি তা জানতে হবে ।
  • কোন্ বয়সের গবাদিপশু পাখির জন্য রসদ তৈরি করা হবে তা জানতে হবে ।
  • গবাদিপশু বা পাখিটি উৎপাদনের কোন স্তরে আছে তা জানতে হবে ।
  • গবাদিপশু বা পাখিটির অসুস্থ হওয়া চলবে না ।
  • রসদে ব্যবহৃত খাদ্য উপকরণগুলোর রাসায়নিক গঠন জানতে হবে।
  • খাদ্য উপকরণে শক্তির হিসাব জানতে হবে ।
  • খাদ্য উপকরণ সস্তা ও সহজলভ্য হতে হবে।
  • খাদ্য উপকরণে কোন বিষাক্ত (Toxic) পদার্থ আছে কি-না তা জানতে হবে।
  • গবাদিপশু বা পাখির দৈহিক ওজন জানতে হবে ।
  • প্রয়োজনীয় ভিটামিনসমৃদ্ধ খাদ্য উৎস অন্তর্ভূক্ত করতে হবে ।

 

শিক্ষার্থীর কাজ

গৃহপালিত পশু-পাখির আদর্শ রসদ বা খাদ্যতালিকা তৈরির বিবেচ্য বিষয়গুলো নিয়ে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে আলোচনা করবে ।

সারসংক্ষেপ

খাওয়ার যোগ্য যে কোন দ্রব্যই খাদ্য। খাদ্যে সর্বমোট ছয়টি পুষ্টি উপাদান রয়েছে। যেসব খাদ্যদ্রব্যে এই উপাদানগুলো সঠিক অনুপাতে থাকে সেগুলোই সুষম খাদ্য । গৃহপালিত পশু-পাখি থেকে বেশি পরিমাণে দুধ, মাংস ও ডিম পেতে হলে তাদেরকে সম্পূরক খাদ্য দিতে হবে । পশু-পাখিকে ২৪ ঘন্টায় প্রদানকৃত খাদ্যকে রসদ, খাদ্যতালিকা বা রেশন বলে । গৃহপালিত পশু-পাখি থেকে কাঙ্খিত উৎপাদন পেতে হলে সঠিক রসদ সরবরাহ করতে হবে ।

 

Leave a Comment