আজকে আমাদের আলোচনার বিষয়-অপুষ্টি ও পরজীবীজনিত রোগ। দেহের ক্ষয়পূরণ করে বৃদ্ধি সাধন করার জন্য এবং দেহে প্রয়োজনীয় শক্তি অর্জনের জন্য জীবিত যে কোনো জীবের জন্য খাদ্য একান্তভাবে প্রয়োজন। এজন্য জীব যা গ্রহণ করে, তাই খাদ্য হিসেবে চিহ্নিত। খাদ্য দেহে যে প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়, তাকে পুষ্টি প্রক্রিয়া বলে।
যে কোনো জীবের পুষ্টি প্রক্রিয়াই যথেষ্ট জটিল কার্যপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। মাছের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইরকম। পুষ্টি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গৃহীত খাদ্য পরিপাক ও শোষিত হয়। এবং তা দেহের বিভিন্ন প্রকার ক্ষয় পূরণ, বৃদ্ধি সাধন এবং শক্তি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
সাধারণভাবে মাছ চাষের ক্ষেত্রে অপুষ্টির কারণে রোগের প্রকাশ বেশি পরিমাণে দেখা যায়। বাংলাদেশের জলাশয়সমূহের মাছে যেসব পুষ্টিজনিত রোগ দেখা যায়, সেসব সম্পর্কে নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
Table of Contents
অপুষ্টি ও পরজীবীজনিত রোগ

মাছের অপুষ্টিজনিত রোগ
মাছের পুষ্টির জন্য সাধারণভাবে যেসব খাদ্যোপাদান প্রয়োজন, তার মধ্যে প্রধানগুলো হচ্ছে, (ক) আমিষ, (খ) শর্করা, (গ) চর্বি, (ঘ) ভিটামিন, (ঙ) খনিজ পদার্থ এবং (চ) পানি। খাদ্যে উপরোক্ত পুষ্টি উপাদানসমূহ যথাযথ মাত্রায় না থাকলে পুষ্টির অভাবজনিত রোগ সৃষ্টি হয়। এছাড়া খাদ্যে কিছু পুষ্টিবিরোধী উপাদান থাকে, যেগুলো মাছের রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী। নিচে পুষ্টির অভাবজনিত রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
(ক) আমিষের অভাবজনিত রোগ :
খাদ্যে প্রয়োজনীয় আমিষের অভাবে মাছের দৈহিক বর্ধন হ্রাস পায়। এছাড়া এতে মাছের বৃক্কে অস্বাভাবিক মাত্রায় ক্যালসিয়াম জমা হয়। একে রেনাল ক্যালশিনোসিস বলা হয়। খাদ্যে ট্রিপটোফেন এবং মেথিওনিন নামক দুটি অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিডের উপস্থিতি কম হলে চোখে ছানি পড়তে পারে।
(খ) চর্বির অভাবজনিত রোগ
মাছের খাদ্যে চর্বিজাতীয় পদার্থের উপস্থিতি কম হলে মাছে। রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। দেহের জন্য অত্যাবশকীয় চর্বির অভাব ঘটলে মাছের বৃক্ক ফ্যাকাশে হয়ে যায় এবং ফুলে যায়। এতে মাছের মৃত্যুও ঘটতে পারে।
(গ) ভিটামিনের অভাবজনিত রোগ :
খাদ্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণে ভিটামিন না থাকলে মাছের দেহে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন-
(১) ভিটামিন এ-এর অভাবে মাছ অন্ধ হয়ে যেতে পারে।
(২) ভিটামিন ডি-এর অভাবে মাছের বৃক্ক ক্ষয়প্রাপ্ত এবং ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
(৩) ভিটামিন ই-এর অভাবে মাছের রক্তশূন্যতা দেখা দেয়।
(৪) ভিটামিন সি-এর অভাবে মাছের দেহে ক্ষত সৃষ্টি হলে তা শুকাতে দেরি করে।
৫) ভিটামিন বি৫ এর অভাবে মাছের ফুলকাতে ক্ষত রোগ দেখা দেয়।
(৬) ভিটামিন বি১ এর অভাবে মাছের দেহে অবশতা দেখা দেয় এবং মাছ মৃত্যুবরণ করে।
(৭) ভিটামিন বি৩ এর অভাবে মাছের পেটে অত্যধিক পরিমাণে পানি জমা হয়।

(ঘ) খনিজ পদার্থের অভাবজনিত রোগ
খাদ্যে খনিজ পদার্থের বিশেষত খনিজ লবণের অভাব ঘটলে মাছের অস্থি গঠনে বাধা সৃষ্টি হয়। খাদ্যে দস্তার পরিমাণ কম হলে মাছের চোখে ছানি পড়ে এবং খাদ্যে আয়োডিনের অভাব হলে মাছে থাইরয়েড গ্রন্থিজনিত সমস্যা দেখা দেয়।
সাধারণভাবে মাছ চাষের ক্ষেত্রে পরজীবীঘটিত রোগের প্রকোপ বেশি পরিমাণে দেখা যায়। পরজীবী হলো এমন এক ধরনের জীব যার নিজের দেহের চেয়ে বড় আকারের কোন জীবের দেহে বসবাস করে, সেই জীবের দেহ থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করে নিজের দৈহিক পুষ্টি এবং অস্তিত্ব বজায় রাখে কিন্তু সেই বড় আকারের জীবের দেহে নানা ধরনের সমস্যা এমনকি তার মৃত্যুরও কারণ হয়ে দাঁড়ায় বড় আকারের এই জীব পোষক নামে পরিচিত।
পরজীবী তীব্রতার মাত্রা এবং এসব পরজীবী রোগের কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জলাশয়ভেদে নানারকম হয়ে থাকে। জলজ পরিবেশ বেশি পরিমাণে জৈব পদার্থের উপস্থিতি এবং বেশি তাপমাত্রার কারণে জলাশয়ে জৈব পদার্থসমূহের যে পচন সংঘটিত হয়, মূলত তা-ই জলাশয়ের মাছে নানা ধরনের পরজীবীর সংক্রমণ ঘটায়। বাংলাদেশের জলাশয়সমূহের মাছে যেসব পরজীবী দেখা যায়, ধরন অনুযায়ী সে সবকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন-
(ক) প্রেটোজোয়ান পরজীবীঘটিত রোগ (Protozoan Disease)
(খ) বহুকোষী পরজীবীঘটিত রোগ (Metazoan Disease) নিচে মাছের বিভিন্ন ধরনের পরজীবী সম্পর্কে আলোচনা করা হচ্ছে।
১. প্রোটোজোয়াঘটিত রোগ
এ ধরনের রোগ সাধারণত কার্প জাতীয় মাছেই বেশি দেখা যায়। এসব পরজীবী সাধারণত মাছের দেহের আভারীণ এবং বাহ্যিক বা বহিস্থ উভয় ধরনের পরজীবী হিসেবেই বিরাজ করে। এজাতীয় পরজীবী দ্বারা আক্রাড় হলে মাছে সাধারণত কোন ধরনের লক্ষণ প্রকাশ পায় না।
তবে মাছ ক্রমশই দুর্বল হতে থাকে এবং একসময় মারা যায়। বাংলাদেশের জলাশয়সমূহে সাধারণত নিলিখিত ধরনের প্রোটোজোয়া পরজীবী দেখা যায়।
(১) সাদা দাগ রোগ বা ইকথাইয়োপথিরিয়াসিস
(২) ট্রাইকোডিনিয়াসিস
(৩) মিক্সোসপোরিডিয়াসিস
(৪) কৃমিসৃষ্ট রোগ
নিচে এসব রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হচ্ছে।
সাদা দাগ রোগ
রোগ জীবাণু :
এটি এক ধরনের এককোষী পরজীবীসৃষ্ট রোগ। এ রোগের জীবাণুর নাম। ইকথায়োপথিরিয়াস মালটিফিলিস (Icthyopthirius multiphilis)।
রোগের বির:
বাংলাদেশে যেসব জলাশয়ে কার্প জাতীয় মাছ চাষাবাদ করা হয়, সেসব এলাকায় এই রোগ একটি বিভীষিকা হিসেবে পরিচিত। কারণ এসব জলাশয়ে এই রোগ প্রায়ই মহামারী হিসেবে দেখা যায়। শুধু দেশী কার্প জাতীয় মাছেই নয়, এই রোগ বিদেশী কার্পেও মহামারী সৃষ্টি করতে পারে।
আঙুলে পোনার ক্ষেত্রে এ রোগের সংক্রমণের তীব্রতা বেশি হয়ে থাকে। স্বাদু ও অর্ধ-লোনা পানির জলাশয়ে সাধারণত এ রোগ বেশি দেখা যায়। জলাশয়ের তাপমাত্রা ২৫ থেকে ২৬° সেন্টিগ্রেড হলে এই রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। ফলে গ্রীষ্মকাল ও বসন্তকালে সাদা দাগ রোগের তীব্রতা অনেকাংশে বৃদ্ধি পায়। জলাশয়ে অতিরিক্ত পরিমাণে মাছ থাকলে এই রোগ প্রায় মহামারী রূপ ধারণ করে।

রোগ লক্ষণ
সাদা দাগ রোগের বেশ কিছু লক্ষণ রয়েছে, যার সাহায্যে খুব সহজেই এ রোগ শনাক্ত করা যায়। নিচে এসব লক্ষণ উল্লেখ করা হলো :
(ক) মাছের ত্বক, পাখনা এবং কানকোতে বিন্দুর মতো ছোট ছোট সাদা সাদা দাগ দেখা যায়।
(খ) রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি পেলে মাছের দেহ সাদা বর্ণের ঝিল্লীতে আবৃত হয়ে যায়।
(গ) মাছের দেহের স্বাভাবিক পিচ্ছিল ভাব হ্রাস পায় এবং দেহের স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য নষ্ট হয়ে যায়। (ঘ) দেহে রোগ সংক্রমণ হলে মাছ পানিতে লাফালাফি করে, পানির বিভিন্ন খসখস বস্তুর সাথে দেহ ঘষতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত মাছ পানিতে অলসভাবে চলাফেরা করতে থাকে।
ট্রাইকোডিনিয়াসিস
রোগের জীবাণু :
ট্রাইকোডিনিয়াসিস একধরনের এককোষী পরজীবীসৃষ্ট রোগ। এই রোগের জন্য দায়ী কয়েকটি পরজীবীর নাম হলো ট্রাইকোডিনা ডুমেরওয়েই (Tricodina domerguei), ট্রাইকোডিনা পেডিকুলাস ( Tricodina pediculus), ট্রাইকোডিনা নাইগ্রা (Tricodina nigra) ইত্যাদি।
এ ধরনের পরজীবী সাধারণত মাছের ফুলকা আক্রমণ করে। রোগের বিস্তার: সাধারণত বিভিন্ন ধরনের কার্প মাছের ধানি পোনা এবং আঙুলে পোনাতে এ রোগের প্রকোপ বেশি দেখা যায়। বিশেষত রুই জাতীয় মাছ এ পরজীবী দ্বারা বেশি আক্রান্ত হয় এবং আক্রান্ত মাছের স্পর্শে এই রোগ বেশি বিস্তার লাভ করে। এছাড়া জলাশয়ের পানির গুণাগুণ বিনষ্ট হলে এ পরজীবীর আক্রমণ বেশি দেখা যায়। নার্সারি পুকুরে পোনা মাছের পরিমাণ অত্যধিক বেশি হলেও এ রোগের বিস্তার লাভ ঘটে।
রোগ লক্ষণ :
ট্রাইকোডিনিয়াসিস রোগের সুনির্দিষ্ট কিছু কিছু লক্ষণ রয়েছে, যার সাহায্যে এ রোগ খুব সহজেই সনাক্ত করা যায়। নিচে এসব লক্ষণ উল্লেখ করা হলো :
(ক) এ পরজীবীর আক্রমণ হলে মাছের দেহে বেশি পরিমাণে শ্লেম্মা দেখা যায়। (
খ) আক্রান্ত মাছের ফুলকা থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয়, ফুলকারশ্মিতে পচন ধরে এবং ফুলকাদন্ড বের হয়ে আসে।
(গ) পোনা মাছ খাদ্য গ্রহণে অনাগ্রহ প্রদর্শন করে।
(ঘ) আক্রান্ত মাছ বিক্ষিপ্ত চলাফেরা করে এবং শেষ পর্যন্ত মারা যায়।
মিক্সোপোরিডিয়াসিস
রোগের জীবাণু এ রোগ এক ধরনের এককোষী পরজীবীর আক্রমণে সংঘটিত হয়। এ রোগের জীবাণুর নাম মিক্সোবোলাস সিপ্রিনি (Myxoblous cyprini), মিক্সোবোলাস ডিসপার (Myxoblous disper) ইত্যাদি।
রোগের বিস্তার:
এটি একটি সংক্রামক রোগ। এ রোগের বিস্তার সাধারণত কার্প জাতীয় মাছের পোনাতে বেশি দেখা যায়। তবে বড় আকারের মাছেও এ রোগের প্রকোপ রয়েছে। বাংলাদেশে কাতলা মাছ ও পোনা এ পরজীবী দ্বারা বেশি আক্রান্ত হয়। মিক্সোবোলাস জীবাণু সাধারণত মাছের ফুলকা, মাংসপেশী, পাখনা, পায়ুপথ ইত্যাদিতে রোগের সংক্রমণ ঘটিয়ে থাকে। তবে মাছের দেহের আভ্যন্তরীণ অন্যান্য অংশ যেমন- পাকাগ্রিক নালী, বৃক্ক, যকৃত, প্লীহা ইত্যাদিতেও রোগের সংক্রমণ হয়।
রোগ লক্ষণ :
বেশ কয়েকটি লক্ষণ দিয়ে খুব সহজেই মাছে এই রোগ সনাক্ত করা যায়। নিচে এসব লক্ষণ বর্ণনা করা হলো :
(ক) মাছের ত্বকে ফোঁড়া ও বুদবুদ দেখা যায়।
(খ) ফুলকায় প্রথমে ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং পরে তা পচতে শুরু করে।
(গ) মাছের দেহ গাঢ় বর্ণ ধারণ করে এবং ক্রমশ ক্ষীণ হতে থাকে।
(ঘ) মাছ খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে।
(খ) বহুকোষী পরজীবীসৃষ্ট রোগ
কৃমিসৃষ্ট রোগ
বিভিন্ন ধরনের নিমাটোড, সেসটোড এবং জোঁক মাছের দেহে পরজীবী হিসেবে বিরাজ করে। নানা ধরনের রোগের সৃষ্টি করতে পারে। এসব পরজীবী মাছের দেহে সংক্রমণ ঘটালেও তেমনভাবে মহামারী সৃষ্টি করতে পারে না। তবে মাছের দেহে এসব পরজীবী অন্ত: এবং বহিঃপরজীবী হিসেবে বিভিন্ন ধরনের রোগ সৃষ্টি করে। এধরনের রোগের মধ্যে প্রধান তিনটি রোগ হলো :
(ক) ড্যাকটাইলোগাইরোসিস (Dactylogyrosis)
(খ) গাইরোড্যাকটাইলোসিস ( Gyrodactylosis)
(গ) লার্নিয়াসিস (Lerncasis)
নিচে এসব রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো :
ড্যাকটাইলোগাইরোসিস
এ রোগটি মাছের ফুলকা কৃমি রোগ নামে পরিচিত।
রোগজীবাণু :
এই রোগ সৃষ্টি হয় Dactylogyrus নামক একধরনের পরজীবী দিয়ে। এই পরজীবীর কয়েকটি প্রজাতি মাছের দেহে সংক্রামণ ঘটিয়ে থাকে। এসব প্রজাতি হলো : ড্যাকটাইলোগাইরাস ল্যামেলেটাস (Dactylogyrus lamellatus), ড্যাকটাইলোগাইরাস অ্যারিসটিকথিস (D. aristicthys), এবং ড্যাকটাইলোগাইরাস ভ্যাসটেটর (D. vastators)।
রোগের বিস্তার:
এসব সাধারণত মাছের ফুলকা আক্রমণ করে। তবে বড় আকারের বা বয়স্ক মাছের চেয়ে ছোট আকারের বা পোনা মাছই এসব পরজীবী দিয়ে বেশি আক্রান্ত হয়ে থাকে। অনেকক্ষেত্রে এসব কৃমি মাছে ব্যাপকভাবে বিস্তার বা সংক্রামণ ঘটিয়ে মাছে মড়ক সৃষ্টিকরে।
সাধারণত বসন্তকালের শেষদিকে এবং গ্রীষ্মকালের প্রথমদিকে এ পরজীবীর আক্রমণ বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশে সাধারণত সিলভার কার্প, গ্রাসকার্প এবং বিগহেড কার্পে এ পরজীবীর সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। রোগ লক্ষণ এ ধরনের পরজীবী মাছের দেহে আক্রমণ করেছে কিনা, তা সনাক্ত করার জন্য বেশ কিছু লক্ষণ রয়েছে। এসব লক্ষণ দেখে খুব সহজেই এ পরজীবীর সংক্রমণ সনাক্ত করা যায়।
(ক) মাছের দেহে অধিক পরিমাণে শ্লেষ্মা সৃষ্টি হয়।
(খ) মাছের ফুলকা ফুলে যায় এবং অধিক পরিমাণে রক্তক্ষরণের জন্য ফুলকার রঙ ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
(গ) কানকো খোলা থাকে কিন্তু মাছের শ্বাসপ্রশ্বাস খুবই কমে যায়।
(ঘ) মাছ দুর্বল হয়ে যায় এবং ধীরে ধীরে সাঁতার কাটে।
এ রোগকে মাছের ত্বকের কৃমি রোগ নামেও অভিহিত করা হয়।
রোগ জীবাণু
এ রোগ সৃষ্টির জন্য বেশ কয়েকটি জীবাণু দায়ী। এসব জীবাণু গাইরোড্যাকটাইলাস (Gyrodactylus sp) নামে পরিচিত।
রোগের বিস্তার:
এ পরজীবী সাধারণত মাছের ত্বকে সংক্রমণ সৃষ্টি করে। বিশেষত রুই জাতীয়
মাছের পোনা এ পরজীবী দিয়ে বেশি আক্রান্ত হয়। সাধারণত গ্রীষ্মকালে এ পরজীবীর সংক্রমণ বেশি হয়ে থাকে। এ পরজীবী মূলত ত্বকে সংক্রমণ ঘটালেও অনেকক্ষেত্রে এটি মাছের ফুলকাকেও আক্রমণ করে থাকে।
রোগের লক্ষণ :
গাইরোড্যাকটাইলাস জাতীয় পরজীবী মাছের দেহে সংক্রমণ ঘটিয়েছে কিনা, তা বোঝার জন্য বেশ কিছু লক্ষণ রয়েছে নিচে সেসব উল্লেখ করা হলো-
(ক) মাছের দেহের আঁইশ ফুলে যায়, দেহ লালচে বর্ণ ধারণ করে এবং আক্রান্ত মাছের স্বাভাবিক ঔজ্জ্বল্য থাকে না।
(খ) পরজীবী আক্রান্ত মাছ ছটফট করতে থাকে, পানিতে দ্রুত সাঁতার কাটতে থাকে এবং পরজীবীর হাত থেকে বাঁচার জন্য পানিতে ভাসমান বা নিলৰ কোন কিছুর সাথে দেহ ঘষতে থাকে।
(গ) অনেকক্ষেত্রে আক্রান্ত মাছের চোখ প্রথমে ঘোলা হয়ে যায় এবং মাছ অন্ধ হয়ে যায়।
লার্নিয়াসিস
এ রোগকে মাছ আংটা কৃমি নামেও অভিহিত করা হয়।
রোগের জীবাণু :
এ রোগ সৃষ্টির কারণ হিসেবে যেসব জীবাণু দায়ী সেগুলো হচ্ছে- লার্নিয়া পলিমরফি (Lernaea polymorphy), লার্নিয়া সাইগ্রেনাসিয়া (Lcyprinacea) লার্নিয়া টিনোফ্যারিঙ্কোডনটিস (Lctenopharyngodontis)
রোগের বিস্তার :
দেশীয় কার্প জাতীয় মাছ এবং বিদেশী কার্প জাতীয় মাছে এই পরজীবী বেশি সংক্রমণ ঘটায়। শুধু বয়স্ক মাছেই নয়, এ পরজীবী এসব মাছের জীবনচক্রের প্রায় সব দশাতেই দেখা যায়। সাধারণত এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাসে এ রোগের সংক্রমণ বেশি দেখা যায়।
রোগের লক্ষণ :
এ পরজীবীর আক্রমণের লক্ষণ নিম্নরূপ :
(ক) প্রাথমিক অবস্থায় মাছ অস্বস্তিকর অবস্থা প্রদর্শন করে।
(খ) মাছের দেহে পরজীবী আক্রান্ত অংশে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, লালচে বর্ণ ধারণ করে এবং ফুলে যায়।
(গ) সংক্রমণের মাত্রা বেশি হলে মাছের দেহে ঘা-এর সৃষ্টি হয় এবং মাছ পানিতে ছুটাছুটি করতে থাকে। মাছের ডিম, গোনা এবং বড় মাছের দেহে মিহি সুতার ন্যায় দেখা দেয়।
সারমর্ম
মাছ চাষের বিভিন্ন পর্যায়ে মাছের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় পুষ্টি সরবরাহ না করা হলে মাছের দেহে পুষ্টিজনিত নানা ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। পুষ্টি সমস্যা এককভাবে মাছে দেখা দিলেও অনেকসময় তা মাছে ব্যাপক মড়ক সৃষ্টি করে।
মাছ চাষের বিভিন্ন পর্যায়ে মাছে নানা ধরনের পরজীবীর সংক্রমণ দেখা দেয়। এসব পরজীবী মাছে বিভিন্ন ধরনের রোগ সৃষ্টি করে। এসব রোগ দীর্ঘস্থায়ী হলে মাছ চাষ প্রক্রিয়াকে সে সময়ের জন্য পুরোপুরি ধ্বংস করে দিতে পারে কারণ এসব রোগে মাছের ব্যাপকভাবে মড়ক দেখা দেয়। পানির গুণাগুণ পরিবর্তিত হলেও এসব পরজীবীর সংক্রমণ অত্যধিক হারে দেখা যায়।
